Bartaman Logo
৩১ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বঙ্গরাজনীতির প্রবণতা কি বদলাবে না?

মগরাহাটের জয়েন খান অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী খুশি কর এখন বিখ্যাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো লেখা অথবা ভিডিয়োর জনপ্রিয় হওয়াকে ডিজিটাল ভাষায় বলা হয় ভাইরাল হওয়া।

বঙ্গরাজনীতির প্রবণতা কি বদলাবে না?
  • ৩১ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত : মগরাহাটের জয়েন খান অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী খুশি কর এখন বিখ্যাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো লেখা অথবা ভিডিয়োর জনপ্রিয় হওয়াকে ডিজিটাল ভাষায় বলা হয় ভাইরাল হওয়া। ঠিক সেরকমই ভাইরাল হয়েছে খুশি করের একটি সাধারণ বক্তব্য। স্কুলের শিক্ষক সাদ্দাম হোসেন ওই ভিডিয়ো মোবাইলবন্দি করেছেন। সেটি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করে তিনি সমাজের কাছে প্রশংসার্হ। ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, শিক্ষক লক্ষ্য করছেন মিড ডে মিলের থালায় সকলের ডিম আছে, খুশির নেই। তিনি খুশিকে প্রশ্ন করছেন, কী রে তুই ডিম খাবি না? তোর ডিম কোথায়? খুশি আড়ষ্টভাবে তার ইউনিফর্মের পকেট থেকে ডিম বের করে দেখায়। কেন সে নিজে না খেয়ে ডিম পকেটে রেখেছে? জানতে চাওয়ায় সে বলেছে, বাড়িতে থাকা  ভাইয়ের জন্য সে নিয়ে যাচ্ছে ডিম। কিন্তু সে নিজে না খেয়ে ভাইয়ের জন্য কেন নিয়ে যাচ্ছে? তার ডিম ভালো লাগে না খেতে? খুনসুটি করে তার সহপাঠী হাসতে হাসতে  বলেছে, ও রোজ নিয়ে যায়! ৬ বছরের খুশি প্রতিবাদ করে বলেছে, না গো! আমি রোজ খাই, একদিন ভাইয়ের জন্য নিয়ে গেলে কী হয়! 

Advertisement

খুশির এই ভিডিয়ো বহু মানুষের চোখে জল এনেছে। আশীর্বাদ করেছে লক্ষ লক্ষ মানুষ মোবাইলে ওই দৃশ্য দেখে। খুশির মনোভাবটিকে আরও বৃহত্তর প্রেক্ষিতে ভাবলে দেখা যাবে এটি বঙ্গরাজনীতি ও সমাজের বর্তমান চিত্রকে যেন লজ্জায় ফেলে দিয়েছে। বঙ্গরাজনীতির এহেন অবক্ষয় এবং নৈতিকতাহীন ঘটনাপঞ্জি স্বাধীনতার পর কখনো দেখা যায়নি। কবে কে বিশ্বাসঘাতকতা করবে, কবে প্রলোভনের সামনে আত্মসমর্পণ করবে কারা, আজ এই দলে, কাল ওই দলে, পরশু স্রেফ সংসদে টিকে থাকার জন্য অপরিচিত, অস্বীকৃত কোনো দলে যোগ দেওয়া, আজ যে আদর্শের বিরোধিতা করেছি, আগামীকাল সেই আদর্শের জয়গান করব, আজ যে নেতার সমালোচনা করেছি, আগামীকাল তাঁর অনুগত হব এই অন্তহীন কুনাট্যরঙ্গ দেখা যাচ্ছে বঙ্গরাজনীতিতে। 
দীর্ঘকাল রাজনীতি থেকে সবরকম সুযোগ সুবিধা পেয়েও একটি শ্রেণি সামান্য স্বার্থহানির সম্ভাবনা সহ্য করতে না পেরে ঝাঁপিয়ে পড়ছে আপস করার সম্মানহীনতার দিকে। অথচ প্রথম শ্রেণির ছাত্রী খুশি কর একটি আস্ত ডিম থালায় পেয়েও সে শুধু সবজি দিয়ে ভাত খেয়ে সযত্নে গোপনে নিজের থালার ডিম পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছে। কারণ ভা‌ই঩কে দেবে বলে। ৯৭ বছর আগে লেখা একটি উপন্যাসের দিদি ও ভাই দুর্গা ও অপুর মায়াবী ভালবাসা আজও ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে বাংলার গ্রামীণ ভাইবোন। অথচ রাজনীতির অবক্ষয় কী দ্রুত গ্রাস করল বাংলাকে! চরম ক্ষমতাধরেরা ক্ষমতা হারানোর আতঙ্ক সহ্য করতে না পেরে আত্মসমর্পণ করলেন নীতিহীনতার কাছে। এর ফলে রাজনীতির প্রতি মানুষের বীতরাগ বাড়ছে। 
