আমি যুগ যুগ ধরিয়া অনন্তবার, অসংখ্যবার জন্ম-মৃত্যুর চক্রে বিঘূর্ণিত হইতেছি। এই জন্ম-মৃত্যুর ভ্রাম্যমাণ চক্র হইতে যদি আমাকে নিষ্কৃতি লাভ করিতে হয় তবে মৃত্যুচিন্তাকেই সে পথের মহাসম্বল রূপে গ্রহণ করিতে হইবে।
আমি যুগ যুগ ধরিয়া অনন্তবার, অসংখ্যবার জন্ম-মৃত্যুর চক্রে বিঘূর্ণিত হইতেছি। এই জন্ম-মৃত্যুর ভ্রাম্যমাণ চক্র হইতে যদি আমাকে নিষ্কৃতি লাভ করিতে হয় তবে মৃত্যুচিন্তাকেই সে পথের মহাসম্বল রূপে গ্রহণ করিতে হইবে।
মৃত্যুচিন্তা রিপুর উত্তেজনা ও ইন্দ্রিয়ের উৎপীড়ন হইতে মানুষকে রক্ষা করে। মৃত্যুচিন্তা বিষয়-বাসনাকে বিধ্বংস করিয়া মানুষের অন্তরে বিবেক-বৈরাগ্য জাগাইয়া তোলে; ভোগ-বিলাসের স্পৃহাকে নষ্ট করিয়া মানব-প্রাণে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগাইয়া দেয়। যে ব্যক্তি নিয়ত মৃত্যুচিন্তা করে সে কদাপি কোন প্রলোভনের দ্বারা প্রলুব্ধ হয় না, কোন মায়া-মোহের দ্বারা আবদ্ধ হয় না। যে ব্যক্তি প্রতি নিমিষে নিমিষে, প্রতি পলকে পলকে, প্রতি ভাবনায়, প্রতি চিন্তায়—শয়নে স্বপনে, জাগরণে মৃত্যুর স্মৃতিকে প্রাণে জাগাইয়া রাখিতে পারে সে অচিরে মহামুক্তি লাভে সমর্থ হয়।
আমি অবস্তুতে বস্তুবোধ আনিয়া, অসত্যে সত্য বোধ করিয়া, মায়ামোহ-প্রযুক্ত পিতামাতার স্নেহ ও যত্নে প্রলুব্ধ ও মুগ্ধ হইয়া জীবন-জনম ব্যর্থ করিতেছি। আমার শুভাশুভ কর্ম্মের জন্য দায়ী আমিই। আমার কৃত সদসৎ কর্ম্মের ফলাফল আমার পিতামাতা, আত্মীয় স্বজন কেহই ভোগ করিবে না। সুতরাং আমি বৃথা কেন তাঁহাদের মায়া মমতা ও অলীক কর্তব্যবোধে আবদ্ধ হইয়া আমার জীবনের অমূল্য সময় নষ্ট করিতেছি? যদি এখনই আমার মৃত্যু হয়—তবে চিতাশয্যায় দুই মুষ্টি ভস্ম ভিন্ন কিছুই অবশিষ্ট থাকিবে না। বিপুল বৈভব, অতুল ঐশ্বর্য্য, পিতামাতা, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় স্বজনের শত চেষ্টা সত্ত্বেও অন্তিম শয়নে মৃত্যুর ক্রোড়ে ঢলিয়া পড়িবই। মৃত্যু-চিন্তাই সিদ্ধার্থকে বুদ্ধত্ব লাভের পথ প্রদর্শন করিল। মৃত্যুচিন্তাই তো শঙ্করকে শৈশবে সন্ন্যাসী করিয়াছিল। আত্মচিন্তা মানুষের ভিতরে আত্মজ্ঞান আনয়ন করিয়া তাহাকে রিপুর উত্তেজনা ও ইন্দ্রিয়ের উৎপীড়ন হইতে উদ্ধার পূর্ব্বক মহামুক্তি ও অনন্ত কল্যাণের পথে প্রবর্তিত করে। মানুষ মায়ামোহ-প্রযুক্ত ভ্রান্তিজালে নিজেকে বিজড়িত করিয়া সতত আত্মচিন্তা হইতে বিরত থাকে। মানব যদি ভ্রান্ত বুদ্ধিকে বিনষ্ট করিয়া মায়াজাল ছেদনপূর্ব্বক নিয়ত প্রাণে আত্মস্মৃতি জাগাইয়া রাখিতে পারে, তবে অতি অল্প সময়ের মধ্যে আত্মজ্ঞান লাভ করিয়া শান্তিসুখে কালযাপন করিতে পারে।
মানুষ যদি নিয়ত ভাবিতে পারে যে—আমি কোথায় ছিলাম? আমি এখানে কতকাল থাকিব—তার কোন নিশ্চয়তা আছে কি? এখানে আমি চিরকাল থাকিব কি? মৃত্যু কি আমাকে যে-কোন মুহূর্তে আসিয়া গ্রাস করিতে পারে না? আর এজগতে যদি আমার জীবন চিরস্থায়ী না হয় তবে চিরস্থায়ী হইয়া থাকিবার মতু মনোবৃত্তি ও হৃদয়ের ভাব নিয়া থাকিব কেন?—তবে মানুষের অন্তরে এমনি এক বিবেক-বুদ্ধি জাগিয়া উঠে যে তাহার বলে বলীয়ান হইয়া মানুষ যাবতীয় কামনা বাসনাকে বিধ্বংস পূর্ব্বক রিপু ও ইন্দ্রিয়ের অধীনতা সবলে অতিক্রম করিয়া ভগবৎ-চিন্তা ও আত্মানুভূতিতে আপনাকে ডুবাইয়া দিতে পারে।
ভারত সেবাশ্রম সংঘ প্রকাশিত শ্রীশ্রীমৎ স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের
যুগবাণী ‘শ্রীশ্রীসঙ্ঘ-গীতা’ থেকে