Bartaman Logo
২৯ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মহিলা সংরক্ষণ বিল: এত তাড়া কীসের মোদিজি?

মোদিজি বরাবরই আনপ্রেডিক্টেবল। তবে তিনি যে হঠকারী পদক্ষেপ নেন এমন মোটেও নয়। বরং বেশ হিসাব কষেই পা ফেলেন

মহিলা সংরক্ষণ বিল: এত তাড়া কীসের মোদিজি?
  • ১৫ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০

বিশেষ নিবন্ধ, প্রীতম দাশগুপ্ত: মোদিজি বরাবরই আনপ্রেডিক্টেবল। তবে তিনি যে হঠকারী পদক্ষেপ নেন এমন মোটেও নয়। বরং বেশ হিসাব কষেই পা ফেলেন। এবার হঠাৎ করেই একটি পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি। পেশ করা হবে মহিলা সংরক্ষণ সংশোধনী বিল। সংসদের বাজেট অধিবেশনের পর এজন্য ডাকা হয়েছে তিনদিনের বিশেষ অধিবেশন। শুরু হবে কাল, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল)। প্রশ্ন উঠছে, কেন এত তাড়াহুড়ো? যে বিলটি বছর তিনেক আগে প্রতিটি দলের সায় নিয়ে সংসদে পাশ হয়েছে, তা আবার নতুন মোড়কে কেন? হঠাৎ করে মোদিজি কেন মহিলাদের ক্ষমতায়নের জন্য এত দরদি হয়ে পড়লেন? সবটাই কি অরাজনৈতিক? যেমনটা তাঁর অতি আস্থাভাজন অমিত শাহ ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর লোকসভায় বলেছিলেন। বেশ গর্বের সঙ্গেই অমিত শাহ বলেছিলেন, কিছু রাজনৈতিক দলের কাছে মহিলা সংরক্ষণ রাজনৈতিক ইস্যু হতে পারে। মহিলাদের ক্ষমতায়নের স্লোগান ভোটের হাতিয়ার হতে পারে। মোদিজির কাছে কিন্তু এটি কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়। অর্থাৎ, সবটাই অরাজনৈতিক। নিছক সবকা বিকাশ। এতটাই যদি সবকিছু সরল হত, তবে তো বলার কিছুই থাকত না। এতগুলি প্রশ্ন উঠছে, কারণ মোদিজি এত সরলীকরণ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এটা ভাবাই কঠিন। 

