Bartaman Logo
৩ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কর্ম

আমাদের সামনে দুটি পথ আছে: প্রথম, সংসারে নিয়ত কর্ম ও ভোগের পথ। সঠিক নিয়ন্ত্রণের ফলে এই পথই স্বাভাবিকভাবে শেষ হবে দ্বিতীয় পর্বে বা ঈশ্বানুভূতির ও সমস্ত বন্ধনমুক্তির পথে। সামর্থ্য অনুযায়ী মানব যে কোন একটি পথ বেছে নিতে পারে। অধর্মের বা ন্যায়বর্জিত পথ, যা কাম, মোহ ও লোভ সমাকীর্ণ, তা সর্বথা পরিত্যাজ্য।

কর্ম
  • ২৯ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

আমাদের সামনে দুটি পথ আছে: প্রথম, সংসারে নিয়ত কর্ম ও ভোগের পথ। সঠিক নিয়ন্ত্রণের ফলে এই পথই স্বাভাবিকভাবে শেষ হবে দ্বিতীয় পর্বে বা ঈশ্বানুভূতির ও সমস্ত বন্ধনমুক্তির পথে। সামর্থ্য অনুযায়ী মানব যে কোন একটি পথ বেছে নিতে পারে। অধর্মের বা ন্যায়বর্জিত পথ, যা কাম, মোহ ও লোভ সমাকীর্ণ, তা সর্বথা পরিত্যাজ্য। যদি জাগতিক কর্মের ফলে সম্পদ লাভ হয় সকলকে তার ভাগ দেওয়া উচিত ও নিজ পর সকলের আধ্যাত্মিক কল্যাণের জন্য ব্যবহার করা উচিত। হিন্দু সমাজের প্রধান অবলম্বন হলো গৃহস্থ। শিশুদের এমন শিক্ষা দিতে হবে যেন তারা সমাজের সাধারণ কল্যাণ ও সংরক্ষণ করতে পারে। মনুস্মৃতিতে লিখিত আছে: যেমন সব জীবিত প্রাণী বাঁচবার জন্য বায়ুর ওপর নির্ভর করে তেমনই সমাজের অন্য স্তরের মানব তাদের জীবন ধারণের জন্য গৃহস্থদের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু গার্হস্থ্য জীবন ইন্দ্রিয়ভোগের জন্য নয়। শিষ্য উদ্ধবকে কৃষ্ণ এই কথার ওপর জোর দিয়ে বার বার বলেছেন: “গৃহস্থরা সর্বদা মনে রাখবেন আদর্শ কল্যাণ ভোগে নয় জ্ঞানলাভে, যা সম্ভব হয় যখন ব্যষ্টিজীবনকে সমষ্টিজীবনের বা বিশ্বজীবনের অংশ বলে বোধ হয়। ভক্ত গার্হস্থ্য কর্তব্যের মাধ্যমে ভগবদুপাসনা করে, বনে গিয়ে আধ্যাত্মিক নিয়মনিষ্ঠায় জীবন উৎসর্গ করে চিত্ত শুদ্ধ করবেন।”

Advertisement

হিন্দুশাস্ত্র মতে গৃহস্থকে পাঁচ রকম কর্তব্য পালন করতে হবে; ১। দেবপূজা (দেব যজ্ঞ), ২। শাস্ত্রাধ্যয়ন বা বেদপাঠ (ঋষিযজ্ঞ বা ব্রহ্মযজ্ঞ), ৩। সাথীদের বা অতিথিদের সেবা (নৃষজ্ঞ), ৪। পিতৃপুরুষের শ্রাদ্ধাদি করা (পিতৃযজ্ঞ), ৫। ইতর প্রাণীদের রক্ষা করা (ভূতযজ্ঞ)। এই কর্তব্যগুলিকে পঞ্চ মহাযজ্ঞ বলে। এইসব কর্তব্যগুলি একঘেঁয়ে খাটুনিভাবে নয় সেবাভাবে, পূজাভাবে সম্পন্ন করতে হবে। এইভাবে কর্তব্য সম্পাদন জীবকে আবদ্ধ করে না, বরং অধ্যাত্ম-জীবনে উন্নতি লাভে সহায়তা করে। বেদান্ত কর্তব্য, সেবা ও পূজাকে এক সূত্রে গাঁথতে চেষ্টা করে। যদি কোন কর্মকে অধ্যাত্ম-জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা না যায় তবে তাকে কর্তব্য বলা যায় না। যদি দেখ কোন কর্ম তোমাকে ঈশ্বরের থেকে দূরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, তবে তা করবে না। সব কাজই যেন তোমাকে ক্রমান্বয়ে ঈশ্বরের দিকে নিয়ে যায়। কৃষ্ণ যেমন উদ্ধবকে বলেছিলেন:
“যে আমাকে সর্বদা একনিষ্ঠভাবে পূজা করে কর্তব্য সম্পাদনের মাধ্যমে, আমাকেই পরমেশ্বর জ্ঞানে, সে জ্ঞান ও অনুভূতি লাভ করে ও অচিরে আমাকে পায়। সব কর্তব্যই আমার প্রতি ভক্তিভাবে করলে মুক্তির পথে নিয়ে যাবে। পরম শান্তির এই হলো পথ।”
উল্লিখিত পাঁচ প্রকার কর্তব্যের ওপর প্রত্যেক মানবের নিজের প্রতি—স্বীয় উচ্চতর আত্মার প্রতি কর্তব্য আছে। যেহেতু প্রতিটি আত্মা—পরমাত্মারই অংশ—যখন মানব তার উচ্চতর আত্মার প্রতি কর্তব্য সম্পাদন করে, তার অন্যান্য সব দায়িত্বই পালন করা হয়। মানবের উচ্চতর আত্মা তার অভিব্যক্তির, প্রস্ফুটিত হবার অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু তিনি সদাই নিম্নতর আত্মা বা অহং-এর দ্বারা আবৃত হয়ে যাচ্ছেন। 
স্বামী যতীশ্বরানন্দের ‘ধ্যান ও আনন্দময় জীবন’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