• ‘আনন্দমঠ পড়েছ বউঠান, আনন্দমঠ?’ আগন্তুক দেবরটি ঝড়ের মধ্যে বাড়িতে ঢুকেই বউঠানকে জিজ্ঞেস করে। ছবির নাম ‘চারুলতা’। উনিশ শতকের নবজাগরিত বারান্দা দিয়ে পিঠে চাবির গোছা নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সে। ধনীবাড়ির সামান্য গৃহকর্ম সেরে নিদাঘ দুপুরে চারুলতা বেছে নেয় যে লেখককে, তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ‘নষ্টনীড়’ গল্পের অন্যতম চরিত্র লেখক মন্মথ দত্তকে পর্দায় সত্যজিৎ গড়ে তুলেছিলেন বঙ্কিমের ছায়ায়। আর বঙ্গদর্শনের ছায়া পড়েছিল ‘নষ্টনীড়’-এ উল্লিখিত ‘সরোরুহ’, ‘বিশ্ববন্ধু’ পত্রিকায়। বাঙালি সংস্কৃতির এক খোলা জানলা এই ‘বঙ্গদর্শন’। কী না ধরা আছে তাতে! ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে ‘বঙ্গদর্শনে’র কথা। ‘তাঁর উপন্যাস তখন টাটকা খোলা থেকে সবে নামছে, আর মেয়েরা সব নতুন নতুন বই পড়বার জন্য আকুবাকু করছে। তিনি জোড়াসাঁকোর বাড়ি আসবেন শুনে বর্ণপিসিমার ওদের সে কী আগ্রহ! আর খড়খড়ে তুলে তুলে উঁকিঝুঁকি মেরে তাঁকে দেখবার যে কী উৎসাহ!’ এই স্মৃতিচারণা ইন্দিরা দেবীর। তরুণ রবীন্দ্রনাথও অংশীদার ছিলেন এ আনন্দের। ‘বঙ্কিমের বঙ্গদর্শন আসিয়া হঠাৎ একদিন বাঙালির হৃদয় একেবারে লুট করিয়া লইল।’ অথচ বাঙালির হৃদয় লুণ্ঠনকারী এই পত্রিকাটির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল কলকাতা নয়, বহরমপুরে। ‘তত্ত্ববোধিনী’ ‘বিবিধার্থ সংগ্রহ’, ‘রহস্য সন্দর্ভ’, ‘সোমপ্রকাশ’ কী না ছিল সেই সময়। তবুও বঙ্গকে নতুন করে দেখার জন্য এল ‘বঙ্গদর্শন’। বঙ্গ-রঙ্গ মিলে একাকার।
সেকালের মেয়েদের সারাদিন কাজ করে যে সময়টুকু বেঁচে থাকত, সেটুক বরাদ্দ ছিল নভেল ও পত্রপত্রিকার জন্য। বটতলার বই-ও বাদ যেত না। একদিন ফেরিওয়ালার মাথায় চড়ে ঘরে ঘরে এসে পৌঁছাল ‘বঙ্গদর্শন’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেজদি বর্ণকুমারী, নতুন দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী কাদম্বরী ছিলেন বঙ্কিমের সিরিয়াস পাঠিকা। কিশোরীচাঁদ মিত্র সম্পাদিত ‘ইন্ডিয়ান ফিল্ড’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম উপন্যাস ‘রাজমোহনস ওয়াইফ’। উপন্যাসটি সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। বঙ্কিম চাইলেই তা শেষ করতে পারতেন। হয়তো অগ্রজ মধুসূদনকে দেখে সে পথ ত্যাগ করেছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, ইংরেজি ভাষার পুষ্টিসাধন ও শোভাবর্ধন বঙ্গীয় লেখকের পক্ষে বিড়ম্বনা মাত্র। ‘বঙ্গদর্শন’-এ প্রকাশিত ‘বিষবৃক্ষ’, ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ ইংরেজি ও জার্মান ভাষায় অনূদিত হয়। শুধু তাই নয়, ‘দুর্গেশনন্দিনী’ প্রকাশিত হওয়ার ন’বছরের মধ্যে ‘ম্যাকমিলানস ম্যাগাজিন’ পত্রিকায় অধ্যাপক কাওয়েল বইটির সুদীর্ঘ আলোচনা করেন। এবং সাহেবি পাঠক সমাজ জানতে পারে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত একজন শক্তিশালী বাঙালি লেখকের কথা।