Advertisement

মোদি-অমিত শাহরা যদি সত্যিই মহিলাদের ক্ষমতায়নকে অরাজনৈতিক ভাবতেন, তবে তার একটা ছবি তো চলতি পাঁচ রাজ্যের ভোটের সময়ই দেখা যেত। আমাদের রাজ্যের কথাই ধরুন। ২৯৪ আসন। বিজেপির মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা কত? মেরেকেটে ৩২ (প্রায় ১১ শতাংশ)। বাংলাতে না হয় ধরেই নিলাম গেরুয়াবাহিনীর সংগঠন তেমন শক্তিশালী নয়। অসমে তো সরকারেই রয়েছে বিজেপি। সেখানে তারা গতবারের থেকেও মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে। গতবার ছিল সাতজন। এবার সেই সংখ্যা কমে হয়েছে ছয়। সেখানে পশ্চিমবঙ্গে শাসক দলকে দেখুন। এবার তালিকায় ৫২ জন মহিলা প্রার্থী। শুধু চলতি বিধানসভাই নয়, গত লোকসভা ভোটেও ৩৩ শতাংশের অনেক বেশি মহিলা প্রার্থী ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের। তাই তাদের দলের রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন বলেই দিয়েছেন, অমিত এবং নরেন্দ্র, এটা আপনাদের গুজরাতের জিমখানা নয়। জনগণ ও সাংসদদের উপহাস করাটা এবার বন্ধ করুন। বাংলা ও তামিলনাড়ুর ভোটের আগে এই নাটক বন্ধ রাখুন। আপনার উদ্দেশ্যটাই বিভ্রান্তকর। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গেও লিখেছেন, বিরোধীরা বলেছিল, ২৯ এপ্রিল ভোট শেষ। তারপর সর্বদল বৈঠক ডাকুন। সেখানে আলোচনা করা যাবে। কিন্তু সেকথায় কর্ণপাত করেনি সরকার।
বস্তুত ধোঁয়াশা বজায় রাখা মোদিজি আর তাঁর অতি আস্থাভাজনদেরই রীতি। দেখছেন না, সুপ্রিম কোর্ট প্রশ্ন করছে, এসআইআর নিয়ে এত তাড়া কেন? বিরোধীরা বলছে, একটু সময় নিয়ে আলোচনা করে কাজটা করলে কী ক্ষতি হত? মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার কোনো যথাযথ উত্তর দেননি। আর এই ইস্যুতেও একই পরিস্থিতি। পাঁচ রাজ্যের ভোট চলছে। সেটা শেষ হওয়া পর্যন্তও অপেক্ষা করা যাচ্ছে না? এত তাড়া! নাহলে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে? ভোটের জন্য সবাই তো এখন ব্যস্ত। সেটা মিটলেই তো করা যেত। জুলাইতে তো বাদল অধিবেশন শুরু। আর এমনও নয় যে একেবারে নতুন কিছু সরকার নিয়ে আসছে। এটা তো বছর তিনেক আগেই আইন হয়ে গিয়েছে। তখন বিরোধীরা বলেছিল, এই আইন অবিলম্বে কার্যকর হোক। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনেই বলবৎ হোক নয়া আইন। কিন্তু রাজি হয়নি সরকার। সেবার তারা বলেছিল, আগে জনগণনা। তারপর ডিলিমিটেশন, তারপর সংরক্ষণ। অর্থাৎ, ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে কোনোমতেই নয়। অমিত শাহজি যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন, রাহুল গান্ধীর আসনটাই যদি মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত হয়ে যায়। তিনি বলেছিলেন, রাজনীতি এড়াতেই সরকার আগে কমিশন গঠন করতে চাইছে। সেই কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতেই ঠিক হবে কোন কোন আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত করা হবে। ২০২৯-এর পর মহিলা সংরক্ষণ বিল কার্যকর করা হবে। সেই আইনে বলা হয়েছিল, ডিলিমিটেশন বা আসন পুনর্বিন্যাস কমিশন গঠন করা হবে জনগণনার পর। কিন্তু এখন সরকার আর জনগণনার জন্য অপেক্ষা করতে নারাজ। চলতি বছরেই ডিলিমিটেশন কমিশন গঠন করে ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটেই মহিলা সংরক্ষণ চালু করতে চায়।
আসল কথাটা বলেই ফেলেছেন, কংগ্রেস নেতা মানিকাম ঠাকুর। কী বলেছেন তিনি। ‘এটি হঠাৎ করে নারীর ক্ষমতায়নের প্রতি ভালোবাসা নয়। ২০২৩ সালে তারা বিল পাশ করে একটি ধারা নির্ধারণ করেছিল—প্রথমে জনগণনা, তারপর সীমানা পুনর্নির্ধারণ, তারপর মহিলা সংরক্ষণ। এখন তারা সেটি উলটে দিয়েছে।’ কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রায় সামাজিক ন্যায়বিচার ছিল মূল বিষয়। বিজেপি লোকসভা নির্বাচনে রামমন্দিরকে হাতিয়ার করে আব কি বার চারশো পারের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু সেই স্লোগান মুখ থুবড়ে পড়ে। বিজেপি ৬৩টি আসন হারায় এবং পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও পায়নি। এখানেই শিক্ষা নিয়েছেন মোদিজি। রাহুল গান্ধী নিয়ম করে জাতভিত্তিক জনগণনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। আর মোদিজিও সেই দাবি অগ্রাহ্য করে আসছিলেন। কিন্তু ওই যে শুরুতেই লিখেছিলাম তিনি আনপ্রেডিক্টেবল। তাই যখন দীর্ঘদিনের টালবাহানার শেষে জনগণনার ঘোষণা হল, তখন দেখা গেল এবার সেটা হবে জাতপাত ভিত্তিকই। মানিকামের অভিযোগ, এটাই আসলে তাড়াহুড়োর প্রধান কারণ। যদি জনগণনার পরে মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর হয়, তাহলে ওবিসি মহিলাদের সংরক্ষণ দিতে হবে। কিন্তু তিনি সেটা চাইছেন না। তাই এত আয়োজন। কিন্তু সেই সত্য সামনে আনতে নারাজ সরকার। কারণ তাহলে তো সরল সত্য সামনে চলে আসবে। তাই ধোঁয়াশা বজায় রাখছে মোদি সরকার। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশের অভিযোগ, রেজিস্ট্রার জেনারেল ও সেন্সাস কমিশনার বলেছেন, ২০২৭ সালেই জনগণনার অধিকাংশ ফল পাওয়া যাবে। কিন্তু সেটা মানতে নারাজ সরকার। আসলে জাত গণনাকে হিমঘরে পাঠানোর কৌশল নিয়েছে মোদি সরকার। 
