Bartaman Logo
২ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নিজের তৈরি ফাঁদ থেকে বিহার বাঁচবে তো?

এটা কল্পনা করা বোকামি যে নীতীশ কুমার নিজেকে পালটে ফেলবেন কিংবা বিহারের শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনবেন তিনি। ... বিজেপির সঙ্গে কোলাকুলি করা প্রতিটি আঞ্চলিক দলই নিজ নিজ পতন দেখেছে বা ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েছে। জেডি(ইউ)-এর ভাগ্য ভিন্ন নাও হতে পারে।

নিজের তৈরি ফাঁদ থেকে বিহার বাঁচবে তো?
  • ৩ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০

পি চিদম্বরম: বিহার সম্পর্কে কথা বলা কিংবা কিছু লেখা বেদনার ব্যাপার। বিহারের ইতিহাস পুরো অবহেলার আর অসার অহংকারের। 

Advertisement

১৯৪৭ সালে ভারতের সমস্ত রাজ্য একই সূচনা রেখায় দাঁড়িয়ে ছিল। কোনও রাজ্যই বলতে পারে না যে স্বাধীনতার সময় বা ১৯৫০ সালে সেটি পিছিয়ে ছিল। তখন কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস দল। বস্তুত সমস্ত রাজ্যও শাসন করেছিল তারা। তাই সারা দেশেই বাস্তবায়িত হয়েছিল একই নীতি এবং কর্মসূচি। প্রকৃতপক্ষে, কিছু প্রগতিশীল ধারণা প্রথমে বিহারে পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং পরে সেসব প্রসারিত হয়েছিল অন্যান্য রাজ্যেও। উদাহরণস্বরূপ ভূমিসংস্কার এবং ভূমিবণ্টনের কথা বলতে হয়। 
বিহারে বড়ো মাপের নেতারা ছিলেন। রাজ্যটিতে যাকে বলে ‘স্টিল ফ্রেম অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ ছিল। রাজ্য পরিচালিত হতো নামী সিভিল সার্ভেন্টদের দ্বারা। রাজ্যটিতে ছিল সবচেয়ে উর্বর জমি এবং গঙ্গার মতো একটি চিরস্থায়ী নদী। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ অবিভক্ত বিহারেই গড়ে উঠেছিল প্রথম ইস্পাত কারখানাগুলি। দেশের চারটি শীর্ষস্থানীয় হাইকোর্টের মধ্যে একটি ছিল বিহারের পাটনায়। ওই রাজ্যে বিচার ব্যবস্থা ছিল বলিষ্ঠ। তাহলে এমন বিহার ব্যর্থ হয়েছিল কেন?
একটি ব্যর্থ রাজ্য
বিহারের সরকারি তথ্য-পরিসংখ্যান খুবই হতাশাজনক। পর্যবেক্ষকদের মতে, বাস্তব পরিস্থিতি আরও খারাপ। দোষের ভাগীদার প্রতিটি সরকার। তার মধ্যে নীতীশ কুমার ক্ষমতা ভোগ করেছেন প্রায় ২০ বছর! ২০০৫ সালের ২৪ নভেম্বর থেকে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। (অবশ্য ২৭৮ দিন বাদ দিয়ে ধরতে হবে। কারণ ওইসময় মুখ্যমন্ত্রীর পদে তাঁর হয়ে ‘প্রক্সি’ দিয়েছিলেন অন্য একজন।) অর্থাৎ ১৯৯০ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে লালুপ্রসাদ যাদব (অথবা তাঁর স্ত্রী) জমানার পরবর্তী দীর্ঘ শাসনকাল ছিল এটাই। ৩৫ বছরের কম বয়সি ভোটাররা কেবল একজন মুখ্যমন্ত্রীকেই চেনেন—তিনি হলেন বর্তমান শাসক নীতীশ কুমার। বিহার রাজ্য বিধানসভার ২০২৫ সালের নির্বাচনে ১৯৯০ বা তার পূর্ববর্তী সরকারগুলির কাজকথা বিবেচ্য হবে না। ভোটরদের বিবেচনায় থাকবে বরং নীতীশ কুমার এবং তাঁর ২০ বছরের শাসনকালের ভালোমন্দ। 