বঙ্গরাজনীতিতে মূল্যবোধ এবং সততার অবসান ঘটেছে, সেটি যেমন চরম দুর্ভাগ্যজনক, তেমনই বাংলার জন্য সবথেকে উদ্বেগজনক বার্তা হল, বঙ্গরাজনীতি আর কোনো ঢেউ তুলতে পারছে না জাতীয় স্তরে। জাতীয়তাবাদের জন্ম দিয়েছিল বাংলা। আনন্দমঠ থেকে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন। যে আন্দোলন গোটা দেশেই স্বদেশির একটি বোধ জাগ্রত করেছিল। বাংলার রাজনীতিকরা হয়ে উঠেছিলেন জাতীয় স্তরের দল ও সংগঠনের নীতি নির্ণায়ক। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একটিবার শুধু দেখা করার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত এক আইনজীবী। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। চিত্তরঞ্জন দাশ জাতীয় কংগ্রেসে মহাত্মা গান্ধীর সিদ্ধান্তের একাধিকবার বিরুদ্ধাচারণ করার সাহস দেখিয়েছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই স্বরাজ্য দল তৈরি হয়, যেখানে সদস্য হয়েছিলেন মতিলাল নেহরুর মতো কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব। সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে নাজেহাল ছিলেন কংগ্রেসের নেতারা। কখন তিনি কী করবেন, কোন অবস্থান নেবেন সেটা ছিল তীব্র মাথাব্যথা, একইসঙ্গে দিল্লির কংগ্রেস ও দিল্লির ব্রিটিশ সরকার উভয়েরই। 
স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচনে কলকাতা এক আশ্চর্য বার্তা ও পরিণতমনস্কতা দেখিয়েছিল। কলকাতার দুই কেন্দ্র থেকে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রাজনৈতিক আদর্শ ও নীতিতে অবস্থান করা দুই মুখোপাধ্যায়কে কলকাতাবাসী নির্বাচিত করে সংসদে পাঠিয়েছিল। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। তাঁরা দুজনেই ছিলেন জওহরলাল নেহরুর তীব্র প্রতিপক্ষ।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের গুরুত্ব এতটাই ছিল যে, তিনি দিল্লিতে কাজে গেলে সর্বদাই তিন মূর্তি ভবনে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর বাসভবনের অতিথিশালায় উঠতেন। তাঁকে অন্য কোনো সরকারি অতিথিশালায় উঠতে দিতেন না নেহরু। সিদ্ধার্থশংকর রায় ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর অন্যতম পরামর্শদাতা। জরুরি অবস্থা জারির খসড়া নির্মাণে সঞ্জয় গান্ধীর সবথেকে বড়ো সহায়ক হয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। কংগ্রেস বিরোধী কোনো দলের এমন কোনো নেতা ছিলেন না যাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে কল্পনা করা যায়। প্রথমেই তা‌ই জ্যোতি বসুকে মনোনীত করা হয়েছিল নয়ের দশকে যুক্তফ্রন্টের সরকার গঠনে। তাঁর সেই অথরিটি ও ভাবমূর্তি ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সকলেই ছিলেন ইউপিএ আমলে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে স্বার্থরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁদের রাজনৈতিক পরিচিতিও ছিল দেশজুড়ে। 
বঙ্গরাজনীতি আর জাতীয় স্তরের নেতানেত্রী পায় না। বঙ্গরাজনীতির অবক্ষয় ও গতিপ্রকৃতি আরও বেশি করে চোখে পড়ার কারণ হল, কোনো জাতীয় স্তরের ইস্যুতে বঙ্গরাজনীতির অবদান নেই। এই যে ককরোচ জনতা পার্টি অথবা জেন জি আন্দোলন, এরকম কোনো কনসেপ্টের সূত্রপাত কলকাতায় হল না কেন? কলকাতা নিছক অনুসরণ করল ওই আন্দোলনের। অংশগ্রহণকারী। কিন্তু উৎস নয়। বঙ্গরাজনীতির কুশীলবরা কোনো একটি ইস্যুকে জাতীয় স্তরের আলোচ্য করে তুলতে পারছে না। যেটা পেরেছে সেটি হল, নীতিহীন দলবদল। বঙ্গবাসী এবং ভারতবাসী বিগত কয়েকমাস ধরে সবথেকে বেশি যা নিয়ে চর্চা করছে, সেটি হল, কারা তৃণমূল ছেড়ে কোনদিকে চলে গেল। আবার তৃণমূলের কাউকে নেওয়া হবে না দলে, এই ঘোষণা করার পরও বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব তৃণমূলের নেতাদের দলে নিয়ে নিচ্ছে।  