‘বঙ্গদর্শন’-এর তুমুল জনপ্রিয়তার দিকস্তম্ভ ছিলেন বাঙালির ঘরের মেয়ে-বউরা। এমনকি বঙ্কিমের পাঠিকারা সে সময় প্রহসনের বিষয়ও হয়ে ওঠেন। দুর্গাদাস দে একটি প্রহসন লিখেছিলেন ‘বঙ্কিম-বিনোদিনী’ (১৮৯৮) নামে। ‘ছবি’ প্রহসনে আধুনিক নায়িকার পাত্রকে পছন্দ না হওয়ায় হতাশ হয়ে বলে, ‘আমার সকল আশা ভস্ম হলো। আহা জগৎসিংহের মতো মন্দিরে দেখা হলো না।’ এসব শুনে তার ঠাকুমা মেয়েটির নভেল পড়াকেই দায়ী করছেন। মেয়েদের বঙ্কিমের নভেল পাঠের প্রমাণ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অলীক বাবু’-তেও। মিথ্যেবাদী ভণ্ড অলীকবাবুকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে এলে নায়িকা হেমাঙ্গিনী ‘দুর্গেশনন্দিনী’-র আয়েশার মতোই বলে উঠেছে, ‘আমি পিতার সমক্ষে, সমস্ত জগতের সমক্ষে মুক্তকণ্ঠে বলছি, এই বন্দি আমার প্রাণেশ্বর—আমার কণ্ঠরত্ন—তিনি ভিন্ন আর কাহাকেও আমি পতিত্বে বরণ করব না—যদি এর সঙ্গে আমার বিবাহ না হয় তাহলে এ দণ্ডেই প্রাণ বিসর্জন করব।’ একেবারেই বঙ্কিম-ভাষ্যের নকলনবিশী! এ থেকে আন্দাজ করা যায় তাঁর জনপ্রিয় সংলাপ।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গ্র্যাজুয়েট, বিচারক, ঔপন্যাসিক, সম্পাদক বঙ্কিম কিন্তু সর্বাগ্রে বাঙালি। ‘বঙ্গদর্শন’-এ প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয় নিবন্ধে বঙ্কিম যা বলেছিলেন, তা আসলে বাঙালি হয়ে ওঠার অন্যতম পথ নির্দেশিকা। ইংরেজ প্রভুর সরকারি আমলা হয়ে তিনি সব ধরনের বাঙালিকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। নতুন বাঙালি গড়তে পুরানো বাঙালিদের তুলোধনাও কম করেননি। ‘যিনি নিজগৃহে জল খান, বন্ধুগৃহে মদ খান, বেশ্যাগৃহে গালি খান এবং মুনিব সাহেবের গৃহে গলাধাক্কা খান, তিনিই বাবু।’ গদ্য রচনার মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে সমাজ-সমালোচনা করেছেন বঙ্কিম। বাঙালির সমস্ত ভাবালুতা, অপরিণামদর্শিতার গোড়া কেটে দিয়েছেন ছত্রে ছত্রে। ‘হে গর্দভ! কে বলে তোমার পদগুলি ক্ষুদ্র। যেখানে সেখানে তোমারই বড় পদ দেখিয়া থাকি। তুমি উচ্চাসনে বসিয়া স্তাবকগণে পরিবৃত হইয়া মোটা মোটা ঘাসের আঁটি খাইয়া থাক।’ ভুলে যাননি হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্তদের কথা। ভাদ্রের রোদে খালি মাথায়, খালি পায়ে এক হাঁটু কাদার ভিতরে দু’টি অস্থিচর্মবিশিষ্ট বলদ নিয়ে ভোঁতা হাল ধার করে যারা চাষ করছে। ‘বল দেখি চশমা-নাকে বাবু! ইহাদের কি মঙ্গল হইয়াছে? তুমি লেখাপড়া শিখিয়া ইহাদিগের কি মঙ্গল সাধিয়াছ? আর তুমি ইংরাজ বাহাদুর!...তুমি বলো দেখি যে, তোমা হইতে এই হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্তের কি উপকার হইয়াছে?’ এই প্রবন্ধ বঙ্গদর্শনের প্রথম বছরেই প্রকাশ পেয়েছিল। বঙ্কিম বহরমপুরে সে সময়। এই বহরমপুরেই বঙ্কিম যখন অফিস থেকে পালকি করে ফিরছিলেন, তখন তাতে করাঘাত করেছিলেন কর্নেল ডফিন। শাস্তিস্বরূপ ভরা আদালতে সাহেবকে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল। একজন বাঙালি ব্রিটিশ সাহেবের নামে নালিশ করেছে। যে সে সাহেব নয়, সেনাদলের কর্তা কর্নেল। সাহেবকে কাঠগড়ায় দেখার জন্যেই আদালতে ভিড় করেছিলেন বহু মানুষ।
১২৮৪ বঙ্গাব্দে বঙ্গদর্শন নতুন করে প্রকাশিত হয়। সেই একই সময়ে ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসটিও প্রকাশিত হতে শুরু করে। কিন্তু মাঝপথে তা বন্ধ হয়ে যায়। চন্দ্রশেখরবাবু এ প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলে বঙ্কিম জানান, তাঁকে তাঁর এক বন্ধু বলেছেন যে, ‘আমার সৃষ্ট চরিত্রগুলিতে এখানকার ছেলেপুলে মাটি হইতেছে। তাই আর ডাকাত মানিকলালকে আঁকিতে ইচ্ছা করে না।’ বই আকারে ‘রাজসিংহ’ প্রকাশিত হলে দেখা যায় বঙ্গদর্শনের সঙ্গে তার চতুর্থ সংস্করণের অনেক পার্থক্য। কিছুটা সমাজ শোধনের তাগিদেই কি বঙ্কিম এ ধরনের পরিবর্তনগুলি করতেন? গল্প-উপন্যাসের মধ্যে কাহিনি বলার পাশাপাশি লেখকরা নিজেদের মন্তব্য প্রকাশ করে যান। কখনও কখনও কারও পক্ষে বা বিপক্ষে কথা বলেন। স্ত্রী-পরিত্যাগী গোবিন্দলালের প্রতি তাঁর বাণী, ‘যে পবিত্রতার জন্য পবিত্র হইতে চাহে না, অন্য কোনও কারণে পবিত্র, সে বস্তুতঃ পবিত্র নহে। তাহাতে এবং পাপীষ্ঠে বড় অধিক তফাত নহে। এই ভ্রমে গোবিন্দলালের অধঃপতন হইল।’ পরে এই সমালোচনা রাখেননি বঙ্কিম। পাঠকের উপরেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। এরকম পরিবর্তন ‘রাজসিংহ’-এর ক্ষেত্রেও করেছিলেন। চঞ্চলকুমারী ও মোবারক চরিত্রকে বঙ্গদর্শন থেকে অনেকটা আলাদা করেছিলেন। বাদ পড়ে অসি ঘুরিয়ে মোবারকের সঙ্গে চঞ্চলকুমারীর যুদ্ধ। রণচণ্ডী চঞ্চলকুমারীকে অনেকটাই কমনীয় করেন তিনি।