২০২৫ সালে বিহারের আনুমানিক জনসংখ্যা 
১৩ কোটি ৪৩ লক্ষ। আরও অনুমান করা হচ্ছে যে, 
১ থেকে ৩ কোটি নাগরিক ওই রাজ্য ছেড়ে বাইরে 
চলে গিয়েছেন বা অন্যত্র মাইগ্রেট করেছেন। 
এর প্রধান কারণ হল—বেকারত্ব এবং বিহারে বিরাজমান দারিদ্র্য:
• যুব শ্রেণির মধ্যে বেকারত্বের হার ১০.৮ শতাংশ। শিক্ষার স্তরের বিপরীতক্রমে বেকারত্বের হারও বৃদ্ধি পায়। শিল্প প্রতিষ্ঠানে মাত্র ১ লক্ষ ৩৫ হাজার ৪৬৪ জন কর্মরত। তাঁদের ভিতরে মাত্র ৩৪ হাজার ৭০০ জন স্থায়ী কর্মচারী।
• নীতি-আয়োগের ২০২৪ সালের একটি রিপোর্টে প্রকাশ, সারা ভারতের মধ্যে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি বিহারে। ওই রাজ্যে ৬৪ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ১০ হাজার টাকার নীচে। আর ৫০ হাজার টাকার ঊর্ধ্বে মাসিক আয় এমন পরিবার সেখানে মাত্র ৪ শতাংশ! 
• বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক (এমপিআই) অনুসারে, বিহার সবচেয়ে খারাপ পারফর্মিং রাজ্য। তাদের পারফর্ম্যান্সের শতকরা হার ৩৩.৭৬। শিশুর 
বেঁচে থাকা, মায়েদের স্বাস্থ্য, রান্নার জন্য স্বাস্থ্যকর জ্বালানি ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচব্যবস্থা (স্যানিটেশন) মিলিয়ে বঞ্চনার প্রতিটি মাপকাঠিতে বিহারের স্থান শীর্ষে। ‘কোয়ালিটি এডুকেশন’ ইনডেক্স না 
‘শিক্ষার মান’ সূচক এবং ‘শালীন কাজ এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধি’ সূচকেও বিহার নীচের দিকের একটি রাজ্য। (সূত্র: নীতি আয়োগ, বিহার অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪-২৫, জাতীয় এমপিআই সূচক, এআইসিসি গবেষণা বিভাগ)।
কারেন্ট ম্যাক্রো-ইকোনোমিক সিচুয়েশন বা বর্তমান সামষ্টিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য দায়ী নীতীশ কুমারের সরকার। ভারতের জনসংখ্যার ৯ শতাংশ বিহারে বাস করে কিন্তু ভারতের জিডিপিতে তাদের অবদান মাত্র ৩.০৭ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালে বিহারবাসীর মাথাপিছু আয় ছিল ৩২ হাজার ১৭৪ টাকা বা জাতীয় গড় ১ লক্ষ ৬ হাজার ৭৪৪ টাকার তিনভাগের একভাগ মাত্র। আরও উদ্বেগের বিষয় এই যে, বিহারবাসীর মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে জাতীয় গড়ের তুলনায় কম হারে। ফলত, এই সংক্রান্ত ব্যবধানটিও ক্রমবর্ধমান। ২০২৪-২৫ সালে রাজ্যের রাজকোষ ঘাটতি হয়েছিল জিএসডিপির ৯.২ শতাংশ কিন্তু মূলধনী ব্যয় ছিল জিএসডিপির মাত্র ৪ শতাংশ। এই আর্থিক চিত্র এই ইঙ্গিত দেয় যে, বিহারে ঋণের মাধ্যমে সংগৃহীত সম্পদের বেশিরভাগটাই রাজস্বব্যয় এবং ভোগব্যয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। (সূত্র: আরবিআই, পিআরএস ইন্ডিয়া বাজেট বিশ্লেষণ, এআইসিসি গবেষণা বিভাগ)।
ফাঁদ: ধর্ম এবং বর্ণ
