নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: ১০০ দিনের কাজের টাকা মিলবে না। দুর্নীতির অজুহাত দেখিয়ে মঙ্গলবার ফের তৃণমূলকে একথা জানিয়ে দিলেন মোদির মন্ত্রী। আর তাও সংসদে দাঁড়িয়ে। প্রশ্নোত্তর পর্বে বিষয়টি নিয়ে লোকসভায় হয়ে গেল একচোট তুলকালাম। তৃণমূল এমপি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিংয়ের ব্যাপক বিতণ্ডা সরকারের বিমাতৃসুলভ আচরণকেই আরও একবার বেআব্রু করে দিল। আগে তিনিই ছিলেন গ্রামোন্নয়নমন্ত্রী। এখন শিবরাজ সিং। তা সত্ত্বেও ১০০ দিনের কাজের টাকা আটকে রাখার ইস্যুতে গিরিরাজ সিং কটাক্ষ করতেই রাগে ফেটে পড়লেন কল্যাণবাবু। এই বাগযুদ্ধের রেশ টেনেই গ্রামোন্নয়ন রাষ্ট্রমন্ত্রী কমলেশ পাসওয়ান জানিয়ে দিলেন, ‘বাংলা টাকা পাবে না। এটা মোদি সরকার। এখানে কাউকে টাকা কামাতে দেওয়া হবে না। যারাই দুর্নীতি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দু’বছরের উপর বাংলার ১০০ দিনের প্রাপ্য টাকা বন্ধ করে রেখেছে মোদি সরকার। ২০২২ সাল থেকে বাংলার টাকা বন্ধ। পাওনা ৫ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখে বেহাত হয়ে যাওয়া ১ কোটি ৬১ লক্ষ টাকা উদ্ধার করেছে কেন্দ্র। অর্থাৎ কেন্দ্রই স্বীকার করে নিয়েছিল, দুর্নীতি সর্বত্র হয়নি। যা নিয়ে সন্দেহ ছিল, সেই অঙ্ক উদ্ধারও হয়েছে। তাহলে তারপরও টাকা মেলেনি কেন? তৃণমূল সাফ জানিয়েছে, ৭৬টি কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদল এসেছে রাজ্যে। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই রাজ্য যথাযথ উত্তর দিয়েছে। এমনকী, জব কার্ড সংক্রান্ত যাবতীয় ত্রুটি সংশোধন করে তার অ্যাকশন টেকেন রিপোর্টও দাখিল করা হয়েছে কেন্দ্রে। শুধু ১৩ হাজার ৩৭৩ জন শ্রমিকের থেকে ২ কোটি ৪৯ লক্ষ টাকা উদ্ধার বাকি। সেই প্রক্রিয়া চলছে। তা সত্ত্বেও গোঁ ধরে রেখেছে মোদি সরকার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার বলেছেন, কয়েকজনের দুর্নীতির সাজা গোটা বাংলাকে কেন দেওয়া হবে? পুরো বিষয়টাই রাজনৈতিক। এদিন প্রশ্নোত্তর পর্বে সেই সুর টেনেই কল্যাণবাবু বলেন, ‘তিন বছর ধরে আমরা নারেগার বকেয়া মেটানোর দাবি করে আসছি। কিন্তু টাকা দেওয়া হচ্ছে না। বলা হচ্ছে, ২৫ লক্ষ কার্ডে জালিয়াতি হয়েছে। তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে কেন দোষীদের গ্রেপ্তার করছে না কেন্দ্র? আমরাও চাই দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু ২৫ লক্ষের জন্য কেন ১০ কোটিকে ভুগতে হবে? কবে মেটাবেন বকেয়া?’
এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার কথা গ্রামোন্নয়নমন্ত্রীর। সভায় হাজিরও ছিলেন শিবরাজ সিং চৌহান। কিন্তু তিনি জবাব দেননি। পরিবর্তে ব্যাটন ধরেছেন রাষ্ট্রমন্ত্রী কমলেশ পাসওয়ান। স্রেফ জবাবই দেননি, কল্যাণকে কটাক্ষও করেছেন। বলেন, ‘গত ছ’ মাস ধরে দেখছি ওঁর একটাই প্রশ্ন। কেন বাংলার টাকা আটকে? হবে নাই বা কেন? কেন্দ্রীয় টিম বাংলায় গিয়ে দেখেছে, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের নাম বদলে দেওয়া হয়েছে। একই টেন্ডারকে তিনটি ভাগে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় টিমের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে। আর সেই কেন্দ্রীয় টিমের রিপোর্ট দেওয়ার পরেই টাকা আটকেছি আমরা।’ ততক্ষণে অবশ্য কল্যাণের সঙ্গে গিরিরাজের বিতণ্ডা চরমে পৌঁছে গিয়েছে। কল্যাণ বলেন, ‘চোপ’। পাল্টা গলা চড়ান গিরিরাজও। কল্যাণের পাশে দাঁড়িয়ে যান সমাজবাদী পার্টির ধর্মেন্দ্র যাদব। স্পিকারকে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রীকে চুপ করান। উনি সব সময় ডিসটার্ব করেন।’ ক্ষোভে ফেটে পড়ে কল্যাণ বলে বসেন, ‘কে আপনাকে মন্ত্রী বানিয়েছে? কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর এমন আচরণ মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়।’ পাল্টা আইনমন্ত্রী অর্জুনরাম মেঘওয়াল কল্যাণকে বলেন, ‘আপনিও একজন সাংসদ হয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে এমন কথা বলতে পারেন না।’ উভয়পক্ষের বিতণ্ডা বাড়তে থাকায় হস্তক্ষেপ করেন স্পিকার ওম বিড়লা। দু’পক্ষকেই চুপ করান।
এই গোটা প্রেক্ষাপটে তৃণমূলের সাফ দাবি, মমতা আতঙ্কে ভুগছে মোদি সরকার। আর তাই বকেয়া আটকে রাখা তো বটেই, সংসদীয় কার্যে ব্যয়বরাদ্দ বৃদ্ধি সংক্রান্ত অর্থমন্ত্রকের একটি রুটিন কর্মসূচিতেও অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের তীব্র আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে থাকলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর সরকার। বাংলাকে আর্থিকভাবে বঞ্চনা করার দায় এড়াতে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এনে অর্থবরাদ্দ না করার পক্ষেই সওয়াল করলেন অর্থমন্ত্রী। বাজেট বরাদ্দের পর আর্থিক বছরের বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার অতিরিক্ত ব্যয়বরাদ্দ দাবি করে সংসদে সেই দাবি অনুমোদন করানো হয়। স্বাভাবিক এই রীতি। এর সঙ্গেই মণিপুর বাজেটও ছিল আলোচ্য। প্রায় ৬ ঘণ্টা আলোচনার পর সরকারের জবাবী ভাষণে নির্মলা সীতারামন ব্যয়বরাদ্দ অথবা মণিপুর বাজেট নিয়ে সামান্য সময় ব্যয় করলেন। সিংহভাগ গেল তামিলনাড়ু, কেরল এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে আক্রমণ করে। কেন? কারণ এই তিন রাজ্যে আগামী বছর এপ্রিল মাসে ভোট। তাই নির্মলার কাছে পাওয়া গেল আগাগোড়া ভোটের ময়দানী ভাষণ। ‘বাংলাকে বঞ্চনাও করা হবে আবার বদনামও দেওয়া হবে?’ এই অভিযোগ তুলে সৌগত রায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়রা প্রতিবাদে সংসদে ক্ষোভে ফেটে পড়ন। এরপর ওয়াক আউট করেন তাঁরা। তার আগেই একইভাবে ডিএমকে ওয়াক আউট করেছে।