সংবাদদাতা, বোলপুর: বংশের পর বংশ। বদলায়নি পুজোর নিয়ম। বদলায়নি ভক্তির আবহও। বোলপুরের অদূরে পাড়ুই থানার মনোহরপুর গ্রামের পশ্চিমপাড়ার ভট্টাচার্য বাড়ির দুর্গাপুজো এভাবেই শতাধিক বছর পেরিয়েছে। স্থানীয়দের কাছে এই পুজো ‘গোঁসাইমার পুজো’ নামে পরিচিত।
কথিত আছে, দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়েই কাশী থেকে মনোহরপুরে এসেছিলেন ভট্টাচার্য পরিবারের এক পূর্বপুরুষ। তাঁর হাত ধরেই শুরু হয় পুজো। সেই সময়ের রীতি মেনেই আজও পুজো চালিয়ে যাচ্ছেন পরিবারের উত্তরসূরিরা। এই বাড়িতে এক চালায় পূজিতা হন দশভূজা দেবী, সঙ্গে থাকেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। মহালয়ার পরের দিন হয় বোধন। সেদিন থেকেই শুরু নারায়ণ সেবা। মহাপঞ্চমী পর্যন্ত প্রতিদিন পাড়ার মানুষদের নারায়ণ সেবা দেওয়া হয়। ফলে পুজো ঘিরে একাত্ম হয়ে ওঠে গোটা পাড়া।
এই পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব সপ্তমীর রাতের বিশেষ পুজোর রীতি। দিনের পুজোর পর সারা রাত ধরে চলে আরাধনা। স্থানীয়ভাবে যা ‘অর্ধরাত্রিবিহিত পুজো’ নামে পরিচিত। দেবীর ঘটও এখানে সাধারণ ঘট নয়। তাকে বলা হয় ‘গোঁসাই ঘট’। পুজো হয় পঞ্চমুণ্ডির আসনে। মন্দিরের ঈশান কোণে রয়েছে ভৈরবের স্থান।
সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে পাঁঠা বলির রীতিও রয়েছে এখানে। নবমীতে হয় প্রসাদ বিলি। পুজোর টানে আশপাশের ডাঙ্গাপাড়া, যাদবপুর, ভীমপুর সহ বিভিন্ন গ্রাম থেকেও বহু মানুষ আসেন। ভক্তদের বিশ্বাস, দীর্ঘদিনের এই পুজোয় মানত করলে দেবীর আশীর্বাদ মেলে।
বর্তমানে ভট্টাচার্য পরিবারের অনেক সদস্যই বোলপুরে থাকেন। তবে পুজোর সময় সকলেই ফিরে আসেন মনোহরপুরের বাড়িতে। পুজোর কয়েকটি দিন তাই পুরানো বাড়িই হয়ে ওঠে পরিবারের মিলনক্ষেত্র।
পরিবারের প্রবীণ সদস্য দেবীপ্রসাদ ভট্টাচার্যর কথায়, আমাদের পূর্বপুরুষরা যে নিয়মে পুজো শুরু করেছিলেন, সেই নিয়মই এখনও মেনে চলছি। সময় বদলেছে। অনেক কিছুই বদলেছে। কিন্তু পুজোর রীতিতে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। পরিবারের নতুন প্রজন্মও এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে আগ্রহী।
জানা গিয়েছে, দেবীর নামে পরিবারের নির্দিষ্ট জমি-জায়গাও রয়েছে। সেই সম্পত্তি ও পরিবারের সহযোগিতাতেই বছরের পর বছর ধরে পুজোর আয়োজন চলে। শতবর্ষের দোরগোড়া পেরিয়ে এই পুজো এখন শুধু একটি পরিবারের নয়, মনোহরপুরের মানুষের কাছেও তা হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যের অংশ।



