Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পুলিশ-পরিবারের লক্ষ লক্ষ ভোট বিজেপি পাবে তো?

পুলিশ-পরিবারের লক্ষ লক্ষ ভোট বিজেপি পাবে তো?
  • ৭ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: আজকের গেরুয়া স্বেচ্ছাচারিতার বাঁশঝাড়ে মানুষের সংজ্ঞা কী? কৃপাপ্রার্থী! উমেদার! সবাই দেখবে যে, রাজা উলঙ্গ... তবুও হাততালি দেবে! এই ভারতের ‘বিধাতা’ হয়ে বসা ‘নির্বাচিত’ শাসকরা তেমনটাই যে চাইছেন। লাগাতার। বারবার। ভবানীপুরে চারটি লোকের স্লোগানের জন্য যেভাবে মোদি-শাহের ধামাধরা সাংবিধানিক সংস্থা তেলেবেগুনে ছ্যাঁকছোঁক করে উঠেছে, তাতে এর থেকে ভালো ব্যাখ্যা খাপ খাচ্ছে না। দলবদলু খোকাবাবু যাবেন মনোনয়ন দিতে। তার জন্য মহামহিম শাহ মহাশয় নিজেই এসেছেন। রোড-শো করে যাবেন। তাও কালীঘাট এলাকা দিয়ে। বিজেপি যদি সংবাদপত্রে পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন দেয়, তাহলে তাতে নিশ্চয়ই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুণগান থাকবে না? কিন্তু কালীঘাট চত্বরে রোড-শোয়ের সময় মাননীয় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা করবেন, মানুষ তাঁর নামে জয়ধ্বনি দেবে! তারা বিজেপির তামাক খায় না, হাতে পাঁচশোটি টাকা গুঁজে দিতে গেলে তারা নিতে অস্বীকার করে, এসআইআর থেকে রান্নার গ্যাস—সর্বত্র তারা লাইনে দাঁড়ালেও কেন্দ্রীয় সরকার চোখ উলটে পড়ে থাকে... তারপরও আশাবাদী অমিত শাহ। দাঁত বের করে আম জনতার হাত নাড়ার আশা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাড়ায় জয়ধ্বনির আশা। বাংলার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের গদগদ হয়ে তাঁর দিকে ফুল ছোড়ার আশা! কেন, পরিবর্তন কি এসে গিয়েছে নাকি? আশাবাদী হওয়ার একটা সীমা-পরিসীমা আছে। ক্ষমতার বেলুনে সওয়ার এই গেরুয়া অধিপতিরা এতই উচ্চতায় উঠে গিয়েছেন যে, আম জনতার পালস বোঝার প্রয়োজনীয়তাটুকুও তাঁরা হারিয়েছেন। তাই শাহজি ক্ষুব্ধ হলেন। প্রশ্ন তুললেন। নির্বাচন কমিশনকে গুঁতো দিলেন। আর তারপরই পত্রপাঠ সাসপেন্ড করে দেওয়া হল দায়িত্বপ্রাপ্ত চার পুলিশ অফিসারকে। তাঁদের অপরাধ কী? কর্মসূচির অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও তৃণমূলকে নাকি তাঁরা ছাড় দিয়েছিলেন! বিজেপি ‘সুবিধা’ অ্যাপে পারমিশন নিয়েছিল। কিন্তু অমিত শাহকে ঘিরে যে গো-ব্যাক স্লোগান উঠেছিল, তার অনুমতি কেউ নেয়নি। কার নেওয়ার কথা ছিল? আম জনতার? সাধারণ মানুষ তাহলে এখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিক্ষোভ দেখানোর আগে সুবিধা অ্যাপে পারমিশন নেবে? ‘আমার বাড়ির সামনে দিয়ে অমিত শাহের গাড়ি যাচ্ছে, আমি একটা কালো পতাকা দেখাতে চাই। আমার এই আরজি মঞ্জুর করা হোক।’

Advertisement

