Bartaman Logo
১৬ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মন্দিরে চুরির দায় কার?

মন্দিরে চুরির ঘটনা উদ্বেগজনক। কোটি কোটি টাকার দান চুরি হচ্ছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিস্তারিত পড়ুন।

মন্দিরে চুরির দায় কার?
  • ১৬ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মন্দিরে ভক্তরা প্রণামি উৎসর্গ করেন ঈশ্বরকে, কোনো সরকারকে নয়। কিন্তু সেই প্রণামি বা দান-সামগ্রী যখন লাগাতার চুরি, তছরুপ কিংবা জালিয়াতির অভিযোগে কলঙ্কিত হয়, তখন প্রশ্নটা আর কেবল দু’-দশজন কর্মীর অপরাধে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্ন ওঠে গোটা ব্যবস্থার দিকে। সম্প্রতি দেশের একের পর এক মন্দিরে ধরা পড়া চুরির ঘটনাগুলি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সেগুলিকে নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রামমন্দির, বদ্রীনাথ, দেবী অম্বাজি, বৈষ্ণোদেবী— শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, কোটি কোটি মানুষের আস্থা-বিশ্বাসের কেন্দ্র। সেই বিশ্বাসের ভিতেই যদি চুরির হাত পড়ে, তাহলে তা কেবল আর্থিক অপরাধ নয়; এটি সামাজিক ও নৈতিক বিশ্বাসভঙ্গ। রামমন্দিরে কোটি কোটি টাকা প্রণামি এবং দানের সামগ্রী-অলংকার চুরি হয়েছে। আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বদ্রীনাথ ধামে দানের নগদ অর্থ, সোনা-রুপোর মুদ্রা এবং শালগ্রাম শিলা আত্মসাৎ করে একজন ধরা পড়েছেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজ্য গুজরাতে ৫১ সতীপীঠের অন্যতম দেবী অম্বাজি মন্দিরে সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে দান গণনার ঘর থেকেই টাকার বান্ডিল সরানোর চেষ্টা। জম্মুর বৈষ্ণোদেবী মন্দিরে আবার প্রণামির ভাণ্ডারে জমা পড়া প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা মূল্যের রুপোই ‘নকল’ বলে জানা গিয়েছে। ধর্মস্থান আলাদা, পরিচালন ব্যবস্থা আলাদা, কিন্তু সমস্যার চরিত্র এক! প্রশ্নটিও অভিন্ন— মন্দিরের দান ও সম্পদের নিরাপত্তা কোথায়?

Advertisement

মন্দিরে ভক্তেরা দান করেন ঈশ্বরের উদ্দেশে। সেই অর্থ কোনো ব্যক্তি, কোনো কমিটি বা কোনো সরকারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি একটি জনগণের তহবিল, তাঁদের বিশ্বাস-আস্থার তহবিল। সেই তহবিলের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রথম দায়িত্ব। এখানেই দায়ের প্রশ্ন আসে। যে মন্দির যে ট্রাস্ট বা কমিটির হাতে পরিচালিত, তাদের প্রশাসনিক দায় অস্বীকারের উপায় নেই। নিয়োগ, নজরদারি, হিসাবরক্ষণ, নিরাপত্তা— সবই তাদের দায়িত্ব। কর্মীর অপরাধ ব্যক্তিগত হতে পারে, কিন্তু সেই অপরাধের সুযোগ তৈরি হলে তা প্রতিষ্ঠানেরও ব্যর্থতা। কিন্তু সেখানেই কি দায় শেষ? বিশেষ করে যখন অযোধ্যার রামমন্দিরকে জাতীয় গৌরবের প্রতীক হিসাবে তুলে ধরেছে খোদ কেন্দ্রীয় সরকারই? শিলান্যাস থেকে প্রাণপ্রতিষ্ঠা— প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বের মুখ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং। বিজেপি নিজেকে হিন্দুত্বের রক্ষক বলে দাবি করে। প্রধানমন্ত্রীও বারবার সনাতন সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও পুনর্জাগরণের কথা বলেন। কিন্তু সনাতনের রক্ষা কি শুধুই নতুন মন্দির নির্মাণে? শুধুই প্রাণপ্রতিষ্ঠার জাঁকজমকে? শুধুই তীর্থযাত্রীদের উপর হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টিতে? মন্দিরের প্রতিটি প্রণামি, প্রতিটি অলংকার, প্রতিটি দানের হিসাব এবং প্রত্যেক ভক্তের বিশ্বাস অক্ষত রাখার মধ্যে নয়? সবচেয়ে বিপজ্জনক হল, এই ধরনের ঘটনার পরে দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। মন্দির কর্তৃপক্ষ বলে, এটি কয়েকজন কর্মীর ব্যক্তিগত অপরাধ। সরকার বলে, ট্রাস্ট স্বাধীন। রাজনৈতিক দল নীরব থাকে! অথচ যে ভক্তের দান চুরি হল তিনি তো ট্রাস্ট, সরকার বা কর্মচারীর পার্থক্য করেন না। তাঁর বিশ্বাসটাই ভেঙে যায়। মন্দির নির্মাণের কৃতিত্ব যদি সরকার ও শাসকদল নেয়, তবে মন্দিরের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দুর্নীতি কিংবা দানসম্পদ রক্ষায় গাফিলতির ক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণ দায়মুক্ত থাকবে কেন? সুবিধার সময়ে মন্দির রাষ্ট্রের, আর সমস্যার সময়ে শুধুই ট্রাস্টের— এমন যুক্তি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিটি মন্দিরের দৈনন্দিন প্রশাসনের জন্য সরাসরি দায়ী। ভারতের অধিকাংশ মন্দির পৃথক ট্রাস্ট, দেবত্র বোর্ড বা রাজ্য আইনের অধীনে পরিচালিত। কিন্তু যেখানে সরকার নিজেকে অভিভাবকের ভূমিকায় প্রতিষ্ঠা করে, সেখানে নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়ও তৈরি হয়। অন্তত স্বচ্ছ তদন্ত, নিয়মিত অডিট এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ সরকারের কাছ থেকে প্রত্যাশিত। আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। দেশের নানা প্রান্তে মন্দিরের আয় এখন হাজার হাজার কোটি টাকা। অথচ বহু ক্ষেত্রেই সেই বিপুল সম্পদের ব্যবস্থাপনায় আধুনিক আর্থিক শাসনব্যবস্থা, স্বাধীন অডিট, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং প্রকাশ্য হিসাবের সংস্কৃতি এখনও পর্যাপ্ত নয়। মন্দির কোনো রাজনৈতিক প্রতীকের নাম নয়; এটি মানুষের আস্থার স্থান। সেখানে দানের অর্থ চুরি হোক, নকল ধাতু জমা পড়ুক বা সম্পদের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠুক— প্রতিটি ঘটনাই সেই আস্থাকে আঘাত করে। মন্দিরে কত কোটি টাকা দান এল, কত ভক্ত এলেন, কত বড়ো করিডর তৈরি হল—এসব নিয়ে যত প্রচার হয়, তার সামান্য অংশও দেখা যায় না স্বচ্ছ হিসাব, স্বাধীন অডিট বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার ক্ষেত্রে। অথচ প্রকৃত ধর্মরক্ষা সেখানেই।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