Bartaman Logo
১৬ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ট্রাম্পের অর্থের নেশা!

ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রিপ্টো ব্যবসা থেকে ১৪০ কোটি ডলার আয় করেছেন। তাঁর সিদ্ধান্তে ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠছে। বিস্তারিত পড়ুন।

ট্রাম্পের অর্থের নেশা!
  • ১৬ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের ছেলে জেমস রুজভেল্ট একটি বিমা কোম্পানির আংশিক মালিক ছিলেন। তাঁর কোম্পানি বড়ো মার্কিন প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার কাছে বিমা পলিসি বিক্রি করত। অথচ তখন তিনি 

Advertisement

তাঁর বাবার উপদেষ্টা। দ্য স্যাটারডে ইভিনিং পোস্ট 
এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জেমস রুজভেল্টের বিমা ব্যবসা নিয়ে বড়ো প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। যা প্রচারিত হয় ‘জিমিস গট ইট’ কেলেঙ্কারি নামে। শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের ছেলেকে তাঁর সরকারি পদ ছাড়তে হয়েছিল।
তবে আমেরিকার ইতিহাসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো এমন উদাহরণ আগে কখনো দেখা যায়নি। সম্প্রতি প্রকাশিত এক আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে, দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার প্রথম বছরেই ট্রাম্প ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা থেকে প্রায় ১৪০ কোটি ডলার আয় করেছেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নেওয়া তাঁর বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যবসা থেকে লাভবান হয়েছেন। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে ট্রাম্পের আয় বেড়ে অন্তত ২২০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। অথচ ক্ষমতায় ফেরার আগে ২০২৪ সালে তাঁর ন্যূনতম আয় ছিল ৬২ কোটি ২০ লাখ ডলার।
‘অল দ্য প্রেসিডেন্টস মানি’ বইয়ের লেখক মেগান গোরম্যান বলেছেন, ‘সম্পূর্ণ নজিরবিহীন’। তিনি ২৫০ বছরের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সম্পদের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেছেন। গোরম্যান বলেছেন, সাধারণত মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ব্যবসায়িক লেনদেন থেকে নিজেদের দূরে রাখতেন। স্বার্থের সংঘাত এড়াতে তাঁরা সব সময় সচেতন থাকতেন। ট্রাম্প ও তাঁর পরিবার ঠিক তার উলটোটা করেছেন। তাঁরা নতুন নতুন ব্যবসা শুরু করেছেন। হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ট্রাম্পের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তে এসব ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠছে।
সংবাদসংস্থা নিউ ইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে, গত অক্টোবরে ট্রাম্প ক্রিপ্টোজগতের শীর্ষ ধনী চ্যাংপেং ঝাওকে ক্ষমা করে দেন। ঝাও বিশ্বখ্যাত ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বিন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা। ২০২৩ সালে অর্থপাচার সহ অবৈধ কার্যকলাপের অভিযোগে বিনান্সের সিইও পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। সংস্থা ৪.৩ বিলিয়ন ডলার জরিমানা দিতে সম্মত হয়। ঝাও নিজেও ৫০ মিলিয়ন ডলার জরিমানা দেন। চার মাস কারাগারে কাটানোর পর ২০২৪ সালে মুক্ত পান। ঝাও ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যাঁকে ব্যাংকের গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের কারণে জেলে পাঠানো হয়েছিল। দুর্নীতিতে অভিযুক্ত এমন ব্যক্তিকে 
