Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাঙালি কি তার নিজভূমেই পরবাসী হয়ে যাবে?

নববর্ষের সূর্যটাকে একেবারে আনকোরা নতুন মনে হয়। সত্যিই কি তাই! অযুত সহস্র বছরের যাত্রাপথে মহাকালের হিসাবে এটা আর পাঁচটা দিনের মতোই আর একটা।

বাঙালি কি তার নিজভূমেই পরবাসী হয়ে যাবে?
  • ১৬ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সন্দীপন বিশ্বাস; নববর্ষের সূর্যটাকে একেবারে আনকোরা নতুন মনে হয়। সত্যিই কি তাই! অযুত সহস্র বছরের যাত্রাপথে মহাকালের হিসাবে এটা আর পাঁচটা দিনের মতোই আর একটা। কিন্তু বাঙালির অনুভবে, তার নিজস্ব সংস্কৃতির পরিমাপে পয়লা বৈশাখ এক নতুন দিন, নতুন বিশ্বাসে জেগে ওঠার দিন। কিন্তু সেই নতুন বিশ্বাসের মধ্যেও সে আঁকড়ে ধরে থাকতে চায় তার শিকড়টুকু। এটা তার আত্মজাগরণের দিনও। নতুন শপথে, নতুন অঙ্গীকারে ফেলে আসা দিনগুলির ভুলত্রুটিকে জীবনের খতিয়ান থেকে সে মুছে ফেলে।  

Advertisement

বাঙালির নববর্ষ পালনের ইতিহাস খুব বেশিদিনের নয়। তা এসেছে মূলত ইংরেজদের বর্ষবরণ দেখে। তার আগে যে নববর্ষ বা ‘পুণ্যাহ’ হতো, তার সঙ্গে ছিল কৃষির সম্পর্ক। ইংরেজি নববর্ষে সারারাত সাহেবরা নাচ, গান আর সুরায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকতেন। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তাই নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন, ‘খৃষ্ট মতে নববর্ষ অতি মনোহর / প্রেমানন্দে পরিপূর্ণ যত শ্বেত নর।।’ তাই দেখে বাঙালি জমিদার বাড়িতে নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়। তার খানিকটা ছিল সাহেবদের খুশি করার চেষ্টা। মূলত পলাশির যুদ্ধের পর শহরে ধনিক শ্রেণির, বাবু সংস্কৃতির আমদানি ঘটে। পয়লা বৈশাখের দিন বিভিন্ন জমিদার বাড়িতে সকালে হতো বাড়ির কূলদেবতার পুজো। আর সেইসঙ্গে থাকত ঢালাও খানাপিনা। সন্ধ্যা হলেই ঘুঙুরের বোলে রঙিন হয়ে উঠত নাচমহল। 
এবারের নববর্ষের আবহ দেখে মনে পড়ে যাচ্ছে কবিগুরুর কথা। তিনি তাঁর ‘স্ফুলিঙ্গ’ কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতায় বলেছেন, ‘নববর্ষ এল আজি / দুর্যোগের ঘন অন্ধকারে; / আনে নি আশার বাণী,/ দেবে না সে করুণ প্রশ্রয়।’ আজকের চারিদিকে তাকালে সত্যিই কি মনে হয় না এক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দুর্যোগের আঁধারে ঢাকা নতুন প্রভাত এসে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের দ্বারপ্রান্তে? আমরা কি প্রশ্ন করতে পারি না, ‘হে নতুন বছর কী আশার বাণী এনেছ তুমি?’ বাঙালির নববর্ষ এখন তো শুধু আনন্দের নয়, তা যেন এক নিজের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার লড়াই। গত কয়েক বছরে অবাঞ্ছিত বেনোজল এসে বাংলার সংস্কৃতিকে অবিরত নষ্ট করার চেষ্টা করে চলেছে। নষ্ট করছে তার ভাষাকে। নষ্ট করছে তার জীবন, বাসভূমি এবং পরিমণ্ডলকে। নষ্ট করছে তার খাদ্যাভ্যাস তার বাঙালিয়ানাকে। এর পিছনে রয়েছে রাজনৈতিক কূটকৌশল। অত্যন্ত ঘৃণ্য সেই কূটকৌশল। বাঙালিকে ঘৃণা করতে শেখায় সেই উটকো সংস্কৃতি। বাংলা সংস্কৃতির ওপর গুটখার আক্রমণ কী আমরা মুখ বুজে সহ্য করে যাব? সারা বছর অন্য সংস্কৃতির দাসত্ব করে বছরে একদিন বাঙালিয়ানার বাতিক জেগে উঠলে বাঙালি বা বাংলা বাঁচবে না। এই মুহূর্তে যে রাজনীতি, যে ধর্মনীতি, যে আগ্রাসন আমাদের গিলে খেতে আসছে, তা মোটেই আমাদের জীবনযাত্রা, শিক্ষা বা মূল্যবোধের সঙ্গে খাপ খায় না।  