সাম্প্রতিককালে দিল্লির রাজপথ আবারও সাক্ষী থাকল এক উত্তাল রাজনৈতিক দৃশ্যের। দিল্লির যন্তর মন্তরের বুকে ছাত্র-যুবদের আন্দোলনকে যেভাবে লাঠিচার্জ, পেলেট গান এবং কাঁদানে গ্যাসের মধ্য দিয়ে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হল, তা স্বাধীন ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর উপর এক গুরুতর আঘাত। প্রশ্ন উঠছে, অধিকার আদায়ের দাবিতে সোচ্চার হওয়া ছাত্রছাত্রীদের উপর এমন কঠোর ও নির্মম পদক্ষেপ কার নির্দেশে? এই ঘটনার জল এখন সোজাসুজি গড়িয়েছে সংসদের অলিন্দে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর জোরালো আক্রমণে রীতিমতো ব্যাকফুটে শাসক শিবির। সংসদীয় রাজনীতিতে মূল প্রশ্নটি এখন শুধু আর পুলিশি অতিসক্রিয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তা বদলে গিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ইস্তফার দাবিতে।
গত ২০ জুলাই সংসদ ভবন অভিযান এবং তার পরবর্তী যন্তর মন্তরের ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, সরকার ও বিরোধীদের সংঘাত এখন চরম রূপ ধারণ করেছে। বিরোধী দলনেতা সংসদে এবং পরবর্তী সময়ে সাংবাদিক সম্মেলনে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে। তাঁর সাফ যুক্তি—দিল্লি পুলিশ এবং র্যাফ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে পরিচালিত হয়। ফলে রাজধানীর রাজপথে যখন সাধারণ আন্দোলনকারীদের উপর বলপ্রয়োগ করা হচ্ছিল, তখন তা মন্ত্রকের অজানা থাকা অসম্ভব। রাহুল আরও জানান, ঘটনার দিন তিনি সংসদের ভিতরে ছিলেন। সেখানেই শাহকে পুলিশের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে দেখেছেন। পরে এক মন্ত্রীকেও পুলিশের সঙ্গে ফোনে কথা বলার জন্য পাঠান শাহ। এর থেকেই প্রমাণিত হয়, পুলিশ কী করছে, তা তিনি জানতেন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ঘটনার সময় সংসদে উপস্থিত থেকে পুলিশের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যোগাযোগ রক্ষা করার যে অভিযোগ বিরোধী পক্ষ এনেছে, তা প্রশাসনিক নজরদারির চরিত্র নিয়ে বড়োসড়ো প্রশ্ন তুলে দেয়। এই ঘটনার দু’টি দিক প্রশাসনিক ও নৈতিক কাঠামোর উপর গভীর ধোঁয়াশা সৃষ্টি করেছে। যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশি পদক্ষেপ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থেকে এই নির্দেশ দিয়ে থাকেন, তবে তিনি সরাসরি এই নিপীড়ন ও বলপ্রয়োগের জন্য দায়ী। আর যদি তিনি এ বিষয়ে কিছুই না জেনে থাকেন, তবে তা তাঁর প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং দায়িত্ব পালনে অক্ষমতারই প্রমাণ। উভয় ক্ষেত্রেই গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার ও সাংবিধানিক নৈতিকতা মেনে তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া উচিত। নাহলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উচিত তাঁকে বরখাস্ত করা।
সংসদের অভ্যন্তরে এই বিতর্ক যে রূপ নিয়েছে, তা ভারতীয় গণতন্ত্রের বর্তমান দৈন্যদশাকেই ফুটিয়ে তোলে। বিরোধীরা যখন নিরপেক্ষ তদন্ত ও সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে বিচার বিভাগীয় কমিটির দাবি জানাচ্ছেন, তখন শাসক দলের পক্ষ থেকে আত্মপক্ষ সমর্থনের বদলে আক্রমণের পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে। বিরোধী দলনেতার বক্তব্য চলাকালীন মাইক বন্ধ হয়ে যাওয়া বা হট্টগোলের মধ্যে মূল বিল পাস করিয়ে নেওয়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রমের পরিপন্থী। সরকারের তরফে দাবি করা হচ্ছে, পুলিশ সংযম দেখিয়েছে এবং অতীতে অন্যান্য সরকারের আমলে ছাত্র আন্দোলনের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে বর্তমান পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু অতীতের ভুল দিয়ে বর্তমানের পুলিশি বর্বরতাকে আড়াল করার এই চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ছাত্র আন্দোলন দমনে যদি রাজপথে পেলেট গান বা সশস্ত্র বলপ্রয়োগের দৃশ্য উঠে আসে, তবে তা কোনো সুস্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না। শাসক শিবিরের ক্ষমা চাওয়ার দাবির মুখে বিরোধী দলনেতা যে অনড় অবস্থান নিয়েছেন, তা স্পষ্ট করে দেয় যে এই সংঘাত সহজে থামার নয়। সাদা পোশাকের পুলিশের ভূমিকা কিংবা বিচার বিভাগীয় তদন্ত এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা থেকে মনে হয়, সরকার সত্য প্রকাশের চেয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে নিজের অবস্থান রক্ষাতেই বেশি আগ্রহী। গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রতিবাদের অধিকার মৌলিক ভিত্তি। ছাত্র-যুবদের কণ্ঠরোধ করতে যখন রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়, তখন তার দায় শীর্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্বের উপরেই বর্তায়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক যদি এই অভিযোগের সদুত্তর না দেয় এবং নিরপেক্ষ তদন্তের পথে না হাঁটে, তবে জনগণের দরবারে এই বার্তা পৌঁছাবে যে, সরকার জবাব দেওয়ার বদলে তা এড়িয়ে যেতে চাইছে। অমিত শাহের ইস্তফা দাবি শুধু একটি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি নয়, এটা আসলে রাষ্ট্রের কাছেই জবাব চাওয়া এবং রাজপথে হওয়া দমনপীড়নের বিরুদ্ধে ওঠা এক জরুরি নীতিগত প্রশ্ন।