Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দুর্নীতির কারখানার প্রোডাক্ট, ডাক্তারে আস্থা থাকবে?

‘নামকরা ডাক্তাররা ঠিক বৈজ্ঞানিক নন। তাঁরা অপর বৈজ্ঞানিকদের আবিষ্কারকে প্রয়োগ করেন মাত্র। প্রয়োগ করে’ পয়সা রোজগার করেন। তাঁরা অনেকটা কেরানীর মতো।

দুর্নীতির কারখানার প্রোডাক্ট, ডাক্তারে আস্থা থাকবে?
  • ৮ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: ‘নামকরা ডাক্তাররা ঠিক বৈজ্ঞানিক নন। তাঁরা অপর বৈজ্ঞানিকদের আবিষ্কারকে প্রয়োগ করেন মাত্র। প্রয়োগ করে’ পয়সা রোজগার করেন। তাঁরা অনেকটা কেরানীর মতো। আবিষ্কর্তা বৈজ্ঞানিক যে প্রেরণার আনন্দে বিভোর হ’য়ে থাকেন সে আনন্দ কখনও স্পর্শ করে না সাধারণ জেনারেল প্র্যাকটিশনার ডাক্তারের চিত্তকে। জেনারেল প্র্যাকটিশনারের একমাত্র লক্ষ্য জনপ্রিয় হওয়া এবং জনপ্রিয় হওয়ার উদ্দেশ্য উপার্জন।’

Advertisement

বহু বছর আগে এই সার কথাটা লিখে গিয়েছিলেন বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। বনফুল। বাবা ছিলেন ডাক্তার। নিজেও ডাক্তারিটা পাশ করেছিলেন মেডিক্যাল কলেজ থেকে। ও পথে খুব বেশিদূর না এগলেও ডাক্তারির সারমর্মটা জানতেন। দর্শনটাও। তাই এই কথাগুলো লিখতে পেরেছিলেন। কিন্তু দূরদর্শী ছিলেন কি তিনি? দেখেছিলেন ভবিষ্যতে আর ডাক্তার পাশ করে বেরবে না? তৈরি হবে সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ নামক কারখানায়? উপার্জনটাই হবে শেষ কথা! তা সে কারখানার মালিকের হোক, কিংবা প্রোডাক্টের? বনফুল যেখানেই থাকুন, তাঁকে খুব বলতে ইচ্ছে হয়... এক অদ্ভুত সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি আমরা। আপনার সদাশিব ডাক্তার বা অগ্নীশ্বর স্রেফ গল্পের পাতাতেই ফুরিয়ে গিয়েছে। এখন টাকার খেলা। নিটে র‌্যাঙ্ক দখলে, মেডিক্যালে ভর্তিতে, আর যে মেডিক্যাল কলেজে ছাত্রছাত্রীরা একবুক স্বপ্ন নিয়ে পড়তে যাবে, সেখানকার বৈধতা রক্ষায়। পরিকাঠামো নেই, শিক্ষকও না। তারপরও কোন জাদুমন্ত্রে জোগাড় হয়ে যাচ্ছে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কাউন্সিলের অনুমোদন? এই প্রশ্ন তুলেছে খোদ সিবিআই। কেন্দ্রীয় সরকার নামক আতাগাছের তোতাপাখিটি। তারা এই পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির চূড়ায় বসিয়েছে এনএমসি এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রকের কিছু অফিসারকে। মনে রাখতে হবে, এই স্বাস্থ্যমন্ত্রক কিন্তু মোদি সরকারের অধীন। আপনারা জানেন, তাও মনে করাতে হচ্ছে। কারণ, আমাদের বড্ড ভুলো মন। দুর্নীতি ইস্যুতে নরেন্দ্র মোদির জিরো টলারেন্স নীতি, ‘না খাউঙ্গা না খানে দুঙ্গা’ স্লোগান হয়তো আমরা ভুলে গিয়েছি। তাই এই বিনীত রিমাইন্ডার। দুর্নীতিকে শিল্পের পর্যায় নিয়ে যাওয়া কাকে বলে, সেটা এই সরকার দেখিয়েছে। তাই তো হাজার হাজার কোটি টাকা খরচে তৈরি জাতীয় সড়ক দিয়ে নদীর মতো জল বয়ে যায়। সেখানে তৈরি গর্ত একটা আস্ত গাড়ি গিলে নিতে পারে। নরেন্দ্র মোদির দাবি ছিল, তিনি নাকি এই সড়ক বানানোর জন্য স্পেস টেকনোলজি ব্যবহার করেছেন। অমৃতসর-জামনগর এক্সপ্রেসওয়ে, গোয়ালিয়র, জয়পুর... গিয়ে দেখতে পারেন। স্পেস টেকনোলজি খুঁজে না পেলেও রাস্তার মাঝখানে প্রচুর স্পেস পাবেন। বিমান