Bartaman Logo
১৬ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বহুত্ববাদের মূর্ত প্রতীক প্রভু জগন্নাথ

প্রভু জগন্নাথ হলেন বহুত্ববাদের মূর্ত প্রতীক। তাঁর দর্শন ও রথযাত্রার মাধ্যমে সমাজে ঐক্য প্রতিষ্ঠার বার্তা। বিস্তারিত পড়ুন।

বহুত্ববাদের মূর্ত প্রতীক প্রভু জগন্নাথ
  • ১৬ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শুভজিৎ অধিকারী: রথস্থ বামনং দৃষ্ট, পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে...। খুব পরিচিত শ্লোক। বাংলায় ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়—রথের উপর খর্বাকৃতি প্রভু জগন্নাথ। দর্শন করলেই পুনর্জন্ম থেকে মুক্তি। সরাসরি বৈকুণ্ঠধামে অক্ষয় যাত্রা। আবার, এখানে ‘বামন’ অর্থে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর পঞ্চম অবতারকেও মনে করা হয়। যাঁর আবির্ভাব ত্রেতাযুগে। অসুররাজ বলির দর্পচূর্ণ করে ত্রি-লোকে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জগন্নাথের দারুমূর্তিকেও সেই বামনের দেহাবয়বের সঙ্গে তুলনা করে বিশ্ব-শান্তি, বিশ্ব-ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। ‘জগন্নাথ’-এর বুৎপত্তিগত অর্থ বিশ্লেষণেও সেটাই উঠে আসে। জগন্নাথ অর্থাৎ জগতের নাথ। যিনি জগতের সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখেন। তাঁর চকা আঁখি। চাকতির মতো গোলাকার চোখ। ঘিরে রয়েছে গোটা ব্রহ্মাণ্ডকে। অনন্ত জাগ্রত ও সর্বদর্শী। তাই, জগন্নাথদেবের নয়নকে ‘শশী-সূর্য নেত্রম’ও বলা হয়। চাঁদ-সূর্যের আলো যেমন জগতের সমস্ত জাতি-ধর্ম, প্রাণী-উদ্ভিদের মধ্যে প্রভেদ না করেই আলোর সম্পাত ঘটায়, তেমনই জগন্নাথের জোড়া আঁখিও তাই। তাঁর দৃষ্টি বৈষম্যহীন, নিরপেক্ষ। বৌদ্ধ, জৈন, মুসলিম, খ্রিস্টান সহ বিশ্বের সব ধর্মের, সব জাতির কাছে তাঁর রথের রশি টানার অধিকার স্বীকৃত। আবার তিনি হিন্দুধর্মের একাধিক ধারা—বৈষ্ণব-শাক্ত-শৈবকেও একসূত্রে গাঁথেন রথে বসেই। তাই যুগ যুগ ধরে রথযাত্রায় শ্রীক্ষেত্র হয়ে ওঠে ‘বিবিধের মাঝে মিলন মহান’-এর প্রতিচ্ছবি। 

Advertisement

অথচ, পুরীর মন্দিরের ভিতর জগন্নাথ কিন্তু সকলের নন! একমাত্র হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের মানুষ ছাড়া অ-হিন্দুদের প্রবেশ সেখানে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। প্রশ্ন হল, জগতের নাথ কি সত্যিই তাঁর এই বৈষম্যের রূপকে স্বীকার করেন? হয়তো মোটেও নয়। নিজের আত্মপ্রকাশেই প্রভু বুঝিয়ে দিয়েছেন, জাতীয় সংহতির আদর্শ দৃষ্টান্তস্বরূপ তিনি বিরাজ করবেন। শ্রীক্ষেত্রে অধিষ্ঠিত হওয়ার আগে জগন্নাথ পূজিত হতেন ‘নীলমাধব’ রূপে। যা আসলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দারু রূপ। নীলকান্ত পাহাড়ে তাঁকে ‘কিটুং’ বা ‘জগন্ত’ দেবতা হিসাবে উপাসনা করতেন বিশ্ববসু নামে আদিবাসী শবর সম্প্রদায়ের এক নৃপতি। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বপ্নাদেশ পেয়ে সেই নীলমাধবকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন। প্রভুর এই আবির্ভাব উপাখ্যানেই নির্দেশিত, তিনি সেই ঈশ্বরীয় সত্ত্বা, যিনি অভেদ-তত্ত্বে গোটা বিশ্বকে আগলে রেখেছেন। ইন্দ্রদ্যুম্নকে স্বপ্নাদেশে জগন্নাথ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, আমার তত্ত্বাবধায়ক হবে বিশ্ববসু। তুমি রাজা হলেও থাকবে রথের সামনে। ঝাড়ু দেওয়া হবে তোমার কাজ। এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হল—জগন্নাথের কাছে জাত-ধর্মের কোনো বিভেদ নেই। সমাজে সব সম্প্রদায়ের মর্যাদা সমান। তুমি রাজা বলে কেউকেটা নন! আবার বিশ্ববসু শবর বলে সমাজে পতিত নন। 