বাঙালি চিরকালই শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে দশজনের মধ্যে একজন হয়ে থেকেছে। সারা দেশকে সে পথ দেখিয়েছে। আজ বাঙালি আলস্যে, কূপমণ্ডুকতায়, দীন ভাবনায় দীর্ণ। সে অনুকরণপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই বাছবিচার না করেই সে সন্তোষী মা, রামনবমী, হনুমান জয়ন্তীতে মেতে ওঠে। বারো মাসে তেরো পার্বণের ওপর চাপছে বহিরাগত অজস্র পার্বণের ভার। বাঙালির সংস্কৃতি, তার ধর্মাচরণের মধ্যে কোনওদিনই আগ্রাসন ছিল না। তার ধর্মাচরণের মধ্যে ছিল মিলনের বার্তা। এখন সব আমদানি করা হচ্ছে। বাঙালিকে নিজভূমে পরবাসী করার এই কৌশলকে চিনতে না পারলে, একদিন আমাদের হা-হুতাশ করতে হবে। যে জাতি নিজের জাতিসত্তা বা ধর্মের গণ্ডি থেকে বিচ্যুত হয়, তাকে অন্যের ধর্মক্ষুধা গিলে খেয়ে নেয়। আসলে কোনও ধর্মের মধ্যেই হিংসার স্থান নেই। তাই কোনও ধর্মের মধ্যে যদি হিংসার প্রকাশ দেখা যায়, তখন বুঝতে হবে কেউ কেউ তা স্বার্থসিদ্ধির জন্য তাকে ব্যবহার করছে। 
বাংলাকে আজ চারদিক থেকে হীন মানসিকতা নিয়ে নাগপাশে জড়িয়ে ফেলার নিরন্তর চেষ্টা 
চলছে। এখানে অশান্তির দাবানল জ্বালিয়ে কার্যসিদ্ধি করার নগ্ন প্রয়াস জারি রয়েছে। বাংলার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে বারবার বহিঃশত্রুর আক্রমণ সত্ত্বেও বাংলাকে বিনষ্ট করে ফেলা যায়নি। একদা সতেরো জন সেনা নিয়ে বখতিয়ার খিলজি বাংলা জয় করেছিলেন। লক্ষ্মণসেন পালিয়ে গিয়েছিলেন। অনেকে বলেন লক্ষ্মণসেন অত্যন্ত ভীতু রাজা 
ছিলেন। আসলে সেদিন কয়েকজন বাঙালি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। লক্ষ্মণসেনের স্বৈরশাসনের হাত থেকে বাঁচতে হিন্দুদের একাংশ এবং বৌদ্ধরা সেদিন মুসলিম শাসককে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আরও আছে। সিরাজদৌল্লাকে সিংহাসন চ্যুত 
করে ইংরেজদের হাতে দেশকে তুলে দিতে একদিন যাঁরা চক্রান্ত করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেক হিন্দু এবং বাঙালি ছিলেন। এভাবেই বাঙালি বারবার আত্মঘাতী পদক্ষেপ নিয়েছে।   
স্বাধীনতা আন্দোলনের দিনেও নরেন গোঁসাইদের মতো বিশ্বাসঘাতকদের ইংরেজরা পুষতেন। আজও কিন্তু বাঙালির মধ্যে ছদ্মবেশে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য বিশ্বাসঘাতক। তারা আপন স্বার্থসিদ্ধির জন্য বাঙালির মনন, তার ধর্মচেতনা, তার শিক্ষাকে আমূল বদলে দিতে চাইছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লালসা নিয়ে অশান্তির বাতাবরণ তৈরি করে এখন ঘোলা জলে মাছ ধরার চেষ্টা চলছে। প্রশ্ন উঠছে, বাংলা কি তবে হিন্দিভাষীদের কলোনি হয়ে উঠবে? আর উটপাখি হয়ে বাঙালি হিন্দুত্বের ছিলিম টেনে বালিতে মুখ গুঁজে সব না দেখার ভান করবে?