কেনার চুক্তি হয় একরকম, ডেলিভারির সময় শোনা যায় অন্যরকম! যাবতীয় সরকারি বরাত বাছাই করা কর্পোরেট বন্ধুরা পেয়ে যান, তারপরও নাকি মোদি সরকার স্বচ্ছতার প্রতীক হয়ে নানা মঞ্চে জ্বলজ্বল করে। পাটনা থেকে গোধরা... ডাক্তারির প্রবেশিকা পরীক্ষা, অর্থাৎ নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। সিবিআই জানতে পারে, এক একটি প্রশ্নপত্রের জন্য ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। গুজরাতে এক শিক্ষকের টিউটোরিয়ালে বলা হয়েছে, ফাঁকা খাতা ছাড়তে। বিনিময়ে? মোটা টাকা। এমন নম্বর পেয়ে কোনও কোনও পরীক্ষার্থী র‌্যাঙ্ক করেছেন, যা অঙ্কের নিরিখে আসে না। গ্রেপ্তারির সংখ্যা বাড়তে থাকে। তারপরও অবশ্য সরকার একে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই বর্ণনা করে। পরীক্ষার্থীদের পুরো প্যানেলও বাতিল হয় না। অর্থাৎ, এই প্রার্থীরা এখন ডাক্তারি ছাত্র। টাকা খাইয়ে। সরকারি-বেসরকারি কলেজে। কেমন হতে পারে সেই বেসরকারি কলেজ? হয়তো সেখানে পরিকাঠামো নেই। কিংবা শিক্ষক আছেন শুধু খাতায় কলমে। তারপরও তাঁরা অনুমোদন পেয়েছেন। কীভাবে? অন্দরমহলের খেলায়। আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কবে পরিদর্শক যাবেন এবং কে কে যাবেন। সেই মতো পাতা হয়েছে বেড। ‘রোগী’ তাতে শুয়ে পড়েছেন। ডাক্তারও ‘চিকিৎসা’ শুরু করে দিয়েছেন। ঠিক ওই ‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’ ছবিতে কিডন্যাপিং রুমটা আধ ঘণ্টায় দাতব্য হাসপাতালে বদলে যাওয়ার মতো। পরিদর্শক আসছেন, দেখেছেন, সার্টিফিকেট দিয়েছেন। বিনিময়ে? অন্দরমহলে পৌঁছে গিয়েছে টাকার বান্ডিল। তাও নাকি হাওলার মাধ্যমে! বাজারে কান পাতলে কতই না ‘গুজব’ শোনা যায়। এমবিবিএস কোর্সে ভর্তির দর ওঠে কোটি টাকায়। এনআরআই কোটার আসনই সবার আগে ভর্তি হয়। নামের পাশে এমডি লিখতে চাইলে নাকি ৮ থেকে ১০ লক্ষ টাকাতেই মিলে যায় সার্টিফিকেট। আর পরে শংসাপত্র নিতে চাইলে ৩০ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা। নিশ্চয়ই গুজব? কারণ সত্যি বলে যে মানতে ইচ্ছে হয় না। নাড়ি টিপে, বা চোখের দেখা দেখে রোগীর রোগ বলে দেবেন, এমন ধন্বন্তরী আমরা আজকের বাজারে আশা করি না। কিন্তু পড়াশোনা করে ডাক্তারি করতে আসবেন... এতটুকু চাহিদাটাও কি অপরাধ? 
দুর্নীতি হচ্ছে। খুল্লামখুল্লা। আমরা দেখছি। শুনছি। হজমও করছি। দিল্লি, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়... কোথায় নেই এই চক্র? তারা দুর্নীতি করছে। কামাচ্ছে। আর সেই ঘুষের সামান্য কিছু অংশ দিয়ে মন্দির বানিয়ে দিচ্ছে। ব্যস! সব পাপ মাফ। ঈশ্বরের কাছে। সরকারের কাছে তো বটেই। এটাই এখন ডাক্তারি কারখানার আসল ছবি। শুধু প্রোডাক্টে মন দাও। কোয়ালিটি চুলোয় যাক। যেমন ডিমান্ড, তেমন সাপ্লাই। ডিমান্ড বাড়লে টাকার অঙ্কও বাড়বে। ঠিক বিমানের টিকিটের মতো। পকেট ফুলে ফেঁপে উঠবে। বখরা পৌঁছে যাবে প্রশাসনের নানা স্তরে। কোনও না কোনও পার্টি ফান্ডে। ব্যবসা চলবে দেদার। ডাক্তার নামক প্রোডাক্ট তৈরির ব্যবসা। যারা হয়তো ভবিষ্যতে সার্টিফিকেট হাতে কলেজ থেকে বেরবে। চেম্বার খুলবে। বাইরে লেখা থাকবে লম্বা ডিগ্রি। কিন্তু আমরা কি পারব, সেখানে ভরসা করে যেতে? একবারও কি মনে হবে