নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: পরনে লাল পাড়ের সাদা শাড়ি। হাতে ফুলের মালা। কপালে চন্দনের তিলক। রোজ সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ত মহিলা। এলাকা ধরে ঘুরে বেড়াত বিভিন্ন মন্দিরে। দেখলে মনে হবে ভগবানের প্রতি নিবেদিত প্রাণ। মন্দিরে ঢুকেই ঠাকুরকে প্রণাম করে শুরু করত কান্না, বলত— ভগবান আমায় ক্ষমা কর। এরপর সোজা পুরোহিতের কাছে গিয়ে ষাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে চরণামৃত খাওয়া। আসলে ভক্ত সেজে মন্দিরে ঢুকে তার টার্গেটই ছিল বিগ্রহের গায়ে কত সোনা বা রুপোর অলংকার রয়েছে, তা দেখে নেওয়া। এরপর ফাঁক বুঝে মন্দিরে ঢুকে সেগুলি হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে যেত মহিলা। চুরির গয়না বাজারে ভালো দামে বিক্রি করত সে। তবে শেষ রক্ষা হল না। বেহালায় একটি মন্দিরে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল ভক্তের ভেকধারী মহিলা। নাম কৃষ্ণা মাইতি। বুধবার রাতে বেহালা থেকেই তাকে গ্রেফতার করে লালবাজার।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বরানগরের বাসিন্দা ওই মহিলা প্রথমে ছোটখাট কাজ করত। কিন্তু যে টাকা রোজগার করত, তাতে সে সন্তুষ্ট ছিল না। বছর পঞ্চাশের ওই মহিলা ঠাকুর দেবতার ভক্ত। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন মন্দিরে যেত। সেখান থেকেই সে প্রতিমার গায়ে থাকা অলংকার হাতানোর ফন্দি আঁটে। সেইমতো সকাল ও সন্ধ্যায় নিয়ম করে বেরিয়ে পড়ত। লাল পাড়, সাদা শাড়ি পরে হাতে ফুলের মালা নিয়ে ঢুকত মন্দিরে। প্রণামী বাক্সেও দান করত কিছু টাকা। তারপর প্রণাম করে চরণামৃত খেয়ে পুরোহিতের সঙ্গে আলাপ জমাতো। জেনে নিত, প্রতিমার অলংকার আসল, নাকি সোনা-রুপোর জলে চোবানো।
কথার ছলে এও জানতো যে, সেগুলি কত ভরির, কে দান করেছেন, কত পুরনো ইত্যাদি। মন্দিরে ভিড় থাকলে বাড়ি ফিরে যেত মাঝবয়সি এই মহিলা। পরে সুযোগ বুঝে এসে অলংকার হাতিয়ে চম্পট দিত। অভিযোগ, এভাবে বেহালা, ঠাকুরপুকুর, পর্ণশ্রী, পূর্ব যাদবপুর, গিরিশ পার্ক, মানিকতলা সহ কলকাতার বিভিন্ন মন্দিরে ঠাকুরের সোনা-রুপোর অলংকার চুরি করেছে এই মহিলা। কয়েকদিন আগে বেহালার একটি মন্দির থেকে রুপোর হার চুরি যায়। অভিযোগ হয় বেহালা থানায়। তদন্তভার হাতে নেয় লালবাজার।
গোয়েন্দারা তদন্তে নেমে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেন। দেখা যায়, এক মহিলা সাদা শাড়ি পরে মন্দিরে প্রবেশ করছে। বেরনোর সময় হাতে একটি ব্যাগ। কয়েকদিন পরে ওই মন্দিরে ফের দেখা গিয়েছে তাকে। আরও কয়েকটি মন্দিরের ফুটেজেও তাকে দেখা গিয়েছে একই পোশাকে। সব ক্ষেত্রেই তার হাতে ওই ব্যাগ ছিল। ওই ব্যাগকে ঘিরেই সন্দেহ ঘনীভূত হয় তদন্তকারীদের।
খোঁজ করতে গিয়ে জানা যায়, মহিলার বাড়ি বরানগর এলাকায়। সন্দেহের বশে তাকে বেহালা থেকে আটক করে লালবাজার নিয়ে আসা হয়। দীর্ঘ জেরায় সে ভেঙে পড়ে গোয়েন্দাদের বলে, ভক্ত সেজে বেহালার মন্দিরে ঢুকে সে নিজেই রুপোর হার হাতিয়েছে।
শুধু এই মন্দিরে নয়, আরও কয়েকটি মন্দিরে গিয়ে একই কায়দায় সোনা ও রুপোর অলংকার হাতানোর কথাও স্বীকার করেছে কৃষ্ণা। চুরি করা অলংকার জুয়েলারি দোকানে গিয়ে মোটা টাকায় যে বিক্রি করেছে, জেরায় সেকথাও কবুল করেছে ওই মহিলা। এরপর তাকে গ্রেফতার করা হয়।