সমৃদ্ধ দত্ত: ৩৯ বছরের এই নারীর নাম রোজা আম্মা! কিন্তু আসলে তিনি শুধুই আম্মা নন। কোনওদিন তিনি বোন। কোনওদিন তিনি কন্যা। কখনও দিদি। চিদম্বরম থেকে ২০ বছর আগে চলে এসেছিলেন চেন্নাই। একটি প্রকাশনী দপ্তরে বাইন্ডিং বিভাগে কাজ করেন। সহকর্মী এবং মালিকপক্ষ জানে যে, রোজা আম্মার মোবাইল ফোন যে কোনও সময় বেজে উঠতে পারে। আর তাহলে আজ একটু তাড়াতাড়ি রোজা আম্মা কাজ শেষ করে চলে যাবেন। আবার হয়তো কাল দেরি করে আসবেন দপ্তরে। তবে কামাই করবেন না। কোথা থেকে ফোন আসে রোজা আম্মার মোবাইলে? পুলিস থানা থেকে। দুর্ঘটনায় মৃত, অপঘাতে মৃত, অথবা আত্মহত্যা, কিংবা হত্যা। অজ্ঞাতপরিচয়। নিয়ম অনুযায়ী ৪০ দিন ধরে মর্গে থাকে সেইসব দেহ। কেউ খোঁজ করতে অথবা নিজেদের ওই মৃতের আত্মীয় পরিজন হিসেবে পরিচয় না দিতে এলে অজ্ঞাতকুলশীলের অন্ত্যেষ্টি করিয়ে দেওয়া হয়। হিন্দু হলে শ্মশানে। মুসলিম বা খ্রিস্টান হলে গোরস্থানে। কিন্তু অজ্ঞাতকুলশীল হলে সর্বদা তো ধর্ম জানা যাবে না! অর্থাৎ ধর্ম পরিচয়ের নিশ্চিত চিহ্ন থাকবেই পোশাক অথবা শরীরে তার নিশ্চয়তা কী? তাহলে তখন উপায় কী? তখন হিন্দুমতেই দাহ করা হয়। কেন? কারণ রোজা আম্মা নিজে তো হিন্দু!
২০ বছর আগে ওই চিদম্বরমে হাসপাতালে গিয়ে একটি বালকের মৃতদেহ দেখেছিলেন রোজা। ১৯ বছর বয়সি রোজা দেখেছিলেন যে, বালকের পরিচয় জানা যায়নি। তাই অনেক দিন মর্গে রাখার পর একে আজ দাহ করে দেওয়া হবে। কিন্তু পারলৌকিক কাজ? কে করবে? পুলিস ও হাসপাতালের কর্মীরা উদাসীনতা সহকারে বলেছিল, যার কেউ নেই, তার আবার পারলৌকিক কাজ কে করবে? এসব আমরা এমনিই সৎকার করে দিই অথবা গোর দিয়ে দেওয়া হয়। আত্মীয়স্বজন না থাকলে সেই অন্ত্যেষ্টির আগের আচার বিচার কে আর করবে? সেদিন রোজার মনে খটকা লাগল যে, যার কেউ নেই তার কি মৃত্যুর সময়ও শেষ ধর্মীয় আচার পাওয়ার ভাগ্য নেই? রোজার বিবাহ হয়ে যায়। স্বামী তাঁকে একদিন ছেড়ে চলেও যায়। একা হয়ে যান রোজা। এবং তারপর থেকে তিনি ঠিক করেছিলেন অজ্ঞাতকুলশীলদের স্বজন হয়ে নিজেই শেষকৃত্যের কাজ করে দেবেন। যখন যে ধর্মের মানুষের এরকম মৃতদেহ আসবে পুলিসের কাছে, তখনই মোবাইল ফোনে ডাক পাঠানো হয় রোজাকে। আগে মোবাইল ছিল না। এখন মোবাইল আসায় সুবিধা হয়েছে। চেন্নাইয়ের রোজা আম্মা কোনওদিন কোনও মৃতের দিদি হন। কোনওদিন মা হন। কোনওদিন কন্যা হন। কোনওদিন বোন হন। কোনওদিন হিন্দু মতে, কখনও খ্রিস্টান মতে, কখনও মুসলিম ধর্মীয় আচার পালন করে অজ্ঞাত এক মৃতের স্বজন হয়ে। তাই রোজা আম্মার কদর সর্বত্র। পুলিস প্রশাসন হাসপাতাল সর্বত্র রোজা আম্মা এক বিস্ময়ের নাম। হাজার হাজার মৃতের আত্মীয় সেজে তিনি শেষকৃত্য পালন করে মৃতদের শেষযাত্রায় একটি অন্তত সম্মান প্রদান করার মিশন নিয়েছেন। আগামী কাল ৮ মার্চ ভারত ও বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে অনেক উজ্জ্বল অনুষ্ঠান হবে। সেইসব আলোকিত অনুষ্ঠানের ফাঁকে ৮ মার্চ নিশ্চিত একবার সময় করে হাত রাখবে রোজা আম্মার কাঁধে!
দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সে (এইমস) দেখা যাবে প্রতিদিন কিছু নারী আসছেন। তাঁরা যাচ্ছেন ফেব্রুয়ারি মাসে চালু হওয়া একটি বিভাগে। বিভাগের নাম পয়োধি। এটি হল মিল্ক ব্যাঙ্ক। সদ্যোজাত সন্তানদের মায়েরা আসেন এখানে। কেন? তাঁদের স্তনের দুধ দান করতে। কারা তাঁরা? যাঁদের কারও হয়তো সন্তান জন্মের কিছুদিন বা কিছু মাস পরই মৃত। কারও হয়তো সন্তান এখনও ইনকিউবেটরে শুয়ে আছে। প্রিম্যাচিওরড ও অত্যন্ত কম ওজনের হওয়ায় হাসপাতালে চিকিৎসারত। সেই মায়েদের অনুরোধ করা হয় আপনারা এসে যদি নিজেদের অতিরিক্ত অব্যবহৃত বুকের দুধ দান করেন কিছুটা, তাহলে মৃত্যুশয্যায় থাকা সদ্যোজাত অন্য শিশুরা বেঁচে যাবে। ফেব্রুয়ারি মাসে এই মিল্ক ব্যাঙ্কের উদ্বোধন কে করলেন? কোনও মন্ত্রী? কোনও ডাক্তার? না। জ্যোতি মান নামক ওই তরুণী। গত বছর যাঁর সন্তান ৯ মাস ধরে ভর্তি এইমসে। ২৯ সপ্তাহের প্রিম্যাচিওরড। ৭৮০ গ্রাম ওজন। পুত্রসন্তানকে ভেন্টিলেটরে রাখা হয়েছিল প্রথমে। তার পক্ষে তো মায়ের দুধ পাওয়া সম্ভব নয়। জ্যোতি মান সেই সময় নার্সদিদি ও ডাক্তারদের অনুরোধে প্রতিদিন নিজের বুকের দুধ দিয়ে গিয়েছেন। ৯ মাসে জ্যোতি মান কতজন শিশুর প্রাণ রক্ষা করলেন? ৩০ জনের। ৯ মাসের মাথায় তাঁর নিজের সন্তানের মৃত্যু হল। সেই জ্যোতি মানের হাতে মিল্ক ব্যাঙ্ক চালু হল। আর এখন অনেক জ্যোতি মান হাজির হন সেই ব্যাঙ্কে। তাঁদের বোঝানোর দায়িত্বে জ্যোতি মান নিজেই। আগামী কাল ৮ মার্চ এইমসের মিল্ক ব্যাঙ্কে একবার যেন ঘুরে যায়!