ট্রাম্প ক্ষমা করেছিলেন কেন? আসলে ট্রাম্প পরিবারের নিজস্ব ক্রিপ্টো ব্যবসার অন্যতম প্রধান অংশীদার এই বিন্যান্স।
এ ছাড়া গত জুলাইয়ে ট্রাম্প ‘স্ট্যাবলকয়েন’ নামে একধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সিকে উৎসাহিত করতে একটি আইনে সই করেন। ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নিজেদের ‘স্ট্যাবলকয়েন’ বাজারে আনার মাত্র চার মাস পরই তিনি এই আইনে সই করেন। লেখক মেগান গোরম্যান মনে করেন, ট্রাম্পের এই কর্মকাণ্ড আমেরিকার সামাজিক চুক্তির সঙ্গে একধরনের বিশ্বাসঘাতকতা। কারণ, জর্জ ওয়াশিংটনের সময় থেকেই নীতিটি প্রচলিত যে, দেশের নেতারা নিজের স্বার্থের চেয়ে দেশকেই বড়ো করে দেখবেন। হোয়াইট হাউস ও ট্রাম্প পরিবার বারবার প্রেসিডেন্টের আয়সংক্রান্ত সব প্রশ্ন খারিজ করে দিয়েছে। তারা যুক্তি দিয়েছে, ট্রাম্পের দুই ছেলে—এরিক ট্রাম্প ও ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র পারিবারিক ব্যবসা পরিচালনা করেন। ফলে এখানে স্বার্থের কোনো সংঘাত নেই। ডেল টেকনোলজিসের মতো কোম্পানিতে ট্রাম্পের পক্ষে শেয়ার কেনা 
নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেবল মার্কিন জনগণের স্বার্থেই কাজ করেন। ভুয়ো সংবাদমাধ্যমগুলি বছরের পর বছর ধরে ট্রাম্প ও তাঁর ব্যবসার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করেছে। এসব অভিযোগ সত্য নয় বলেই জনগণ তাঁকে বিপুল ভোটে আবার নির্বাচিত করেছেন।’
ট্রাম্পের নতুন আয়ের সিংহভাগই এসেছে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রাশিল্প থেকে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে ট্রাম্প যখন দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে, তখন তাঁর পরিবার ক্রিপ্টোকারেন্সিতে ব্যাপক বিনিয়োগ শুরু করে। ট্রাম্প তাঁর পারিবারিক ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্স’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা। এই ব্যবসা থেকে প্রেসিডেন্টের ৭৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার আয় হয়েছে। এই আয়ের একটি বড়ো অংশ এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সরকারের কাছ থেকে। আমিরশাহির সরকার ওই কোম্পানির শেয়ার কিনেছে।
অভিষেকের তিন দিন আগে ট্রাম্প ‘$TRUMP’  নামে একটি মিমকয়েন চালুর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন। এটি এক বিশেষ ধরনের ক্রিপ্টো টোকেন। এই ব্যবসা থেকে তিনি নতুন করে আরও ৬৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার আয় করেছেন। এই আয়ের পরিমাণ ২০২৪ সালে সারা বিশ্বে তাঁর পরিচালিত অন্যান্য সব ব্যবসার মোট আয়ের চেয়েও সামান্য বেশি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) একটি বিবৃতি দেয়। সেখানে বলা হয়, এই ধরনের টোকেনগুলি আর কমিশনের নজরদারির আওতায় থাকবে না। বাইডেন প্রশাসনের সময় সংস্থাটির চেয়ারম্যান যে অবস্থান নিয়েছিলেন, এই সিদ্ধান্ত ছিল তার ঠিক উলটো। এই সিদ্ধান্তের ফলে ট্রাম্পের মিমকয়েন ব্যবসা সরাসরি লাভবান হয়।
সৌদি আরবের এক আবাসন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রিয়েল এস্টেট চুক্তি থেকেও ট্রাম্প ও তাঁর ছেলেরা কোটি কোটি ডলার আয় করেছেন। এই চুক্তির সঙ্গে সৌদি সরকারও জড়িত। এ ছাড়া ভিয়েতনাম ও রোমানিয়াতেও তাঁদের রিয়েল এস্টেট ব্যবসা থেকে বড়ো অঙ্কের অর্থ এসেছে।
তবে ট্রাম্পের এই আয়ের হিসাবে তাঁর ছেলেদের কিছু ব্যবসার মুনাফা ধরা হয়নি। তাঁর ছেলেরা সম্প্রতি সামরিক ঠিকাদারি ও ‘প্রেডিকশন মার্কেট’  কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছেন। এছাড়া খনিজ সম্পদ উত্তোলনের খনি তৈরির জন্য তাঁরা কোটি কোটি ডলারের সরকারি সাহায্যেরও চেষ্টা করছেন। এসব ক্ষেত্র থেকে ট্রাম্প সরাসরি টাকা না পেলেও তাঁর পরিবার বড়ো অঙ্কের মুনাফা অর্জন করছে।