‘বঙ্গদর্শন’-এর প্রথম সংখ্যায় বঙ্কিম আহ্বান করেছিলেন কৃতবিদ্য বঙ্গীয় লেখকদের। তাঁর মনে হয়েছিল বাঙালি শিক্ষিত লোকেদের মাতৃভাষা চর্চা করা উচিত। না হলে মিটিং-লেকচার-পড়াশোনা-কথা বলা—এ সবের মতো বাংলায় একদিন দুর্গাপুজোর মন্ত্রও ইংরেজিতে বলা হবে। বঙ্কিমের সেই আক্ষেপ ও দুর্ভাবনা নিয়ে বাঙালি প্রায় তিন শতাব্দী কাটাতে চলেছে। মজার কথা, বঙ্কিমের আশীর্বাদেও ছিল বাংলা ভাষার প্রতি পক্ষপাত। কেউ তাঁকে প্রণাম করলে তিনি ‘সুখী হও’, ‘দীর্ঘায়ু হও’-এর পরিবর্তে বলতেন, ‘আশীর্ব্বাদ করি মাতৃভাষার সেবা করিয়া যশস্বী হও।’ ‘নারায়ণ’ পত্রিকায় এমনই এক স্মৃতিচারণা করেছেন অশ্বিনীকুমার সেন। রমেশচন্দ্র দত্তকে বঙ্কিম একবার বলেছিলেন, তাঁর জীবনী যেন তিরিশ বছরের মধ্যে লেখা না হয়। বঙ্গদর্শনের লেখক শ্রীশচন্দ্র মজুমদার বঙ্কিমকে একবার তাঁর জীবনী সম্পর্কে নোট নেওয়ার কথা বললে বঙ্কিম হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমার জীবন অসাড়, তা লিখে কী হইবে?’ মনে পড়ে যায়, ‘ধর্মতত্ত্ব’-এর শাশ্বত উক্তি, ‘এই জীবন লইয়া কী করিব?’ ‘লইয়া কী করিতে হয়?’ এ জন্যই কমলাকান্ত আপিসে গিয়ে আপিসের কাজ করত না। সরকারি বইতে কবিতা লিখত। চিঠিপত্রের উত্তরে শেক্সপিয়র নামের যে লেখক আছে, তার বচন তুলে রাখত। বিল বইয়ের পাতায় ছবি এঁকে রাখত। একবার সাহেব তাকে মাসকাবারের পে-বিল তৈরি করতে বললে, কমলাকান্ত একটি ছবি এঁকেছিল। কতগুলি নাগা ফকির সাহেবের কাছে ভিক্ষা চাইছে, আর সাহেব দু’-চারটে পয়সা ছড়িয়ে দিচ্ছে। বলা বাহুল্য, এই ছবি দেখার পর সাহেব কমলাকান্তকে মানে মানে বিদায় দেয়।
কমলাকান্ত ও উপন্যাসকার বঙ্কিমের ভিতরে আসলে এক কবি ছিল। প্রবন্ধে ও উপন্যাসের মাঝে মাঝে যাদের দেখা পাওয়া যায়। বিকেলবেলায় বঙ্কিম তেমন কাজ রাখতেন না। একটা বাগান করেছিলেন অর্জুনদিঘির পাড়ের কাছে। নানারকম ফুল-ফলের গাছ লাগিয়ে ছিলেন হুগলি কলেজ থেকে চারা এনে। নাম দিয়েছিলেন ফুলবাগান। সেখানেই সময় কাটাতেন। ফুলবাগানের মধ্যে তৈরি করেছিলেন একটি বাড়ি। প্রতিদিনের কাজ শেষে গোবিন্দলালও দিনান্তে বারুণী তীরবর্তী পুষ্পোদ্যানে ঘুরে বেড়াত। ‘গোবিন্দলালের পুষ্পোদ্যানভ্রমণ একটি প্রধান সুখ।’ জিরানিয়াম, ভর্বিনা ইউফরবিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, গোলাপ, কামিনী, মল্লিকা, গন্ধরাজ ফুলের সারি দিয়ে সাজানো বাগানের সঙ্গে বঙ্কিমের এই বাগানবাড়ির খুবই মিল। মাঝেমাঝে ভাটপাড়া ও কাঁটালপাড়ার মধ্যকার খালের ধারেও বেড়াতে যেতেন। তাঁর চোখের সামনে সন্ধ্যা নামত। কখনও নৌকা নিয়েও চলে যেতেন। দেখতেন জলতরঙ্গ। বারুণীর তীরে কোকিলের ডাক শুনে রোহিণীর মনে হয়েছিল, ‘কী যেন হারাইয়াছি—যেন তাই হারাইয়া যাওয়াতে জীবনসর্বস্ব অসাড় হইয়া পড়িয়াছে— যেন তাহা পাইব না। যেন কী নাই, কেন যেন নাই, কী যেন হইল না, কী যেন পাইব না।’