ক্রেডিট ইউনফর্মেশন কোম্পানি ট্র্যান্স ইউনিয়ন সিবিল এবং নীতি আয়োগের যৌথ সমীক্ষায় চমকপ্রদ একটি তথ্য পাওয়া গেল এই সপ্তাহে। বিগত চার বছরে দ্রুত বেড়েছে গ্রাম-গঞ্জ ও শহরের নারীদের লোন নেওয়ার প্রবণতা। কেন? নিজেদের একক অথবা সম্মিলিতভাবে কোনও ব্যবসা করার লক্ষ্যে। অর্থাৎ তাঁরা সংসারের সুরাহা করতে নিজেরাও কিছু রোজগার করবেন। চার বছরে ১৪ শতাংশ বেড়েছে কম শিক্ষিত নারীদের সাধারণ ব্যাঙ্ক ঋণ নেওয়ার প্রবণতা। আর ৬ শতাংশ বেড়েছে গোল্ড লোন। অর্থাৎ নিজেদের গয়না বন্ধক দিয়ে গরিব মধ্যবিত্ত নারীরা লোন নিচ্ছেন। সবথেকে বেশি কোন ব্যবসায় নারীরা এইসব লোন নিয়ে ঝাঁপ দিচ্ছেন? কেউ বস্ত্রব্যবসা, কেউ তামাকদ্রব্য, কেউ নিজের একটি বিউটি পার্লার খুলছেন, কেউ খাবারের স্টল অথবা খাবার সাপ্লাই দেওয়ার ব্যবসা অথবা পানীয় জল, সফট ড্রিংকস কিংবা টিফিন সার্ভিস চালু করার জন্য। এখানেই শেষ নয়। এইসব ব্যবসা চালু করার কিছু মাসের মধ্যেই সময়মতো লোন পরিশোধের কিস্তি প্রদান করে নারীরা আবার আবেদন করছেন অটো লোনের। কেন? স্কুটি কিনবেন বলে? আচার, বড়ি, গামছা, কাপড়, মিষ্টান্ন তৈরি করে সেই পণ্যের জোগান নিজেরাই দিচ্ছেন স্কুটিতে চেপে চেপে। নীতি আয়োগের রিপোর্ট কী বলছে? বলছে, যাঁরা লোন নিয়ে এই ব্যবসায় ঝাঁপিয়েছেন তাঁদের মধ্যে ৬০ শতাংশ নারী ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের গ্রামীণ অথবা আধা শহুরে এলাকার বাসিন্দা সাধারণ গৃহবধূ অথবা কন্যা। ৮ মার্চ নামক আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৫ সালে এসে হাসতে হাসতে দেখতে পাচ্ছে যে, গ্রাম শহরের এই কিছু একটা করতেই হবে জেদ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া নারীদের সঙ্গে দৌঁড়ে সে কিছুতেই পারছে না। তাকে হাত নেড়ে ওই যে স্কুটিগুলি দ্রুত চলে যাচ্ছে পিছনে প্রোডাক্ট ভর্তি ভারী ব্যাগ নিয়ে।
এই মন ভালো করা ইতিবাচক এবং উজ্জ্বল তথ্য পরিসংখ্যানের ঠিক পাশেই রয়েছে অন্ধকার কাহিনিও। ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ অ্যাপ্লায়েড ইকনমিক রিসার্চের সমীক্ষা রিপোর্ট অত্যন্ত বিষণ্ণ হয়ে লক্ষ করেছে, দেশের বহু প্রান্তের লক্ষ লক্ষ নারীর মধ্যে নানাবিধ প্রতিভা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে উন্নত প্রথাগত সংগঠিত কোনও কর্মস্থলে যোগ দিয়ে আয় করারও যোগ্যতা রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিপুল সংখ্যক নারীকে বাড়ির কাজে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। আনপেইড অর্থাৎ যতটা সময় বাড়িতে অনেক অপ্রয়োজনীয় কাজে এই গ্রাম নগরের গুণী নারীদের নিয়োজিত থাকতে হয়, তার অর্ধেক সময়ও যদি তাঁদের নিজেদের গুণ, প্রতিভা নৈপুণ্য ও যোগ্যতাকে নির্দিষ্ট কোনও উৎপাদন অথবা পরিষেবা কিংবা হস্তশিল্পের ব্যবহার করতে দেওয়া হতো, তাহলে সেইসব পরিবার ও ওই নারীদের জীবনের গতিপথই বদলে যেত। তার বদলে কী হচ্ছে? ৬০ শতাংশ যোগ্য নারী ওয়ার্কফোর্সের বাইরে বসে বসে দেখছেন যে, তাঁদের যোগ্যতা আছে, ইচ্ছা আছে, অথচ কাজে লাগানো হচ্ছে না! সবথেকে আশ্চর্যজনক তথ্য হল, এই তালিকায় নির্বাচিত নারী পঞ্চায়েত সদস্য অথবা প্রধানরাও আছেন, যাঁদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয় না পুরুষতন্ত্র। আন্তর্জাতিক নারী দিবস এই নারীদের কাজ ও সম্মান পৌঁছে দেবে কবে?