এখানে প্রশ্ন হল, জগন্নাথের এই অভিপ্রায় মন্দির কর্তৃপক্ষের পৃথক নিয়মের গেরোয় কেন আটকা পড়বে? এটি দীর্ঘকালের বিতর্কিত প্রশ্ন। স্বয়ং জগন্নাথ অবশ্য অলৌকিক কিছু ইঙ্গিত দিয়ে বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক অবস্থানকে। সেইসব ইঙ্গিতের তিনটি ঘটনা আজও ভারতের বহুত্ববাদ দর্শন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কিংবদন্তি।  
সময়টা সপ্তদশ শতক। বাংলার সুবেদার ছিলেন জাহাঙ্গির কুলি খান। লালবেগ নামে সমধিক পরিচিত। ওড়িশায় এক সামরিক অভিযানে গিয়ে তিনি দেখতে পান স্নান সেরে ঘরে ফিরছেন অতীব এক সুন্দরী মহিলা। তিনি কুলীন ব্রাহ্মণ কন্যা। অল্প বয়সে বিধবা হয়েছেন। লালবেগ তাঁর রূপে মুগ্ধ হন। জোরপূর্বক তাঁকে প্রাসাদে তুলে এনে বিয়ে করেন। নাম হয় ফতিমা বিবি। সালাবেগা নামে তাঁদের এক পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। বড়ো হয়ে বাবার অভিযানে যোগ দেন সালাবেগা। দুর্ভাগ্যবশত, এক অভিযানে লালবেগ নিহত হন। গুরুতর জখম হন সালাবেগা। ঘরবন্দি হয়ে যান তিনি। মা ফতিমা সেবা-শুশ্রূষা করেন। কিন্তু, মাথার ক্ষত আর কিছুতেই সারে না। মোঘল কবিরাজদের সব চেষ্টা ব্যর্থ। ছেলেকে বাঁচাতে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন ফতিমা। শেষে তিনি ছেলেকে শুধু জগন্নাথের নামজপ করতে বলেন। মায়ের কথা মেনে সালাবেগাও নিজেকে সমর্পণ করে দেন পতিতপাবনের চরণে। একদিন ঘুম থেকে উঠে তিনি অনুভব করেন আগের চেয়ে সুস্থ। মাথার ক্ষতটাও নেই। বিস্মিত সালাবেগা উদভ্রান্তের মতো পুরীর উদ্দেশে রওনা দেন। এসেও কোনোও লাভ হল না। মুসলিম বলে পান্ডারা জগন্নাথ দর্শনে তাঁকে বাধা দিলেন। বললেন, রথযাত্রার দিন তুমি প্রভুর দর্শন পাওয়ার অধিকারী। সালাবেগা তখন মন্দির ও গুন্ডিচার মধ্যবর্তী অংশে দাঁড়িয়ে প্রভুকে প্রণাম করে বৃন্দাবনে চলে যান। বলতে বলতে 
রথের সময় এগিয়ে এল। সালাবেগা বৃন্দাবন থেকে ফের নীলাচলের পথ ধরলেন। কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়লেন পথে। 
এদিকে, ধুমধাম করে রথ টানা চলছে শ্রীক্ষেত্রে। আচমকা জগন্নাথের রথ ‘নন্দীঘোষ’ মন্দির ও গুন্ডিচার ওই মধ্যবর্তী অংশে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিছুতেই আর নড়ে না। অগত্যা পুরোহিতরা সাত দিন রথের উপরেই আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে লাগলেন। সপ্তম দিনের শেষে সালাবেগা পুরী পৌঁছালেন। জগন্নাথকে দর্শন করলেন। কেউই আর বাধা দিলেন না। রথ চলতে শুরু করল। সালাবেগা আর কোথাও গেলেন না। একটি কুটির নির্মাণ করে বসবাস করতে লাগলেন। জগন্নাথকে নিয়ে গান লিখতে লাগলেন। সিংহদুয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে সেই গান গাইতেন। জীবন উপান্তে এসে তিনি শুধু বলতেন—‘হে জগন্নাথ। আমি ধর্মে যবন। আমি তোমার চরণে সমর্পণ করেছি।’ সালাবেগার মৃত্যু হলে ওই কুটিরেই তাঁকে কবরস্থ করা হয়। জগন্নাথের এই পরম মুসলিম ভক্তের সমাধি আজও বিদ্যমান। রথযাত্রায় ‘নন্দীঘোষ’কে সেখানে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখার নিয়মও প্রচলিত।