বঙ্কিম প্রথম জীবনে অনেক কবিতা লিখেছেন। শুধু তাই নয় ‘সংবাদ প্রভাকর’-এ রীতিমতো কবিতাযুদ্ধ করেছেন দীনবন্ধু মিত্রের সঙ্গে। যা পরবর্তীতে ‘কালেজীয় কবিতাযুদ্ধ’ নামে পরিচিত হয়। কবিতাযুদ্ধের এই আসরে বুনো কবি, শহুরে কবি ও চট্টো কবির প্রসঙ্গ বারবার এসেছে। এঁরা যথাক্রমে দ্বারকানাথ অধিকারী, দীনবন্ধু মিত্র ও বঙ্কিমচন্দ্র। ১৮৫২-৫৩-র মধ্যে বঙ্কিমের বহু কবিতা ‘সংবাদ প্রভাকর’ ও ‘সমাচার দর্পণ’-এ প্রকাশিত হয়। ১২৯১ বঙ্গাব্দে ‘প্রচার’ পত্রিকায় তিনি বলেছিলেন, ‘যাহা লিখিবেন, তাহা হঠাৎ ছাপাইবেন না, কিছুকাল ফেলিয়া রাখিবেন, কিছুকাল পরে উহা সংশোধন করিবেন।’ ‘ভারতী’ পত্রিকায় ধর্মতত্ত্ব নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা ও বিতর্কের উত্তর দিয়েছিলেন এই পত্রিকায় বঙ্কিম। ‘রবীন্দ্র বাবু যখন ক, খ শিখেন নাই, তাহার পূর্ব্ব হইতে এরূপ সুখ দুঃখ আমার কপালে অনেক ঘটিয়াছে। আমার বিরুদ্ধে কেহ কখন কোনো কথা লিখিলে বা বক্তৃতায় বলিলে এ পর্যন্ত কোনো উত্তর করি নাই। কখন উত্তর করিবার প্রয়োজন হয় নাই। এবার উত্তর করিবার একটু প্রয়োজন পড়িয়াছে।’ গীতিকবিতার দেশ ভারতবর্ষ বলে বঙ্কিম নিজের কবিতা লেখাকে ‘দুষ্কর্ম’ বলেছেন। যেন মহাসমুদ্রে শিশিরবিন্দু নিক্ষেপ করেছেন। এই বইয়ে শুধু কবিতা নয়, কবিতার ভিতরে তিনটে গদ্যও ছিল। শুধুমাত্র কবিনাম কেনার জন্য ছন্দ মেলাতে বসাকে একপ্রকার সঙ সাজা বলে মনে করতেন। ‘দুর্গেশনন্দিনী’ প্রকাশিত হওয়ার প্রায় বছর তিনেক আগে উপন্যাসটি রচনায় হাত দেন। বঙ্কিমচন্দ্র নাকি প্রকাশের আগে কাউকে পাণ্ডুলিপি পড়তে দিতেন না। কেবল ‘দুর্গেশনন্দিনী’-র পাণ্ডুলিপি তাঁর দুই দাদাকে শুনিয়েছিলেন। তা শুনে শ্যামাচরণ ও সঞ্জীবচন্দ্রের পছন্দ হয়নি। বঙ্কিমচন্দ্র ভাঙা মন ও ‘দুর্গেশনন্দিনী’-র পাণ্ডুলিপি নিয়ে কর্মস্থলে চলে গেলেন। বঙ্কিম-সহকর্মী কালীনাথ দত্ত লক্ষ্য করেছিলেন, ‘বঙ্কিমচন্দ্রকে সর্বদা অন্যমনস্ক দেখা যাইত। এমনকী, সাক্ষী এজাহার লিখিতে লিখিতে কলম বন্ধ করিয়া ভাবিতে ভাবিতে অন্যমনা হইয়া পড়িতেন এবং হঠাৎ এজলাস পরিত্যাগ করিয়া গৃহাভ্যন্তরে তাঁর study room-এ প্রস্থান করিতেন। চিন্তিত বিষয়টি লিপিবদ্ধ না করিয়া এজলাসে ফিরিতেন না।’
আবার বঙ্কিমচন্দ্রের ছোটো ভাই পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বঙ্কিমচন্দ্র-দীনবন্ধু’ প্রবন্ধে অন্য কথা বলেছেন, উপন্যাসটি প্রকাশ হওয়ার আগে কাঁটালপাড়ার বাড়িতে অনেককেই পড়ে শুনিয়েছিলেন। বড়োদিন বা মহরমের ছুটিতে ভাটপাড়ার পণ্ডিতদের সামনে ‘দুর্গেশনন্দিনী’ পড়ার পর জিজ্ঞেস করলেন, ভাষায় কোনো ব্যাকরণ দোষ আছে কি না। পণ্ডিতেরা বললেন, গল্প-ভাষার মোহিনী শক্তিতে তাঁরা মুগ্ধ হয়েছেন। ব্যাকরণের দোষ লক্ষ্য করেননি। বঙ্কিমের জীবিত অবস্থায় এই উপন্যাসের বারো হাজার পাঁচশো কপি বিক্রি হয়েছিল। ১৮৮৮ সালে ‘দুর্গেশনন্দিনী’-র একাদশ সংস্করণ মুদ্রিত হয়ে এলে বঙ্কিম বলেছিলেন, ‘এই পুস্তকখানি লোকে যত নিন্দা করিয়াছে তত আর কোনও পুস্তকে করে নাই; তাই এই পুস্তকের বিক্রি বেশি।’
