হাতে গোনা আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা। তারপরই শিশিরসিক্ত ঘাসে পা ডুবিয়ে শীতের সকাল ছুঁয়ে দেখার সুযোগ মিলবে। আর সুযোগ মিলবে বাড়ির ছোট্ট বাগানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়ার। বেশিরভাগ বাঙালি প্রকৃতিবিলাসী। তুমুল ব্যস্ততার জীবনেও তাই সবুজের প্রতি টান রয়েছে ষোলো আনা। এই টান থেকেই বাড়িতে বাগান করার শখ কমবেশি সকলেরই। রঙিন বাহারি ফুলে ভরে ওঠা চারপাশ দেখতে কার না ভালো লাগে বলুন! কিন্তু সমস্যা যে অন্যত্র। ইট, কংক্রিটের মাঝে বাগান করার জায়গা কোথায়? গাছের যত্নই বা হবে কীভাবে? সার দেওয়াও তো কম ঝক্কির কাজ নয়! তবে সহজ কিছু উপায় মাথায় রাখলেই ছোট জায়গাতেও স্বপ্নের বাগান তৈরি করা সম্ভব।
কম জায়গায় বাগান
বাড়িতে বাগান করার চিন্তাভাবনা থাকলে প্রথমেই যে চিন্তা মাথায় ঘোরাফেরা করে— জায়গা কোথায়? এখনকার শহুরে জীবনে ঘরের বাইরে বা চারপাশে বাগানের জায়গা পাওয়া সত্যিই সমস্যার। একটুকরো ফ্ল্যাটে গাছের জন্য কি আলাদা জায়গা দেওয়া সম্ভব? তবে ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। বাড়ির বারান্দা জুড়ে বা জানলার ধার ঘেঁষে সহজেই শীতের বাগান করা সম্ভব। এতে আপনার ঘরের সৌন্দর্য দ্বিগুণ হবে।
প্রথমেই এমন একটি জায়গা নির্বাচন করুন যেখাবে পর্যাপ্ত আলো, বাতাস ঢোকে। সেখানে ছোট বা মাঝারি টব বসিয়ে গাছ লাগান। টবের ব্যবস্থা না করতে পারলেও চলবে। পুরনো বালতি, বোতল, বা টিফিন বক্সেও গাছ লাগানো সম্ভব। আপনার সৃজনশীল মনন দিয়ে বালতি বা বোতলের গায়ে রঙিন নকশা করে দিন। দেখতে আরও ভালো লাগবে। অনেকে ফ্ল্যাটে থাকেন। বারান্দার একপাশে জায়গা বের করা কঠিন। তাঁরা জানলায় ভার্টিকাল বাগান তৈরি করতে পারেন। এখন কিন্তু এই ধরনের বাগান বেশ ট্রেন্ডি। আমরা সাধারণত পাশাপাশি টব বসিয়ে বাগান করার চিন্তা করি। কিন্তু ভার্টিকাল বাগানের ক্ষেত্রে টব বসানো হয় উপর-নীচে। ঝুলন্ত পাত্র বা বোতল কেটে তার মধ্যে মাটি ভরে গাছ লাগানো হয়। এতে জায়গাও বাঁচে আর দেখতেও দারুণ লাগে। তবে ভার্টিকাল বাগানের ক্ষেত্রে গাছ নির্বাচনের সময় খেয়াল রাখতে হবে— খুব বেশি ঝাঁকড়া গাছ উপরের দিকে ঝুলিয়ে রাখলে তা পড়ে গিয়ে বিপদ ঘটতে পারে।
গাছ নির্বাচন