সবথেকে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে বিজেপি। যারা ২০৮ আসনের শক্তি অর্জন করেছে, তারা ঠিক কেন তৃণমূলের নেতানেত্রীকে ভাঙিয়ে এনে নিজেদের পক্ষে নিয়ে এসে নীতি ও আদর্শের সঙ্গে চরম আপস করছে এই রহস্য এখনও কাটছে না। বিজেপির কর্মী নেতা ভোটাররাও সম্ভবত এই উত্তর পাচ্ছেন না। তাঁরা এতদিনে বুঝে গিয়েছেন যে, তাঁরা যাদের চরম দুর্নীতিগ্রস্ত আখ্যা দিয়েছেন ভোটের আগে, সেই নেতানেত্রীরা যেকোনো সময় তাঁদের দলের নতুন নেতানেত্রী হয়ে যেতে পারেন। 
বিজেপির জন্য সবথেকে অস্বস্তিকর হল, আড়াই মাস হয়ে গেল, এখনও বিজেপি অথবা বিজেপির নয়া সরকার নিয়ে জনমানসে  চর্চা হচ্ছে না। এখনও সবরকম আলোচনার কেন্দ্রে তৃণমূল।  বিদ্রোহী তৃণমূল, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রেপ্তার হবেন কি না, একুশে জুলাই  ভিড় হওয়া অথবা না হওয়া, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব অথবা অসম্ভব ইত্যাদি। 
কিন্তু হওয়ার কথা ছিল বিজেপির বিকল্প রাজনীতি নিয়ে চর্চা। অর্থাৎ স্বাধীনতার পর এই প্রথম ক্ষমতাসীন হওয়া বিজেপি সরকার বিগত ৭৯ বছর ধরে বাংলার রাজনীতি, প্রশাসন, সরকার, সমাজ, শিক্ষা যেভাবে চলেছে, তার যে নেতিবাচক দিক, সেগুলি চিহ্নিত করে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়ার প্রয়াস করবে। কংগ্রেস, সিপিএম, তৃণমূলের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক সরকার পরিচালনা পদ্ধতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নীতিগ্রহণের একের পর এক পদক্ষেপ দেখা যাবে এরকম ভাবা হয়েছিল। সেরকম কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। সমাজ অথবা রাজনীতির বিশেষ কোনো আমূল বদলে যাওয়ার ছবি উঠে আসছে না। বরং সেই একই প্রবণতা। ঘুরপথে পঞ্চায়েত দখল, পুরসভা দখল। বিরোধীশূন্য করার তাগিদ। তাহলে কি দল অথবা সরকার বদলে গেলেও সিস্টেম পালটায় না? হকার উচ্ছেদ, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যবিমা, মহিলাদের জন্য বাসভাড়া ফ্রি—এসব একটাও নতুন কোনো অভিনব উদ্ভাবন শক্তির প্রকাশ নয়। এসব রাজ্যে রাজ্যে চলছে। নতুন কিছু নয়। সারাদিন ধরে তৃণমূলকে জব্দ করার বার্তা প্রদানই একটি সরকারের একমাত্র কাজ হতে পারে না। তৃণমূল ছিন্নভিন্ন হয়েই গিয়েছে। অথচ সরকার নতুন অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যেতে পারছে না এখনও। 
কিন্তু রাজনীতির ভাষা বদলে যাবে, অনেক পরিশীলিত একটি রাজনৈতিক আবহ তৈরি হবে, শিক্ষিত ছাত্র যুব সমাজ রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয় এরকম কোনো বার্তা প্রদান করা হবে, এসব কিছু‌  ঩কিন্তু এখনও দেখা যাচ্ছে না। এখনও পর্যন্ত বঙ্গরাজনীতি ও সমাজের স্থবিরতাই বেশি করে চোখে পড়ছে। সবথেকে ক্ষতি হল, প্রথাগত রাজনীতির প্রতি জেন জি আগ্রহ হারাবে আরও। তবে প্রকৃতি, সমাজ এবং সভ্যতার একটি স্বতঃস্ফূর্ত ভারসাম্য নির্মাণের ক্ষমতা রয়েছে। সেই নিয়মেই হয়তো এই অনেক নিরাশার মধ্যে এক ঝলক দখিনা বাতাস এনে দিয়েছে মগরাহাটের শিশু খুশি কর! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