মুম্বই: আবেগের বিস্ফোরণের সাক্ষী থাকল ডি ওয়াই পাতিল স্টেডিয়াম। ম্যাচে যবনিকা পড়তেই টিম ইন্ডিয়ার উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ল কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারি পর্যন্ত। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে হাসিকান্নার সফর শেষ। চোয়ালচাপা লড়াইয়ের কাছে হার মানল দক্ষিণ আফ্রিকা। গ্যালারি থেকে অভিনন্দন জানাতে ব্যস্ত কিংবদন্তি শচীন তেন্ডুলকর, রোহিত শর্মা, ভিভিএস লক্ষ্মণরা। গ্যালারির নীল রং এক মুহূর্তে মিশে গেল ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকার মধ্যে। দেশের প্রতিটি প্রান্তে থাকা মহিলারা শুধু নন, পুরুষদের কণ্ঠেও তখন ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা...’। কোচ অমল মুজুমদার দৌড়ে ঢুকলেন মাঠে। জড়িয়ে ধরলেন তাঁর বীরাঙ্গনাদের।
ম্যাচ শুরুর আগে সুনীধি চৌহানের জাতীয় সংগীতে আবেগ ও দেশপ্রেম মিলেমিশে একাকার। সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হরমনপ্রীত-রিচাদের চোখেমুখেও জনগণের মন জেতার আত্মবিশ্বাস। শঙ্খধ্বনিতে টিম ইন্ডিয়াকে বরণ করে নিতে ব্যস্ত ক্রিকেটপ্রেমীরা। অস্ট্রেলিয়ার হোবার্টে মুঠোফোনে প্রমীলা ব্রিগেডের দিকে চোখ সূর্যকুমার-শুভমানদের। উৎসবের বোধন যে তখনই।
অক্টোবর মাসটাই মহিলাদের। দুগ্গাপুজো বা দশেরা, কালী, জগদ্ধাত্রী কিংবা ছট মাইয়ার। রয়েছে অশুভ শক্তিকে বিনাশ করার জন্য দীপাবলি। আর নভেম্বরের গোড়াতেই রবিবার ক্রিকেটবিশ্ব দেখল, ভারতের নারীশক্তির উত্থান। সমাজের যাবতীয় ভেদাভেদকে শিকেয় তুলে স্মৃতি-জেমাইমাদের বিশ্বজয় ইতিহাসে পাতায় কোনওদিন ধূসর হবে না। সত্যিই, ধন্যি মেয়েদের কীর্তি উদ্বুদ্ধ করবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও।
খেলা শুরুর সময়েই বৃষ্টি। দু’ঘণ্টা পরে আরম্ভ হল ম্যাচ। টস জিতে ভারতকে ব্যাট করতে পাঠায় দক্ষিণ আফ্রিকা। নেলসন ম্যান্ডেলার দেশ জানত, হরমনপ্রীতরা রান তাড়ায় ওস্তাদ। তাই ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন লরা উলভার্ট। দুই ওপেনার স্মৃতি মান্ধানা ও শেফালি ভার্মার ব্যাট ক্রমশ আশা জাগায়। ১৮তম ওভারে শতরানের গণ্ডি অতিক্রম করে ভারত। এরপরেই প্যাভিলিয়নে ফেরেন স্মৃতি। কিন্তু মহিলা ক্রিকেটের ‘বীরু’ শেফালি যে অকুতোভয়। শেফালি জানতেন, প্রতীকা রাওয়ালের চোটের কারণে পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা সুযোগ দেশের স্বার্থে তাঁকে কাজে লাগাতে হবে। তবে রানের গতি বাড়াতে গিয়ে এদিন শতরান মাঠেই রেখে এলেন রোহতকের কন্যে। এরপর অজি বধের মহানায়িকা জেমাইমা (২৪) ও হরমনপ্রীত (২০) তাড়াতাড়ি আউট হলেও দর্শকরা ডোন্ট কেয়ার। প্রতিটি বাউন্ডারি তো বটেই, সিঙ্গলস নিলেও শব্দব্রহ্ম ছড়িয়ে পড়ছিল গ্যালারির এক ব্লক থেকে আরেক ব্লকে। লড়াকু দীপ্তি তখন ইনিংস গড়তে ব্যস্ত। এই দল তো শুধু তাঁর নয়, তাঁদের নয়, ভারতের প্রতিটি নারীর আত্মত্যাগের ফসল।
শেষদিকে দীপ্তির ব্যাটে যখন অনুষ্কা শঙ্করের সুরঝংকার, তালবাদ্য নিয়ে হাজির এই বাংলার থুড়ি, গোটা ভারতের রিচা ঘোষ। ডিপ এক্সট্রা কভারের উপর দিয়ে বল বাউন্ডারির বাইরে পাঠালেন তিনি। স্ত্রী রীতিকার পাশে বসা রোহিতের মনে হল, আরে এ তো আমিই। তাই ৫০ ওভারের শেষে ভারতের রান ২৯৮’তে থামলেও আশায় বুক বাঁধল সব্বাই।
দক্ষিণ আফ্রিকার পরিকল্পনা ছিল, অহেতুক ঝুঁকি না নেওয়া। ক্যাপ্টেন উলভার্ট এই ম্যাচের ট্র্যাজিক হিরোইন। বাকিদের যাওয়া-আসা, শুধু স্রোতে ভাসা সত্ত্বেও টিম ইন্ডিয়াকে টেনশনে রেখেছিলেন তিনি। হারলেও উলভার্টের এই শতরানের (১০১) ইনিংস বহুদিন মনে রাখতে হবে। বল হাতে ভারতের সেরা অবশ্যই দীপ্তি। তাঁর ৫ উইকেটই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেরা শিকার উলভার্ট। দীপ্তির দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন শেফালি। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা থামল ২৪৬-এ। ভারত জিতল ৫২ রানে।