না যে, এই ডাক্তার ঠিকমতো প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হয়েছিল তো? পড়াশোনার পর পাশ করেছিল? নাকি...? মানুষ ডাক্তারের কাছে যায় এবং নিজের সর্বস্ব সঁপে দেয়। সে রোগ বোঝে না। ডাক্তার বোঝে। সে ওষুধ জানে না। ডাক্তার জানে। কী খেলে, আর কী খাওয়া বন্ধ করলে সে সুস্থ হয়ে উঠবে, জানা নেই তার। ডাক্তার জানে। অন্ধের মতো তাই ডাক্তারের নির্দেশ মেনে চলে সে। এটা কি অপরাধ? তার সুযোগ নেবে শাসকের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা চক্র? অফিসার? ধর্মগুরু? নাঃ, এতটা দূরদর্শিতা হয়তো বনফুলেরও ছিল না। তাঁর গল্পে উপন্যাসে চিকিৎসকরা হয়তো খিটখিটে ছিলেন। কিন্তু তাঁদের মতো মানবদরদি খুঁজে পাওয়া যেত না। তাঁরা বাড়িতে রোগী দেখতে গিয়ে যখন আবিষ্কার করতেন, এই পরিবারের ভিজিট দেওয়ার সামর্থ্য নেই... ভিজিটের টাকাটা রেখে আসতেন রোগীর বালিশের পাশে। মেছুনিকে উপযাজক হয়ে প্রশ্ন করেন, ‘তোর নাতনি কেমন আছে?’ ইঞ্জেকশন নেয়নি শুনে রেগে আগুন হয়ে যান। বলেন, ‘মজাটা পরে বুঝবে। পটাপট পেট থেকে যখন মরা ছেলে বেরুতে থাকবে...’। ডাঃ বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় বুঝিয়েছিলেন, ভালো ডাক্তার হতে গেলে সবার আগে সৎ এবং ভালো মানুষ হতে হয়। ডাক্তারিটা সাধনা। স্রেফ ব্যবসা নয়। হতে পারে না। কারণ, মানবজগতে ঈশ্বরের পরই ডাক্তারের স্থান। বনফুল লিখেছিলেন, ‘কোনো ভালো জিনিসই সাধারণের পর্যায়ে পড়ে না। হীরা-মুক্তা খোলামকুচির মতো পড়ে থাকে না পথেঘাটে। খনির অন্ধকারে অথবা সমুদ্রের অতলে ওদের জন্ম হয় রহস্যময় উপায়ে। প্রচণ্ড চাপে কয়লা হীরকে পরিণত হয়, ঝিনুকের ভিতর সূক্ষ্ম বালুকণা প্রবেশ করে’ সৃষ্টি করে মুক্তা। প্রচণ্ড চাপ অথবা বালুকণার প্রদাহ না থাকলে হীরা-মুক্তার জন্ম হ’ত না।’ আজ কেউ চাপ নেয় না। প্রদাহ সহ্য করে না। তাই হীরে বা ঝিনুকও তৈরি হয় না। সবটাই আর্টিফিশিয়াল। গিল্টি করা গয়নার মতো। বাইরে থেকে চকচকে। ভিতরটা সাদামাটা। তাই আস্থার ভিতটাই নড়ে যাচ্ছে। ডাক্তার দেখাতে গেল কনফিডেন্সের চাবুকটা আর আছড়ে পড়ছে না। ঘষ ঘষ করে লেখা হয়ে যাচ্ছে টেস্টের নাম। আমরা ছুটছিল পরীক্ষা করাতে। ১০ হাজার... ১৫ হাজার হু হু করে বেরিয়ে যাচ্ছে। শুনেছিলাম এক প্রফেসরের কাছে। ইএনটি। প্রচণ্ড কানে ব্যথা নিয়ে গিয়েছিলাম। পরামর্শ চাইতে। কারণ, আগের তরুণ ডাক্তার হাজার হাজার টাকার টেস্ট করানোর পর কানে অপারেশনের নিদান দিয়েছিলেন। প্রবীণ ডাক্তারবাবু দেখলেন। তারপর প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘ননসেন্স। অপদার্থ।’ তারপরই নরম হয়ে গেল কণ্ঠস্বর। বললেন, ‘আমাদেরই দোষ জানেন তো। আমরাই সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারিনি।’ একটি ৩০ টাকার মলম দিয়েছিলেন ডাক্তারবাবু। বলেছিলেন, ‘কানের পাশের চোয়াল যেখানে শেষ হচ্ছে, ঠিক সেখানে লাগাবেন। খুব বেশি হলে সাতদিন।’ জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আবার কবে আসব?’ ঝাপ্টার মতো উত্তর এসেছিল, ‘আর আসতে হবে না।’ সত্যিই তাই। মাত্র তিনদিন ওই মলম ব্যবহারেই ব্যথা উধাও। ডাক্তারি যে তখন সত্যিকারের সাধনাই ছিল। কারখানা নয়। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