Bartaman Logo
১৫ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

সংসারের গণ্ডি পেরিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়েছিলেন বীরভূম জেলার নারীরা

পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বীরভূম জেলার এক উজ্জ্বল ও গৌরবময় অধ্যায় রয়েছে। এই জেলার অগণিত সাধারণ গৃহবধূ এবং নারী নিজেদের সংসারের গণ্ডি পেরিয়ে দেশমাতৃকার সেবায় আত্মবলিদান দিয়েছেন।

সংসারের গণ্ডি পেরিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়েছিলেন বীরভূম জেলার নারীরা
  • ১৫ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বীরভূম জেলার এক উজ্জ্বল ও গৌরবময় অধ্যায় রয়েছে। এই জেলার অগণিত সাধারণ গৃহবধূ এবং নারী নিজেদের সংসারের গণ্ডি পেরিয়ে দেশমাতৃকার সেবায় আত্মবলিদান দিয়েছেন। প্রথাগত শিক্ষার অভাব থাকা সত্ত্বেও তাঁদের জাতীয়তাবাদী চেতনা, আত্মত্যাগ এবং অদম্য সাহস আজও অনুপ্রেরণার উৎস। 

Advertisement

বিশ শতকের গোড়ার দিকে বীরভূমে জাতীয়তাবাদের প্রসারে বড় ভূমিকা গ্রহণ করেছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবার। ১৯০৩সালে তাঁর ভাগ্নী স্বর্ণকুমারী দেবীর কন্যা সরলাবালা দেবী চৌধুরানি ‘বীরাষ্টমী’ ব্রত চালু করেন। এই ব্রতর মাধ্যমে তিনি মহিলাদের লাঠিখেলা, স্বদেশী মন্ত্র এবং জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করার কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে এই আগুন ছড়িয়ে পড়ে গোটা জেলায়। ১৯৪২সালের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে রাঢ়বঙ্গের মাটিতে শান্তিনিকেতনের রানি চন্দের ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়। এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে তিনি কারাবরণ করেন। তাঁর পাশাপাশি শান্তিনিকেতনের নন্দিতা কৃপালনী, এলা দত্ত, মমতা রাও এবং প্রভাসিনী চক্রবর্তীদের মতো অগণিত নারীরা আগস্ট আন্দোলনে শামিল হয়ে কারাবরণ করেন। অন্যদিকে, বীরভূমের লাল মাটিতে স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম মুখ ছিলেন সন্ধ্যারানি সিংহ। ১৯৪১সালের সত্যাগ্রহ এবং ১৯৪২-এর আন্দোলনে তিনি এবং সাবিত্রী গান্ধী, মণিপ্রভা মুখোপাধ্যায়, মায়া ঘোষ, লাবণ্যপ্রভা মুখোপাধ্যায়ের মতো নেত্রীরা শুধু পথে নামেননি, বিপ্লবীদের গোপন আস্তানা ও আহারের ব্যবস্থাও করতেন।
১৯৩০সালের আইন অমান্য আন্দোলনে মল্লারপুরের ‘মাতঙ্গিনী’ খ্যাত সত্যবালা চট্টোপাধ্যায়ের অদম্য লড়াইয়ের অবদান অবিস্মরণীয়। ২৬ জানুয়ারি সিউড়িতে তেরঙা উত্তোলনের জন্য তিনি ২২ মাইল পথ হেঁটেছিলেন। পুলিশের হাতে চরম নিগৃহীত হয়েও তিনি জাতীয় পতাকা হাতছাড়া করেননি। দেশের প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ প্রেমের সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে স্বাধীন ভারতে, যখন তিনি সরকারি ভাতা নিতে অস্বীকার করে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, সন্তান হয়ে মায়ের পরাধীনতা ঘোচানোর জন্য তিনি কোনো অর্থ নেবেন না।
সশস্ত্র বিপ্লবেও বীরভূমের নারীদের অবদান এক অনন্য ইতিহাস রচনা করেছে। জেলার বিপ্লবী আন্দোলনে এমনই এক উল্লেখযোগ্য নাম হল নলহাটির ঝাউপাড়া গ্রামের সাধারণ গৃহবধূ দুকড়িবালা দেবী। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তিনি মনে মনে স্বদেশি মন্ত্রে দীক্ষিত হন এবং পরবর্তীকালে আত্মীয় তথা বিপ্লবী নিবারণ ঘটকের সূত্র ধরে তাঁর বাড়ি হয়ে ওঠে বিপ্লবীদের মূল আখড়া। বিপ্লবীদলে সকলের আদরের ‘মাসিমা’ নামে পরিচিত দুকড়িবালা দেবী বিপ্লবীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অস্ত্রচালনার কলাকৌশলও শিখে নিয়েছিলেন। ১৯১৪সালের ২৬আগস্ট রডা কোম্পানির লুট হওয়া ৫০টি জার্মান মসার পিস্তল ও বিপুল কার্তুজের একটি বড় অংশ তাঁর কাছে এসে পৌঁছালে, অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তিনি তা সামলে রাখার দায়িত্ব নেন। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি, অস্ত্র রাখার অভিযোগে ১৯১৭ সালে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং বিচারে তাঁর দু’বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়। তিনিই ছিলেন বাংলার প্রথম বিপ্লবী মহিলা, যাঁর ওই সময় অস্ত্র আইনে সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছিল। তাঁর মতোই বিপ্লবীদের পরম আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন ‘যুগান্তর’ দলের ‘মেজ পিসিমা’ ননীবালা দেবীও।
বোলপুর পুরসভার প্রথম মহিলা কমিশনার পঙ্কজিনী রায় বা রাজগ্রামের আমোদিনী দাস, সাঁইথিয়ার গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শত শত বীরাঙ্গনার নাম স্বল্প পরিসরে হয়তো উল্লেখ করা সম্ভব নয়। তবে জোতদারের গোলা লুট করে মন্বন্তরে ক্ষুধার্তদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া থেকে শুরু করে বিপ্লবীদের পরম যত্নে আশ্রয় দেওয়া— প্রতিটি ক্ষেত্রেই বীরভূমের এই অগ্নিকন্যারা যে অসামান্য ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন, তা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে আজও।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