সংসদ এবং রাজ্য বিধানসভাগুলিতে মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে এর আগে অনেকবারই সংবিধান সংশোধনী বিল এসেছে। প্রথম এ সংক্রান্ত বিল লোকসভায় আসে ১৯৯৬ সালে। কিন্তু সেই বিল পাশ হয়নি। আলোচনার আগেই লোকসভা ভেঙে যায়। ফলে সেই বিলের আর কোনো অস্তিত্ব থাকে না। সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে। এরপর ২০০৮ সালে মহিলাদের জন্য এক তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ সংক্রান্ত বিলটি উত্থাপিত হয় রাজ্যসভায়। সেখানে বিলটি পাশও করেছিল ইউপিএ সরকার। কিন্তু দুর্ভাগ্য পঞ্চদশ লোকসভায় বিলটি পাশের আগেই তার মেয়াদ শেষ হয়। ফলে এই বিলটিরও দশা হয় প্রথম তিনটির মতো। কিন্তু ইউপিএ আমলে লোহিয়াপন্থীরা অর্থাৎ সমাজবাদী পার্টি, সংযুক্ত জনতা দল, রাষ্ট্রীয় জনতা দলের মতো একাধিক পার্টি ওই বিলের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। তাদের দাবি ছিল, সংরক্ষণের মধ্যে সংরক্ষণ। তফসিলি জাতি-উপজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির জন্য সংরক্ষণের দাবিতে তুমুল হট্টগোলের মধ্যে ২০১৪ সালে বিলটিই বাতিল হয়ে যায়।  একথা সত্যি, ইউপিএ সরকার যে কাজটি চেষ্টা করেও করতে পারেনি, সেটাই করে দেখায় মোদি সরকার। ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম ২০২৩’ বিলটি লোকসভা এবং রাজ্যসভা উভয় কক্ষেই সর্বসম্মতিতে পাশ করাতে সমর্থ হয় সরকার। এই আইন অনুযায়ী লোকসভা, রাজ্য বিধানসভা এবং দিল্লিতে মোট আসনের এক-তৃতীয়াংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিলে বলা হয়, মহিলাদের জন্য যে আসন সংরক্ষিত থাকবে, তার এক ভাগ সাধারণ শ্রেণির জন্য ও বাকি দুই ভাগ তফসিলি জাতি ও উপজাতির মধ্যে সমভাবে সংরক্ষিত থাকবে। কিন্তু ওবিসিদের কথা কোথাও বলা হয়নি। কিন্তু এবার তো মোদি সরকার জাতভিত্তিক জনগণনা করবে। সেক্ষেত্রে নতুন জনগণনা অনুসারে সংরক্ষণ হলে ওবিসি সংরক্ষণের দাবি আবার জোরালো হতেই পারে। আর রাহুল গান্ধীর তুরুপের তাস এই ওবিসি সংরক্ষণ। তাই সেই অস্বস্তিকর বিষয়টি এড়াতে এখন মরিয়া মোদি সরকার। সরকার এখন ডিলিমিটেশনও করে ফেলতে চাইছে। কিন্তু সেটি ২০২৭ সালের জনগণনার ভিত্তিতে হচ্ছে না। অথচ সেটাই হওয়ার কথা ছিল। হচ্ছে ২০১১ সালের গণনার ভিত্তিতে। সরকার এখনই লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮১৬ করতে চায়। তারপর এক তৃতীয়াংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ। কিন্তু এই বৃদ্ধি তো আবার এত সরল অঙ্কে হচ্ছে না। মোদিজি যতই বলুন, কারও ভাগ কম পড়বে না। সেটা তো অর্ধসত্য। প্রকৃত সত্য হল উত্তর ভারত বেশি লাভবান হবে, দক্ষিণ কার্যত বঞ্চিত হবে। যেমন উত্তরপ্রদেশ আর কেরলের আসনের ফারাক এখন ৬০। প্রস্তাবিত আইনের পর সেই ফারাক বেড়ে দাঁড়াবে ৯০। স্বভাবতই এই জায়গায় আপত্তি তুলছে বিরোধীরা। মোদি সরকার যে মহিলা সংরক্ষণের অছিলায় আসন বাড়ানোর খেলা খেলছে, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। আসলে পরবর্তী লোকসভা ভোট স্রেফ উত্তর ভারত দিয়েই জেতার একটা ছক তিন বছর আগেই তৈরি করে রাখছেন মোদিজি।
কিন্তু মুশকিল হচ্ছে ইস্যুটি বড়োই জটিল। সম্প্রতি ভোট হল কেরল, অসম ও পুদুচেরিতে। তথ্য বলছে, তিন জায়গাতেই পুরুষদের তুলনায় মহিলারা বেশি ভোট দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, এখনকার ভোটের প্রবণতাই হল মহিলা ভোট যাদের সরকার তাদের। তাই মহিলা ভোটকে চটাতে পারবে না কেউই। মোদিজি ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের চিঠি দিয়ে বিলকে সমর্থনের আরজি জানিয়েছেন। কারণ বিলটি পাশের জন্য দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন দরকার। তার জন্য বিরোধী দলকে লাগবে। বিরোধী পক্ষ যদি সমর্থন দেয়, তবে যথারীতি বুক বাজিয়ে কৃতিত্ব নেবেন মোদি। আর বিপক্ষে গেলে তো প্রচার তুঙ্গে তোলা হবে, বিরোধীরা মহিলা সংরক্ষণ চায় না। ফলে তামিলনাড়ু বা পশ্চিমঙ্গের ভোট না হয় ছেড়ে দিলাম, ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটে প্রভাব পড়তে বাধ্য। এমনিতে মোদি ম্যাজিক এখন বেশ ফিকে। এই মহিলা তাস খেলেই আবার নিজের ভাবমূর্তি বাড়ানোর চেষ্টা তাই চালাবেনই নরেন্দ্র মোদি।

সম্পর্কিত সংবাদ