একটি ভোট। তার জন্যই তো এতকিছু? এই এসআইআর। লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির নামে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হয়রান করা। ধর্ম বাছাই করে ‘বিচারাধীন’ তালিকায় সাধারণ ভোটারদের ঠেলে দেওয়া। সংগঠন না থাকলেও মেকানিজমের জোরে বাংলা দখলের স্বপ্ন দেখা। এর মূলে কী? একটি ভোট। প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। গণতন্ত্রের একমাত্র কার্যকরী রূপ, যা আম জনতা দেখতে পায়। এই একটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ভিনরাজ্যে গিয়ে মার খাওয়া বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকের কোনো তফাৎ নেই। ফারাক নেই অমিত শাহের সঙ্গে সিদ্ধার্থ দত্তেরও। হ্যাঁ, শুধু অমিত শাহ হলেন এই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আর সিদ্ধার্থ দত্ত তাঁরই সৌজন্যে সাসপেন্ড হওয়া পুলিশ আধিকারিক। সাউথ ডিভিশনের ডিসি (২)। তাই মাননীয় অমিত শাহ হাতে মাথা কাটেন। আর সিদ্ধার্থবাবু গলা বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হন। একজনের ক্ষমতার দায়। অন্যজনের পেটের। রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্যের। ক্ষমতার অহংকারে শাসক ভুলে যায়, এই সিদ্ধার্থ দত্তেরও একটি ভোট আছে। তাঁর পরিবারের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কের আছে। একটি করে। তাঁর চেনা-পরিচিত... যাঁরা দেখেছেন এই ধ্যাষ্টামো, তাঁদেরও আছে। অমিত শাহ কি আশা করেন, এই প্রত্যেকটি ভোট বিজেপির ঝুলিতে আসবে? কিংবা প্রিয়াঙ্কর চক্রবর্তী, চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বা সৌরভ চট্টোপাধ্যায়? নির্বাচনি গণতন্ত্রে এঁদের পরিচয় স্রেফ পুলিশ নয়। এক একটি ভোট। নির্বাচন কমিশনের কোপে পড়েছেন তাঁরা। সার্ভিস রেকর্ডে কালো দাগ পড়ে গিয়েছে—সাসপেন্ড। কেন? কোন রাজনৈতিক কারণে? কীভাবে বলির পাঁঠা হয়েছেন? এই প্রশ্নগুলো কেউ জিজ্ঞেস করবে না। কেউ শুনবে না। কাগজে ওই কালো দাগটাই শুধু দেখা যাবে। তার প্রভাব পড়বে পোস্টিং, প্রোমোশন থেকে অবসর... সর্বত্র। অনেকেই অবশ্য এই পদক্ষেপে ‘শাবাস, শাবাস’ করছে। নিজের বুদ্ধি বন্ধক রেখেছে গেরুয়া আগ্রাসনের পায়ের তলায়। এই লেখা তাদেরও জন্য। তাদের দূরদর্শিতার অভাবের জন্য। মাটির তলার বালিকে কংক্রিটের চাঙড় বলে ভেবে নেওয়ার জন্য। কিন্তু পুলিশ এবং তার পরিবার মহল? তাঁদের মধ্যে ক্ষোভের আঁচটা বাড়ছে। শ’পাঁচেক বদলি, ডিমোশন, সাসপেনশন... এঁরা প্রত্যেকে ভোটার। আসন্ন ২৩ ও ২৯ এপ্রিল তাঁরাও ভোট দেবেন। ‘রাজবস্ত্র সত্যিই অতীব সূক্ষ্ম’ বলে কেউ কেউ এতদিন হয়তো ভেবে এসেছিলেন। এখন আর ভাবছেন না। সবাই ভিতু, ফন্দিবাজ, নির্বোধ স্তাবক নয়। জ্বলছেন তাঁরা। অপেক্ষায় আছেন। ওই একটি দিনের। ইভিএমের সামনে দাঁড়াবেন তাঁরা। ভোট দেবেন। এই লড়াই শাসকের বিরুদ্ধে নয়। অধিকারের পক্ষে। কোনো দলের জন্য বা বিপক্ষে নয়। মর্যাদার খাতিরে। সম্মান পুনরুদ্ধারে। এই সম্মান উপার্জনে গোটা জীবন চলে যায়। আর তা হারাতে লাগে এক মুহূর্ত। তার উপর যদি সেই সম্মান কোনো রাজনৈতিক তাঁবেদারির বিষফল হিসাবে পাতে পরিবেশন করা হয়? তার থেকে দুর্ভাগ্যজনক অন্য কিচ্ছু হতে পারে না। আমরা রাজনীতির মোড়কে কত সহজে পুলিশকে দলদাস বলে চালিয়ে দিই। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, ওরাও মানুষ। ওদেরও পরিবার আছে। সম্মান আছে। অধিকার আছে। সবচেয়ে বড়ো কথা, ওদেরও চাকরি করতে হয়। সরকারের। আর সেই সরকারের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে ছড়ি ঘোরানো কোনো না কোনো দলের। তাই দিল্লি থেকে যদি কোনো আইপিএসের কাছে নির্দেশ আসে—যেমন বলছি করুন, পরবর্তী পোস্টিং আমরা বুঝে নেব... তাঁরও কিছু করার থাকে না। সেদিনও যদি রাস্তার ধারে জড়ো হওয়া লোকজন চোর-চোট্টা না বলে ‘জয় বিজেপি’ বা ‘মোদি-শাহ’ জিন্দাবাদ বলে চেঁচামেচি জুড়ে দিত, তাহলে কমিশনের কাছে নালিশ যেত না। চারটির বদলে ৪০০ লোক থাকলেও না। এটাই জীবন, থুড়ি রাজনীতি। এদিক ওদিক, ডাইনে বাঁয়ে করা যাবে না। তাহলে রাজার কাছে খবর ছুটবে। তামাকখেকো পল্টনেরা লাফিয়ে উঠবে। গোদি মিডিয়া বলবে, এই আইন-শৃঙ্খলার অবনতি কেন? নেশন ওয়ান্টস টু নো। আর যারা প্রতিবাদ করবে? আরবান নকশাল বা রাষ্ট্রদ্রোহী তকমা দিয়ে তাদের জেলে ভরে দেওয়া হবে। ‘খাঁচায় রেখে নানান সুরে কানের কাছে’ আচ্ছে দিনের আলেয়ার ডাক দেওয়া হবে। এই মগজ ধোলাই মেনে নিলেই অর্থে-অনর্থে লালে লাল। আর না মানলে...।
ঠিক এই কারণেই আমরা কি স্বৈরতন্ত্রে গঙ্গাজল ছেটাচ্ছি? এরা বলছে, বাঙালি মানেই অনুপ্রবেশকারী। আমরা মেনে নিচ্ছি। এরা বলছে, যারা বিক্ষোভ করে, তারা রোহিঙ্গা, রাষ্ট্রবিরোধী। আমরা সাধু সাধু রব তুলছি। এরা বলছে, ২৭ শতাংশ মুসলিম নাকি বাকিদের হারিয়ে গোটা বাংলায় শরিয়তি কায়েম করে ফেলবে। তাই হিন্দুত্ব খতরে মে হ্যায়। আমরা শুনছি, হাততালি দিচ্ছি। সেই হাততালির শব্দে চাপা পড়ে যাচ্ছে বাস্তব, মানবিকতা, অধিকার। এখন সেই শিশুটির মতো সত্যবাদী, সরল, সাহসী হতে পারছি না... যে এই আস্ফালনের শব্দ ছাপিয়ে প্রশ্ন করতে পারবে, রাজা তোর কাপড় কোথায়? এই প্রশ্ন বিবেকের প্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে ফিরে যাচ্ছে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে সংসার, স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মায়ের মুখ। চাকরি বাঁচানোর ভয়। বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে পুশব্যাকের আতঙ্ক। আর চলছে অপেক্ষা। ভোটের। মাননীয় শাহজি, যে নাগরিক রাতের পর রাত ঘুমাতে না পেরে, রোদে-ঝড়জলে-অসুস্থতায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটাধিকারটুকু ফিরে পেয়েছে, সে কি আপনাকে ভোট দেবে? রাস্তার ধারে যে ছেলেটি একটা ছোট্ট রোলের দোকান দিয়ে দশজনের সংসার টানছিল, গ্যাসের সংকটে তার রুজিরুটি বন্ধ। শয্যাশায়ী বাবার ওষুধ আনার টাকা নেই। সে কি আপনাকে ভোট দেবে? এই বাংলার যে পুলিশ কনস্টেবল নিজের মধ্যে সিদ্ধার্থ দত্ত বা সৌরভ চট্টোপাধ্যায়ের ছায়া দেখছেন, তিনি কি আপনাকে ভোট দেবেন? নাকি দেবে তাঁর পরিবার। ভাবুন। শ্রমিককে মানুষ হিসাবে ভাবুন। বেসরকারি দপ্তরে ১৪ ঘণ্টা হাড়মাস এক করে যে যুবক মাস গেলে হাজার দশেকও বাড়ি আনতে পারে না, তাকে মানুষ হিসাবে ভাবুন। যে পুলিশকর্মীকে সকাল ৯টা এবং রাত ২টোয় সমানভাবে ‘রিঅ্যাক্ট’ করতে হয় এবং রাজনীতির ভণ্ডামিতে সাসপেন্ড হতে হয়, তাঁকে মানুষ হিসাবে ভাবুন। এক একটা ভোট হিসাবে ভাবলেও চলবে। তাহলে যদি আপনাদের সুবুদ্ধি হয়। কারণ, বিন্দু থেকেই সিন্ধু হয়। এক একটি ভোট জুড়েই আসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা। সরকার। ক্ষমতা। ভাবুন। ভাবা প্র্যাকটিস করুন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