Bartaman Logo
১০ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

ছানি চোখে আঁধারে ভুবন! বাঁশির সুরে জীবনের আলো খোঁজেন বৃদ্ধ গুরুপদ

দুর্গাপুরের ব্যস্ত রাস্তা। হঠাৎ কানে আসে বাঁশির সুর। কেউ ক্ষণিক দাঁড়িয়ে শোনেন। কেউ আবার পথ চলতে চলতে সুরের আস্বাদ নেন।

ছানি চোখে আঁধারে ভুবন! বাঁশির সুরে জীবনের আলো খোঁজেন বৃদ্ধ গুরুপদ
  • ১০ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিধান গঙ্গোপাধ্যায়, দুর্গাপুর: দুর্গাপুরের ব্যস্ত রাস্তা। হঠাৎ কানে আসে বাঁশির সুর। কেউ ক্ষণিক দাঁড়িয়ে শোনেন। কেউ আবার পথ চলতে চলতে সুরের আস্বাদ নেন। মিষ্টি-মধুর সেই সুরের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে আশি বছরের এক বৃদ্ধের দীর্ঘ জীবনসংগ্রামের আলেখ্য। শ্বাস নিঃশ্বেস করে বাঁশি বাজিয়ে চলেন গুরুপদ সিং। 

Advertisement

বৃদ্ধ গুরুপদ এক চোখে দেখতে পান না। অন্য চোখে ঘন ছানি। দৃষ্টিশক্তি প্রায় ক্ষীণ। তবু, হার মানেননি তিনি। আঁধার চোখে বাঁশির সুরে জীবনের আলো খোঁজেন বৃদ্ধ। সেই আলো তাঁর জীবিকা। তাঁর জীবনের শেষ অবলম্বন। শহরের অলিগলিতে বাঁশি বাজিয়ে যেটুকু রোজগার হয়, তা দিয়েই কোনওমতে সংসার চালান। কিছুক্ষণ বাঁশি থামিয়ে শোনাচ্ছিলেন জীবনের  করুণ কাহিনী—‘তখন আমি খুব ছোট। পুরুলিয়া থেকে কাকার হাত ধরে এসেছিলাম দুর্গাপুরে। আসা। কাকা ক্যান্টিনে কাজ করতেন। আমি সাহায্য করতাম। দু’জনের রাত কাটত চিত্রালয় সিনেমা হলে। তখনকার দুর্গাপুর আজকের দুর্গাপুর ছিল না। চতুর্দিক ছিল ফাঁকা ফাঁকা। এত কংক্রিটের জঙ্গল ছিল না। ভরপুর গাছ-গাছালি। ১৯৭৬ সাল। কুমার মঙ্গলম পার্কে মাত্র চার টাকার মাসিক বেতনে মালির কাজ পাই। ধীরে ধীরে বেতন বাড়ে। জীবনটা প্রায় গুছিয়ে এনেছিলাম। চিত্রালয় ছেড়ে তিলকের বস্তিতে এলাম। কিন্তু বাঁধ সাধলো ভাগ্য। একদিন ঘাস কাটার মেশিনে কাজ করার সময় পাথরের একটা টুকরো চোখে এসে লাগল। বহু চিকিৎসকের কাছে ছুটেও লাভ হল না। দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেললাম। কিছুদিন পর হঠাৎ পার্কটি বন্ধ হয়ে গেল। কাজ হারালাম।’ কর্মহীন গুরুপদ। পেট চালাতে বাঁশির সুরকেই সম্বল করলেন তিনি। সেই থেকে বাঁশিই তাঁর নিত্যসঙ্গী। বেঁচে থাকার রসদ। দুর্গাপুরের মোড়ে তাঁর এখন পরিচয় গুরুপদ বাঁশিওয়ালা। সারাদিন বাঁশি শুনিয়ে যা আয় হয় তা নিয়ে ঘরে ফেরেন গুরুপদ। ঘর মানে ফুটো টিনের চাল মাথার উপর। রাতে চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ে ঘরে। বৃষ্টি হলে গুরুপদর বিছানা ভিজিয়ে দেয় জলের ধারা। ক’বছর আগে মেজ ভাই ও তাঁর স্ত্রী মায়া শীল এসে গুরুপদর এই ঘরে উঠেছিলেন। তিন বছর আগে ভাই মারা যান। তাঁর পাঁচ সন্তান থাকলেও তাঁরা কেউই মায়ের দায়িত্ব নিতে চাননি। সেই অসহায় মহিলার দায়িত্ব এখন বাঁশিওয়ালার কাঁধে। 
এদিন আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘আগে মাসে এক হাজার টাকা বৃদ্ধভাতা পেতাম। গত তিন-চার মাস ধরে সেটিও বন্ধ। সরকারি আবাসন পাইনি। ভোট এলে দেশসেবকদের আনাগোনা বাড়ে। প্রতিশ্রুতি দেন। ভোট মিটলে সবাই  অন্তর্ধানে চলে যান। ভ্রাতৃজায়া বিধবাভাতার জন্য বহুবার আবেদন করেছি, পাইনি।’ক্ষোভ থাকলেও জীবন-যুদ্ধে হেরে যাননি গুরুপদ। প্রতিদিন নতুন ভোরে বাঁশি হাতে বেরিয়ে পড়েন। বাঁশিতে সুর তোলেন জীবনের জয়গানের। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