১৫০৮ সাল। অ-হিন্দু শিষ্য মর্দানাকে নিয়ে পুরীতে এসেছিলেন গুরু নানক। ইচ্ছে ছিল জগন্নাথ দর্শন। মন্দিরে ঢুকতে যাবেন নানক, বাধা দিলেন পান্ডারা। নানক সমুদ্র তটে গিয়ে জগন্নাথদেবের আরাধনায় বসলেন। প্রভুর প্রসাদ থেকে বঞ্চিত হয়ে মুখে কিছু তুললেন না। একদিন সন্ধ্যায় রহস্যময় এক ব্যক্তি এসে সোনার থালায় প্রচুর খাবার, স্বাদু জল নানকের সামনে রেখে অন্তর্ধান হলেন। মন্দিরের পুরোহিতরা প্রভুর ঘুম ভাঙাতে গিয়ে দেখলেন সোনার থালাটাই নেই। খবর পৌঁছল রাজ দরবারে। সোনার পাত্রটির সন্ধানে চতুর্দিক তোলপাড়। ওইদিন রাতে রাজা স্বপ্ন দেখলেন, সমুদ্র সৈকতে এক সাধুকে সোনার থালায় প্রসাদ দিয়ে এসেছেন স্বয়ং জগন্নাথ। সকালে রাজা একাই চলে গেলেন সেখানে। দেখেন নানকের সামনে সোনার থালাটি পড়ে। রাজা প্রণাম করে তাঁকে মন্দিরে প্রবেশের আমন্ত্রণ জানালেন। রাজার অনুরোধে প্রভুর বিগ্রহ দর্শন করে মুগ্ধ হলেন নানক। সেখানে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘জগন্নাথদেব শুধুমাত্র পুরীর ভগবান নন। তিনি সকল জাতি, সকল ধর্মের ভগবান।’ 
চোদ্দ শতকের বিখ্যাত কবি ও সাধু ছিলেন সন্ত কবীর। সুফি মুসলিম পরিবারের সন্তান। প্রাচীন ভারতে জাতিগত সম্প্রীতির গান গেয়ে আজও ইতিহাসে উজ্জ্বল কবীর। সেই কবীর একবার এলেন পুরীতে। তাঁকে মন্দিরে ঢুকতে দিলেন না পান্ডারা। মনকষ্টে ফিরে গেলেন কবীর। জগন্নাথদেব স্বয়ং পান্ডাদের স্বপ্নাদেশে কবীরকে মন্দিরে প্রবেশ করানোর আদেশ দেন। বিপাকে পড়লেন পান্ডারা। কবীরকে এখন খুঁজবেন কোথায়! অনেক কসরত করে কবীরের সন্ধান পেলেন। তাঁকে জগন্নাথ দেবের দর্শন করালেন। 
জগন্নাথ-মাহাত্ম্যে এই তিন কিংবদন্তি এটাই প্রমাণ করে যে, জগতের নাথ ‘ধর্ম নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেবতা’। তা হলে তাঁর মন্দিরে কেন অ-হিন্দুদের প্রবেশ নিষিদ্ধ? উত্তর নিহিত রয়েছে মন্দিরের উপর আক্রমণের ইতিহাসে। ১৫৬৮ সাল। বাংলার আফগান শাসক সুলায়ামান খান কাররানির সেনাপতি কালাপাহাড় বিশাল সৈন্য-সামন্ত নিয়ে মন্দির আক্রমণ করেন। দেদার লুটপাট, ভাঙচুর চালান। এই কালাপাহাড় কিন্তু জন্মসূত্রে মুসলমান ছিলেন না। তাঁর আসল নাম রাজীবলোচন রায়। তিনি বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ। পরে তিনি মুসলিমধর্ম গ্রহণ করে হিন্দুধর্ম বিনাশের সংকল্প নেন। কালাপাহাড় ওই বছর পুরো মন্দির তছনছ করেও ক্ষান্ত ছিলেন না। পরেও বেশ কয়েকবার আক্রমণ করেছিলেন। মূলত, তাঁর আতঙ্কে ১৫৬৮ সাল থেকে ১৫৭৭ সাল পর্যন্ত রথযাত্রা বন্ধ রাখা হয়। সবমিলিয়ে পুরীর মন্দির আক্রমণের মুখে পড়ে ১৮ বার। বারবার এই হামলার কারণেই আনুমানিক ১৬৬০ সালের জুন মাস থেকে মন্দির কর্তৃপক্ষ পাকাপাকিভাবে অ-হিন্দুদের প্রবেশ নিষেধ করে। তারপরও যে আক্রমণ ঠেকানো গিয়েছে, এমনটা নয়। ১৭৩১ সালে মাসুলিপত্তনমের নবাব মহম্মদ তাকি খান মন্দিরে হামলা চালান। জগন্নাথ গবেষক ডঃ সুরেন্দ্র মিশ্র তাঁর গবেষণাধর্মী একটি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, একাধিক ইসলামিক আক্রমণ ও লুণ্ঠনের শিকার হওয়ার আগে পর্যন্ত মন্দিরে প্রবেশের উপর কোনো বিধিনিষেধ ছিল না।’ 
আজ রথযাত্রা। রশিতে ধরা থাক প্রভু জগন্নাথের মহামিলনের মন্ত্র। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