


তন্ময় মল্লিক: প্রথম দফার নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে। তারজন্য নির্বাচন কমিশন কৃতিত্ব দাবি করতেই পারে। কিন্তু, নির্বাচন তো গণতন্ত্রের উৎসব। কমিশন যেভাবে বাংলায় লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করাচ্ছে তাতে গণতন্ত্রের উৎসব হয়ে গিয়েছে যন্ত্রণার ভোট। অধিকার হারানোর যন্ত্রণা। ভোটারদের ভীত সন্ত্রস্ত করতে নামানো হয়েছে সাঁজোয়া গাড়ি। লক্ষ লক্ষ জওয়ানের ভারী বুটের শব্দে বাংলা যেন যুদ্ধক্ষেত্র। তাই উঠছে প্রশ্ন, নির্বাচনের নামে বাংলায় যা চলছে তা গণতন্ত্রের উৎসব, নাকি অধিকার নিধনযজ্ঞ!
প্রথম দফার ১৫২টি আসনে নির্বাচন শুরুর আগেই রাজ্যের মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বাংলার মহিলা ও যুবদের ভোট দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী উৎসাহ দেওয়ার জন্য মহিলা এবং যুবদের বেছে নিলেন কেন?
রাজনৈতিক মহল মনে করে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল সাফল্যের মূল কারণ মহিলা ভোট। সৌজন্যে কন্যাশ্রী, রূপশ্রী এবং লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া শুরু হয় ছাত্রাবস্থায়। শেষ হয় লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে। আর তার গ্যারেন্টি আজীবন। তাই বাংলার মেয়েরা এখন আর ‘বোঝা’ নয়, ঘরের লক্ষ্মী। মেয়েদের এই সম্মান, আত্মমর্যাদা দেওয়ার কথা আগে কেউ ভাবেনি। সেটা বাংলার মা, বোনেরা বোঝেন বলেই পরিবারের নির্দেশ অমান্য করে তাঁরা ভোট দেন তৃণমূলকে। তাই নানান কুৎসা, অপপ্রচার করেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে বারেবারে হার মেনেছে বিরোধীরা। সেই কারণেই নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে লক্ষ লক্ষ মহিলা ভোটারের নাম বাদ দিয়েছে বিজেপি। তারজন্য বিজেপির বিরুদ্ধে মহিলাদের ক্ষোভ সপ্তমে চড়েছে।
এই মুহূর্তে বিজেপির টার্গেট মহিলা ভোট। বিজেপি নেতৃত্ব বুঝেছে, তৃণমূলের মহিলা ভোট ব্যাংক ভাঙতে না পারলে বাংলা দখল অসম্ভব। কিন্তু, কী করলে মহিলাদের কাছে টানা যাবে, তা ভেবে পাচ্ছে না। একদিকে তৃণমূলের ভাতা রাজনীতির বিরোধিতা করছে, অন্যদিকে মহিলাদের মাসে তিন হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিলি করছে কার্ড। কিন্তু, তাতেও চিঁড়ে ভিজছে না। কারণ বাংলার মা, বোনেরা বিজেপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিকে ‘গাজর’ বলেই মনে করেন। এর আগেও বিদেশ থেকে ‘কালাধন’ এনে প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। কিন্তু, পরে অমিত শাহ বলেন, ‘নির্বাচনের আগে এসব কথা বলতে হয়। ওটা জুমলা ছিল।’ ফলে জনসভায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী জোর গলায় মহিলাদের বছরে ৩৬ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বললেও মানুষ কি তা বিশ্বাস করবে?
ছোটোবেলায় একটা কবিতা পড়েছিলাম, ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।’ কারো কথায় নয়, মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মায় তার কাজে। এটা শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, যে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্যও প্রযোজ্য। মানুষ ভোট দেওয়ার আগে প্রার্থী এবং দল কী কাজ করছে, সেটা খতিয়ে দেখে। বাংলার নির্বাচনে মানুষ রায় দেওয়ার আগে বিচার করবে, কোন দল তাদের পাশে ছিল এবং ভবিষ্যতে থাকবে। তাই নির্বাচনি সভায় এসে শুধু প্রতিশ্রুতি দিলেই মানুষ তাঁকে বা তাঁর দলকে ভোট দিয়ে দেবে, এটা ভাবা চরম মুর্খামি।
গত দেড় মাস ধরে মোদিজি বাংলায় এসে নানান প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন। তাতে তাঁর ভক্তরা উল্লসিত হতেই পারেন। কিন্তু, সাধারণ মানুষ বিচার করবে, সত্যিই কি বিজেপি বাংলার উন্নতি চায়? তাহলে কেন কেন্দ্রীয় সরকার বন্ধ করে দিয়েছে ১০০ দিনের কাজ। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিটি নির্দেশ রাজ্য পালন করেছে। ফেরত দিয়েছে কাজ না করিয়ে ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া টাকা। তারপরেও কাজ চালু করেনি। এমনকি, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট গরিব মানুষের স্বার্থে অবিলম্বে ১০০ দিনের কাজ চালুর নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার কর্ণপাত করেনি। বন্ধ করে দিয়েছে আবাস যোজনার টাকাও। সেই সরকারের প্রধান নরেন্দ্র মোদি বা সেকেন্ড ইন কমান্ড অমিত শাহ যতই বলুন তাঁরা বাংলার উন্নতি চান, মানুষ কিছুতেই বিশ্বাস করবে না। যদি তাঁরা সত্যিই বাংলার মানুষের ভালো চাইতেন তাহলে গরিব মানুষের পেটে এভাবে লাথি মারতেন না।
বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, বাংলার মানুষ তৃণমূলের দুর্নীতি, অত্যাচার, অপশাসনে বীতশ্রদ্ধ। মানুষ সরকার পালটাতে চাইছে। সত্যিই যদি মানুষ কোনো সরকারের কাজে ক্ষুব্ধ হয় তাহলে তাকে বাঁচানোর ক্ষমতা স্বয়ং ঈশ্বরেরও নেই। ২০১১ সালে রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকারকে সরানোর জন্য কোনো এসআইআর করতে হয়নি। বাদ দিতে হয়নি লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম। নামাতে হয়নি লক্ষ লক্ষ জওয়ান। সেবারও উৎসবের আবহেই ভোট হয়েছিল। তবুও বদলে গিয়েছিল সরকার। কারণ মানুষ সিপিএমকে আর ক্ষমতায় দেখতে চাইছিল না। তৃণমূলের উপর মানুষের ক্ষোভ যদি সেই জায়গায় পৌঁছায় তাহলে কেউই এই সরকারকে বাঁচাতে পারবে না। কিন্তু সেই রাস্তায় নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ হাঁটতে চাইছেন না। কারণ তাঁরা খুব ভালো করেই জানেন, সরকার পালটানোটা মানুষের নয়, তাঁদের বাসনা। সেই ইচ্ছাপূরণের জন্যই এত আয়োজন।
প্রথম দফার নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। ভোট পড়েছে ৯২ শতাংশের বেশি। ভেঙে গিয়েছে অতীতের সমস্ত রেকর্ড। স্বাধীনতার পর রাজ্যে রেকর্ড পরিমাণ ভোট পড়ায় তৃণমূল এবং বিজেপি উভয়পক্ষই আশায় বুক বাঁধছে। বিজেপি মনে করছে, এটা পরিবর্তনের পক্ষে ভোট। আর তৃণমূল মনে করছে, এটা বাংলার মানুষের অধিকার রক্ষার ভোট। কোন দাবিটা সঠিক সেটা জানা যাবে, ৪মে। তবে, এবারের নির্বাচন নানান কারণে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নির্বাচন কমিশন এসআইআরের নাম করে মানুষের উপর নির্যাতন চালিয়েছে। দিনের পর দিন লাইনে দাঁড় করিয়েছে। তারপরেও কোনো পরিবারের চারজনের, কোনো পরিবারের দু’জনের নাম বাদ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। একই তথ্য প্রমাণ দিয়েও কেন দু’জনের নাম ভোটার তালিকায় উঠল না, তার কোনো উত্তর কমিশন দেয়নি। অনেকেই মনে করছে, কমিশনকে জবাবটা মানুষ নীরবে দিয়েছে ইভিএমে।
বহু বুথেই ইভিএম মেশিন খারাপ থাকার কারণে দেড় থেকে দু’ঘণ্টা পর্যন্ত ভোট বন্ধ ছিল। তা সত্ত্বেও এই গরমে ভোটাররা লাইন ছাড়েননি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। তাৎপর্যপূর্ণ হল, প্রতিটি বুথেই সকাল থেকে পড়েছিল মহিলাদের লম্বা লাইন। যে কোনো অজুহাতে ভোট বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এই আশঙ্কায় মহিলারা রান্নাবান্না না করেই লাইনে দাঁড়িয়েছেন। মহিলা ভোটারদের লাইন যত লম্বা হয়েছে গেরুয়া শিবিরের চিন্তা ততই বেড়েছে। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এবারও মহিলা ভোটই হতে চলেছে অন্যতম ‘ডিসাইডিং ফ্যাক্টর’।
এবারের ভোটে মহিলা ভোট ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মেদিনীপুর জেলা থেকে ভিন রাজ্যে কাজে যাওয়া বিপুল সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিক রাজ্যে ফিরেছেন। অনেকে তৎকাল কোটায় ট্রেনের টিকিট কেটে এদিনই বাড়ি ফিরেছেন। বাড়ি ফিরে বিশ্রাম না নিয়েই পৌঁছে গিয়েছেন বুথে। এর আগেও পরিযায়ী শ্রমিকরা ভোট দেওয়ার জন্য রাজ্যে ফিরতেন। কিন্তু, এভাবে দলে দলে ফেরার ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি। এমন অনেক পরিযায়ী শ্রমিক ভোট দিতে এসেছেন যাঁরা ইদের ছুটি কাটিয়ে কিছুদিন আগেই কর্মস্থলে গিয়েছিলেন। ভোট দিয়েই তাঁরা ফিরে যাবেন।
পরিযায়ী শ্রমিকদের ভোট নিয়ে এই আগ্রহ বিজেপিকে চিন্তায় রাখবে বলেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। তার কারণ বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের গত কয়েক মাস ধরে অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। বাংলায় কথা বলায় ‘বাংলাদেশি’ বলে মারধর করা হয়েছে। থানায় নিয়ে গিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। তাই এসআইআর আবহে তাঁরা যখন গ্যাঁটের কড়ি খরচ করে তৎকাল টিকিট কেটে ভোট দিতে আসেন তখন তাঁদের সমর্থন কোন দিকে যাবে, তা বোঝার জন্য রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ হতে হয় না।