শীতকাল বাগান করার জন্য আদর্শ সময়। তবে আপনার বাগানে কোন ধরনের গাছ রাখবেন, তা নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রাথমিক ধাপ। এই সময় মূলত ফুলের গাছের চাহিদা বেশি থাকে। বাগান রংবেরঙের পাপড়িতে সেজে উঠুক, এমনটা সকল বাগানপ্রেমীই চান। সে কারণে গাঁদা, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, গোলাপ, জবার মতো ফুল আপনার বাগানে থাকতেই পারে। আবার পিটুনিয়া, অ্যান্থুরিয়াম, প্যানসি, ক্যালেন্ডুলা, কার্নেশনের মতো ফুলও আপনার বাগানের শোভা বাড়াবে। যে কোনও নার্সারি থেকে সহজেই পছন্দমতো এই গাছের চারা আনতে পারেন।
গাছের যত্ন
গাছের উপযুক্ত যত্নই বাগানের প্রাণ। শীতকালে সূর্যের আলো তুলনামূলক কম থাকে, তাই গাছকে এমন জায়গায় রাখতে হবে যেখানে রোদ প্রতিদিন কমপক্ষে ৫–৬ ঘণ্টা পড়ে। গাছের গোড়ার মাটি মাঝে মাঝে আলগা করে দিন। এতে বাতাস চলাচলে সুবিধা হয়। মাথায় রাখবেন, শীতে অতিরিক্ত জল না দেওয়াই ভালো। কারণ ঠান্ডায় মাটিতে জল জমে গেলে শিকড় পচে যায়। সকালে বা দুপুরে হালকা জল দেওয়া শ্রেয়। শুকনো পাতা বা মরা ফুল নিয়মিত কেটে ফেললে গাছে নতুন কুঁড়ি গজাতে পারে। নিমপাতার রস বা জৈব কীটনাশক ব্যবহার করলে পোকামাকড়ের উপদ্রব হয় না। গাছও সুস্থ থাকে।
গাছের সার
গাছের বেড়ে ওঠার জন্য চাই সঠিক পুষ্টি। মাটি থেকে সর্বদা সেই পুষ্টিগুণ গ্রহণ করতে পারে না গাছ। সে কারণে দরকার পড়ে সারের। বাজারে রাসায়নিক সারের অভাব নেই। তবে পরিবেশের কথাও মাথায় রাখা উচিত। প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে বাড়িতেই সার তৈরি করতে পারেন। গাছে ভালো ফলন পেতে হলে জৈব সার সবচেয়ে উপকারী। প্রথমত, রান্নাঘরের বর্জ্য যেমন সব্জির খোসা, ফলের খোসা, ডিমের খোসা, চা পাতা, শুকনো পাতা ইত্যাদি মাটির নীচে পুঁতে রাখলে কয়েক সপ্তাহে প্রাকৃতিক সার তৈরি হয়। আবার, একটি বালতিতে গোবর, নিমপাতা ও জৈব বর্জ্য মিশিয়ে কয়েক দিন রেখে দিয়ে তরল সারও তৈরি করা যায়। এই প্রাকৃতিক সার মাটিকে উর্বর রাখে এবং রাসায়নিক সার ব্যবহারের প্রয়োজন কমায়। এছাড়া নার্সারি থেকে আনতে পারেন ভার্মিকম্পোস্ট সার। কেঁচোর মাধ্যমে তৈরি এই সারে গাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে। এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ে।
ফুল আসছে না জল, আলো, বাতাস— সবই রয়েছে পর্যাপ্ত। যত্ন নেওয়াও হচ্ছে, পোকাও ধরেনি, তা সত্ত্বেও গাছে ফুল আসছে না। এই সমস্যার মুখে পড়েন অনেকেই। এর সমাধানও রয়েছে হাতের মুঠোয়। পুরনো টবের মাটি দুই-তিন মাস পরপর বদলে দিন। এতে পুষ্টির ভারসাম্য ঠিক থাকে। জৈব তরল সার স্প্রে করুন। প্রয়োজনে কাছের কোনও নার্সারিতে যোগাযোগও করতে পারেন। তাঁদের পরামর্শ মতো চললে গাছে ফুল আসবেই। সবশেষে যেটা মনে রাখা জরুরি, তা হল ভালোবাসা। ভালোবাসলে, যত্ন করলে গাছ সাড়া দেবেই।
শান্তনু দত্ত