বঙ্কিমচন্দ্র কীর্তন ভালোবাসতেন। কীর্তনওয়ালাকে পেলা দিতে দিতে তিনি বঙ্গদর্শনের তহবিল খালি করে দিয়েছিলেন। কয়েক বছর গানও শিখেছিলেন যদুভট্টের কাছে। তাঁকে হারমোনিয়াম নিয়ে গুনগুন করে গান গাইতে শুনেছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। তাঁর ইচ্ছে ছিল বাংলার ইতিহাস লিখে যাওয়ার। খেদ করে বলেছিলেন, সাহেবেরা পাখি মারতে গেলেও ইতিহাস লেখা হয়। কিন্তু বাঙালির ইতিহাস নেই। এই উদ্দেশ্যেই তিনি ‘বাঙালির উৎপত্তি’ বলে বঙ্গদর্শনে সাতটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তথ্যের দরকার হলে প্রাচীন পুঁথি ঘেঁটে হরপ্রসাদ তা জোগাতেন। সেই ইতিহাসে বাংলার বেশ কিছু পুরানো রাজত্বের কথা যেমন জানা যায়, তেমনই জানা যায় বঙ্গদেশে আর্য-অনার্যদের কথা। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নতুন ‘বঙ্গদর্শন’-এর লেখক ছিলেন। তিনি লখনউ যাওয়ার আগে বঙ্কিমের সঙ্গে দেখা করতে এলে বঙ্কিম তাঁর হাতে ধরিয়ে দেন সদ্য প্রেস থেকে আনা ভিজে বাঁধানো একটি ‘কৃষ্ণকান্তের উইল।’ বলেছিলেন, ‘রেলগাড়িতে এইখানেই পড়িয়ো, ছাপাখানা হইতে এইখানা প্রথম বাহির হইল।’
ছেলেবেলায় রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘বঙ্গদর্শন এলে পাড়ায় দুপুরবেলায় কারো ঘুম থাকত না।’ ঠাকুরবাড়ির সদস্যরা ‘বন্দে মাতরম্’ গানটিকেও গ্রহণ করেছিলেন মনে-প্রাণে। ‘আনন্দমঠ’ প্রকাশের তিন বছরের মধ্যে ‘বালক’ পত্রিকায় তা স্বরলিপি সহ সচিত্র মুদ্রিত হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র-সঞ্জীবচন্দ্রের পরে বঙ্গদর্শন যায় শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের কাছে। ‘বঙ্গদর্শন’-এর পুনঃপ্রচারের ভূমিকায় বঙ্কিম লিখেছিলেন, ‘বঙ্গদর্শনের লোপ জন্য আমি অনেকের কাছে তিরস্কৃত হইয়াছি। সেই তিরস্কারের প্রাচুর্যে আমার এইমতো প্রতীতি জন্মিয়াছে যে, বঙ্গদর্শনে দেশের প্রয়োজন আছে।’ বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যুর কয়েক বছর আগে একবার তাঁর বড়ো মেয়ে তাঁকে বলেছিলেন, ‘বন্দে মাতরম্’ গানটি সকলের তেমন পছন্দ নয়। প্রত্যুত্তরে বঙ্কিম বলেছিলেন গানটি তার কেমন লাগে? তাঁরও তেমন পছন্দ নয় বলে জানালে বলেছিলেন, ‘বিশ ত্রিশ বছর পরে একদিন দেখিবে এই গান লইয়া বাঙ্গালা উন্মত্ত হইয়াছে—বাঙালী মাতিয়াছে।’