বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: গ্রামের মানুষের হাতে কাজ দিতে ইউপিএ সরকার দেশজুড়ে চালু করেছিল ‘১০০ দিনের কাজ’। গত জুন মাসে এই কেন্দ্রীয় প্রকল্প বন্ধ করে দেয় মোদি সরকার। বিস্তর ঢাকঢোল পিটিয়ে ১ জুলাই থেকে দেশজুড়ে চালু হয় ‘১২৫ দিনের কাজ’ বা ‘ভিবি জি রাম জি’ প্রকল্প। পরিবর্তিত প্রকল্পে বছরে ১০০ দিনের জায়গায় ১২৫ দিন কাজের গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, বাড়ানো হয়েছে মজুরিও। কিন্তু তাতেও সামনে আসছে উলটো চিত্র!
২০২৫ সালের জুলাই এবং আগস্ট মাসে ‘১০০ দিনের কাজ’-এর আওতায় যত কর্মদিবস তৈরি হয়েছিল, চলতি বছর ‘ভিবি জি রাম জি’ প্রকল্পে এই একই সময়ে কর্মদিবস সৃষ্টির হার অন্তত তার চেয়ে ৬০ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ ইঙ্গিত স্পষ্ট, কাজ কমেছে বিপুল হারে। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে এমনটাই দাবি করা হয়েছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, এবার গোটা দেশেই বর্ষাকালীন বৃষ্টির পরিমাণ তুলনামূলক কম। তাই কম কৃষিভিত্তিক কাজকর্মের বহরও। সেই খামতি পূরণ করতে গ্রাম-ভারতের বড়ো অংশের মানুষের ভরসা ছিল জি রাম জি। কিন্তু তথ্য বলছে, সেই সুযোগটাই পাননি তাঁরা। কারণ, নয়া প্রকল্পের বিধিতে বলা আছে, কোনো রাজ্য যদি কৃষি মরশুমের ব্যস্ততার কারণে জি রাম জি প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখতে চায়, সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬০ দিন তা বন্ধ রাখা যাবে। আগের প্রকল্পে এই নিয়ম ছিল না। এই সুযোগ কাজে লাগিয়েই বেশ কিছু রাজ্য মানুষকে এই প্রকল্পের আওতায় কাজ পাওয়া থেকে বঞ্চিত করেছে। গুজরাত বা ওড়িশার মতো বিজেপি শাসিত রাজ্য এই যুক্তি দেখিয়ে এখনও নয়া প্রকল্পের কাজ শুরু করেনি বলেই উল্লেখ করা হয়েছে রিপোর্টে।
মৌসম ভবন আগেই জানিয়েছিল, এবার দেশে বর্ষার ঘাটতি থাকবে। পশ্চিমবঙ্গে স্বাভাবিকের তুলনায় এখনও পর্যন্ত বেশি বৃষ্টি হলেও বেশিরভাগ কৃষিপ্রধান রাজ্যেই বৃষ্টি যথেষ্ট কম। কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য সামনে এনে এসবিআই জানাচ্ছে, ২১ আগস্ট পর্যন্ত স্বাভাবিকের তুলনায় ৪১ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে বিহারে। বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৯ শতাংশ কম অন্ধ্রপ্রদেশে। গোয়ায় ৩৪, পাঞ্জাবে ৩২, কেরলে ২৪, অসমে ২৩, কর্ণাটকে ২২, রাজস্থানে ২০, তেলেঙ্গানায় ১৭, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, হরিয়ানা ও তামিলনাড়ুতে ১৫, মধ্যপ্রদেশে ১০, মহারাষ্ট্রে ৭, ছত্তিশগড়ে ৬ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে স্বাভাবিকের তুলনায়। স্বভাবতই এর প্রভাব পড়ছে কৃষিকাজে। যে সময় মানুষ কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকত, যথেষ্ট বৃষ্টি না হওয়ায় সেই মানুষের হাতে এখন কাজ নেই। এই পরিস্থিতিতে অতীতে ‘মনরেগা’ বা ‘১০০ দিনের কাজ’ প্রকল্পে কাজ জুটলেও নয়া প্রকল্প হতাশ করেছে তাদের।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দেশে ১৭.৬৫ কোটি কর্মদিবস তৈরি হয়েছিল। এই জুলাইয়ে তা ৮.৯৯ কোটিতে নেমে গিয়েছে। গত বছর আগস্টে ১২.১২ কোটি কর্মদিবস তৈরি হয়েছিল। চলতি বছর ২০ আগস্ট পর্যন্ত ২.৮৫ কোটি কর্মদিবস তৈরি হয়েছে। সার্বিকভাবে ঘাটতির হার ৬০.২ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি কাজ কমেছে পাঞ্জাবে (ঘাটতি ৯০.২%)। পরপর রয়েছে ঝাড়খণ্ড (৮৫%), গুজরাতে (৮৭%), হরিয়ানা (৭৯%), ওড়িশা (৭৮%), তামিলনাড়ু (৭১%), মধ্যপ্রদেশে (৬৯%), কর্ণাটক (৭১%), জম্মু ও কাশ্মীর (৬৬%), বিহার (৭৪%), ছত্তিশগড় (৭৩%)। স্টেট ব্যাংক বলছে, দেশের কৃষিপ্রধান বড়ো ১৯টি রাজ্যের মধ্যে একমাত্র তেলেঙ্গানায় গত বছরের চেয়ে ২২৯ শতাংশ এবং অন্ধ্রপ্রদেশে ৫৫ শতাংশ বেশি কাজ হয়েছে। বাদবাকি ১৭টি রাজ্যেই ঘাটতি অনেক। পশ্চিমবঙ্গে যেহেতু গত বছর ‘১০০ দিনের কাজ’ বন্ধ ছিল, তাই এই রাজ্যকে তুলনায় রাখা হয়নি। তালিকা থেকে স্পষ্ট, ডবল ইঞ্জিন রাজ্যগুলিই জি রাম জি প্রকল্পের মাধ্যমে কাজের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। এসবিআই রিপোর্ট বলছে, চাষের মরশুমে প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখার যে বিধি রয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়েছে বিহার, গুজরাত, ওড়িশা, অরুণাচল প্রদেশ, মিজোরাম, সিকিম, নাগাল্যান্ডের মতো রাজ্যগুলি। সব মিলিয়ে, ‘আচ্ছে দিন’ তো দূরের কথা, চড়া মূল্যবৃদ্ধির বাজারে খেয়েপরে বেঁচে থাকাই অনেকের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।