আমার মতে, সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিহার গরিব রয়ে গিয়েছে তার সংকীর্ণ রাজনীতির কারণে। এই রাজ্যের সরকার এবং প্রতিষ্ঠানগুলি ধর্ম ও বর্ণের স্বনির্মিত ফাঁদে আটকা পড়ে গিয়েছে। বিহারে বিভাজনের একটি বড়ো প্রাচীরের নাম ধর্ম। সরকারে বিজেপির উপস্থিতি শাসনব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে ধর্মকে ঢুকিয়ে দিয়েছে। গিরিরাজ সিংয়ের ‘নমক হারাম মন্তব্যটি’ খেয়াল করুন, মুসলমানরা অকৃতজ্ঞ এবং তাই তিনি তাদের ভোট চান না! এই কাণ্ড এমন একটি রাজ্যে যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা ১৭ শতাংশ এবং হিন্দু জনসংখ্যার শতাংশ হার ৮২।
রাজনৈতিক আলোচনাসহ লোকজনের প্রতিটি কথোপকথনে প্রাধান্য পাচ্ছে জাতপাত। তদুপরি, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়কে ওবিসি, এমবিসি, ইবিসির মতো শ্রেণিবিভাগ দিয়ে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ইবিসির অন্তর্গত ১১২টি বর্ণের মধ্যে চারটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয়। অতএব তারা সেখানে আরও প্রভাবশালী বলে গণ্য হচ্ছে। 
ধর্ম এবং বর্ণের প্রভাব ভারতীয় সমাজে স্বাভাবিক। তবে ধর্ম এবং বর্ণের উপর বাড়তি গুরুত্ব আরোপ করা হয় বিহারে। বিহারি জনগণের সম্ভাবনা এসব নষ্ট করে দিচ্ছে। পরিবেশে সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তি এবং সহযোগিতাই কাম্য। সেখানে তার ব্যত্যয় ঘটলে জন্ম নেয় পারস্পরিক সন্দেহ, শত্রুতা, দ্বন্দ্ব এবং তিক্ততা।
নীতীশ কুমারের কোনও পরিবর্তন নেই
বিহারের রাজনীতির পরিবর্তন হওয়া উচিত। কে এর পরিবর্তন করবে? উত্তর আলাদা হতে পারে, তবে এটাই সাধারণ জ্ঞান যে নীতীশ কুমার সেই ব্যক্তি নন যিনি পরিবর্তনের সূচনা করবেন। তিনি তাঁর ২০ বছরের অভ্যাসের মধ্যে আটকে আছেন। তার সঙ্গে যোগ করতে হয় তাঁর স্বাস্থ্য এবং অপ্রত্যাশিত আচরণজনিত সত্যিকার উদ্বেগ। এটা কল্পনা করা বোকামি যে নীতীশ কুমার নিজেকে পালটে ফেলবেন কিংবা বিহারের শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনবেন তিনি। পাঞ্জাব, হরিয়ানা, ওড়িশা এবং মহারাষ্ট্রে বিজেপির বলির পাঁঠাদের মতোই একজন হবেন নীতীশ কুমার। বিজেপির সঙ্গে কোলাকুলি করা প্রতিটি আঞ্চলিক দলই নিজ নিজ পতন দেখেছে বা ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েছে। জেডি(ইউ)-এর ভাগ্য ভিন্ন নাও হতে পারে।
জাতপাতকে ঘরেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। ধর্ম পালন করতে হবে উপাসনালয়ে। এর কোনোটিই রাজনীতি বা শাসনব্যবস্থায় ঢুকে পড়া উচিত নয়। বিহারের মানুষ যখন এই সত্য উপলব্ধির সঙ্গে জেগে উঠবে, তখনই নিজেদের তৈরি ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য লড়াই করবে তারা।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

সম্পর্কিত সংবাদ