২০১৭ সালে ট্রাম্প যখন প্রথম মেয়াদে ওয়াশিংটনে আসেন, তখন তিনি ও তাঁর পরিবার নতুন কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবসা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। হোয়াইট হাউসে থাকার সুযোগ নিয়ে তাঁরা লাভবান হচ্ছেন—এমন অভিযোগ এড়াতেই এই চুক্তি করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও স্বার্থের সংঘাত নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। বিদেশি সরকারি প্রতিনিধিদের সফর এবং ট্রাম্পের হোটেল ও অন্যান্য প্রজেক্টে লবিস্টদের খরচ করা নিয়ে এসব বিতর্ক তৈরি হয়।
দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার পর ট্রাম্প পরিবার মুনাফা অর্জনের ব্যাপারে কোনো রাখঢাক রাখছে না। ২০২৪ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে এরিক ট্রাম্প দাবি করেন, ‘প্রথম মেয়াদে কোনো ধরনের অনৈতিকতা এড়াতে আমরা সম্ভাব্য সবকিছুই করেছিলাম। কিন্তু সত্যি বলতে, আমরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আমরা চিরকাল হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না, আর আমি তা করবও না।’ তাঁর দাবি, প্রেসিডেন্সির কারণে তাঁর বাবাকে বিশাল অঙ্কের সম্পদ হারাতে হয়েছে।
এ কথা ঠিক, ট্রাম্পের ছেলেরাই মূলত ব্যবসা পরিচালনা করেন। ট্রাম্প প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার পর কিছু ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছিল। আইনিভাবে তাঁরাই সেসব ট্রাস্ট নিয়ন্ত্রণ করেন এবং ব্যবসার আয় সংগ্রহ করেন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই এসব ট্রাস্টের সুবিধাভোগী। ফলে এই ব্যবসায়িক চুক্তিগুলো থেকে পরোক্ষভাবে তিনিই লাভবান হচ্ছেন। বিপরীতে আধুনিক সময়ের অধিকাংশ মার্কিন প্রেসিডেন্টই তাঁদের মালিকানাধীন ব্যবসা বা শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন। জর্জ ডব্লিউ বুশ নির্বাচনের আগেই টেক্সাস রেঞ্জার্স বেসবল দলের শেয়ার বিক্রি করেছিলেন। অন্যদিকে জিমি কার্টার তাঁর চীনাবাদাম খামারের দায়িত্ব একজন স্বতন্ত্র ট্রাস্টির হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টদের নিয়ে গবেষণা করা ইতিহাসবিদেরা বলছেন, হোয়াইট হাউসে যাওয়ার ঠিক আগে নতুন ব্যবসায় নামা এবং নিজের জমানায় ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার উদাহরণ আগে আর দেখা যায়নি। আমেরিকার ইতিহাসে এমন কোনো প্রেসিডেন্টের নজির নেই। ইতিহাসবিদেরা বলছেন, ট্রাম্প ও তাঁর পরিবারের বর্তমান কর্মকাণ্ড এই ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
জ্যারেড কুশনারের কথাই ধরুন। তিনি তাঁর শ্বশুর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিদেশনীতি উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। অন্যদিকে তাঁর প্রাইভেট ইকুইটি ফার্ম মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সার্বভৌম তহবিল থেকে কয়েকশো কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে। গোটা পরিবার যা করছে তা অত্যন্ত খোলামেলা এবং বেপরোয়া। প্রায় গর্বের সঙ্গেই তাঁরা সরকারি পদ ব্যবহার করে ব্যবসা করছেন।
আমেরিকার ইতিহাস কি ট্রাম্পের এই অর্থের নেশাকে প্রশ্রয় দেবে? নাকি স্বজনপোষণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতির সঙ্গে আপস করবে?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