ব্রতীন দাস, জলপাইগুড়ি: একজন রিতু রায়, স্কুলছাত্রী। অন্যজন পুতুল রাউত, প্রৌঢ়া। রিতু এবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। পুতুল পঞ্চাশে পা রাখলেও বিয়ে করেননি। পাশাপাশি দুই শহরে বাস। প্রথমজন ময়নাগুড়ির বাসিন্দা। দ্বিতীয়জনের বাড়ি জলপাইগুড়ি শহরের নেতাজিপাড়ায়। বয়সের পার্থক্য সত্ত্বেও দু’জনের মধ্যে একটা বিষয়ে মিল। প্রথমজন পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের মুখে ভাত তুলে দিতে টোটো চালিয়ে রোজগারের পথ বেছে নিয়েছে। অন্যজন নিজের এবং তাঁর অবিবাহিত দিদির পেট চালাতে রোজ সকালে বেরিয়ে পড়েন টোটো নিয়ে। রোদ, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা হাড় কাঁপানো শীত, কোনও কিছুই দমিয়ে রাখতে পারে না তাদের। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এই দুই অসামান্য নারীর অদম্য লড়াইয়ের সাক্ষী থাকল জলপাইগুড়ি।
শনিবার নারী দিবসের অনুষ্ঠানে জলপাইগুড়ি জেলা পুলিসের তরফে রিতুর লড়াইকে কুর্নিশ জানিয়ে সংবর্ধিত করা হয় তাকে। কিন্তু ফুল-মিষ্টি কিংবা সংবর্ধনার আলোর বাইরে থেকে গিয়েছেন পুতুল। যদিও জীবন সংগ্রাম থামাতে নারাজ জলপাইগুড়ি শহরের প্রথম ওই মহিলা টোটোচালক।
ময়নাগুড়ির সাপ্টিবাড়ির জাবড়ামালি এলাকায় বাড়ি রিতুর। বাবা রবীন রায়। মা গীতা। বাবার একটি হাত অসাড়। সেভাবে কোনও কাজকর্ম করতে পারেন না। মাঝেমধ্যে কীর্তন গেয়ে সামান্য কিছু রোজগার হয়। একটা টোটো কিনেছিলেন চালাবেন বলে। কিন্তু অসাড় হাত নিয়ে তা ঝুঁকির হয়ে যাচ্ছে। ফলে বাড়িতেই পড়ে ছিল টোটো। রবীনবাবুর তিন ছেলেমেয়ে। বড় ছেলে অসমে কাজে গিয়েছে। বাড়িতে দুই মেয়ে। রিতু ও তার দিদি লক্ষ্মী। তাদের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল রবীনবাবুকে। এ অবস্থায় বাবার টোটো নিয়ে রাস্তায় নামে রিতু। মেয়ের এই সিদ্ধান্তে অবাক হয়েছিল পরিবার। আপত্তিও করেছিল। কিন্তু মেয়ের জেদের কাছে হার মানে তারা।
এদিন জেলা পুলিসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রিতুর সঙ্গে এসেছিলেন তার বাবা। বললেন, আমি ঠিকমতো কাজ করতে পারি না। কীভাবে সংসার চলবে তা ভেবে যখন আমরা অস্থির, ঠিক তখনই রিতু আমাদের মাথার উপর ছাতা হয়ে দাঁড়ায়। রিতুর কথায়, আমি যখন প্রথম টোটো নিয়ে রাস্তায় বের হই, অনেকে অনেক কথা বলেছিল। কিন্তু আমি বুঝেছিলাম, এটা না করলে আমার ও দিদির পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে। বাবা-মার মুখে ভাত উঠবে না। রিতুর দিদি আগামী বছর উচ্চ মাধ্যমিক দেবে।
অন্যদিকে, গত ২০১৪ সাল থেকে জলপাইগুড়ি শহরে টোটো চালাচ্ছেন পুতুল। বললেন, বাবা-মার মুখে ভাত তুলে দিতে টোটো চালানোর সিদ্ধান্ত নিই। এখন বাবা-মা কেউ না থাকলেও বাড়িতে অবিবাহিত দিদি রয়েছে। আমিও বিয়ে করিনি। দু’ভাই বিয়ে করে নিজেদের মতো। টোটো চালিয়ে যা রোজগার করি, তা দিয়েই আমার ও দিদির পেট চলে। তাঁর কথায়, প্রথম প্রথম টিপ্পনি ভেসে আসত। সেসব গায়ে মাখিনি। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি, এটাই বড়।