মনে রাখা দরকার, ধর্মীয় বুদবুদের আড়ালে প্রতিদিন কিন্তু গোটা দেশ অর্থনৈতিক ছুরির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে। রামনবমী, হনুমান জয়ন্তী, ওয়াকফ এসবের জিগির তুলে আপাত উন্মাদনার আড়ালে আপনি, আমি নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি। জীবনধারণ অসহনীয় হয়ে উঠছে। তেলের দাম, গ্যাসের দাম, শেয়ার বাজারে পতন, ডলারের দামের প্রেক্ষিতে টাকার পতন, সোনার দাম সাধ্যের বাইরে চলে যাওয়া, জাল ওষুধের রমরমা, চাকরির বাজার শূন্য হয়ে যাওয়া— এসবের মধ্যে লুকিয়ে আছে প্রতিটি দেশবাসীর পতনের বীজ। মোদিরাজের প্রতিটি পদক্ষেপ দেশের মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকূপের দিকে। মনে রাখা দরকার, দেশের সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য কোনও নির্বাচনী ফান্ড বা তোলাবাজি নেই। সাধারণ মানুষ ব্যাঙ্ক থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা ধার নিয়ে শোধ করতে না পারলে তাঁর ঘাড় ধরে আদায় করা হয়। কিন্তু বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতিরা পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে সরকার তাঁর টিকিটিও ছুঁতে পারে না অথবা না ছুঁতে পারার ভান করে। ব্যাঙ্ক তাঁর ঋণ মকুব করে দেয়।  
একটা উস্কানি ডেকে আনে আর একটা হিংসাকে। এটাই শাশ্বত নিয়ম। ‘এলোমেলো করে দে মা লুটেপুটে খাই’ বলে যারা ছক কষছে, সাধারণ মানুষ যেন তাদের ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের বিপন্ন করে না তোলেন।
সব জিনিসেরই একটা মোটিভ থাকে। প্রথমে ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখা দরকার, এরাজ্যে ঘন ঘন অশান্তি হলে কার লাভ বেশি, শাসক দলের না বিরোধীদের? তাহলে এখানে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সুবিধা হয় কি? রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করেই কি ছাব্বিশের ভোটের ছক কষা হচ্ছে? নববর্ষের এই আবহে এই ভাবনাটুকুকে যে কিছুতেই মন থেকে সরিয়ে ফেলা যাচ্ছে না। হিংসায় হিংসা বাড়ে, প্রেমে বাড়ে শান্তি। এই আপ্তবাক্যটুকু ভুলে গেলে চলবে না। রাজনীতি হোক বা ধর্ম, মানবকল্যাণের একটাই পথ। তাকে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মতো দানব করে তুললে সে কিন্তু কাউকেই ছাড়বে না। লোকালয়ে আগুন জ্বললে শুধু বাসস্থান নয়, সব ধর্মস্থানই একদিন পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। মনে রাখা দরকার, আজ মানুষের সব থেকে বড় শত্রু হল সোশ্যাল মিডিয়া। সেখানে অসংখ্য মিথ্যাচার, অসংখ্য প্ররোচনা, হিংসার প্রকাশ মানুষকে প্রতি মুহূর্তে বিভ্রান্ত করে চলেছে। তাকে উন্মার্গগামী করে তুলেছে। এমন একদিন আসবে যেদিন শান্তির খোঁজে মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেই।  
এই দুঃসময়ে সম্বৎসরের প্রিয় বিরিয়ানি, এগরোল আর ধোসাকে সরিয়ে রেখে শুধু মোচার ঘণ্ট, থোড়ের ডালনা আর মানকচুর স্বাদ নিলেই বাঙালিয়ানাকে পুনরুদ্ধার করা যায় না। বাঙালিকে চিনতে হবে এই মুহূর্তে তার সঙ্কটটুকুকে। কেননা প্রতি মুহূর্তে বাঙালিকে ভাতে মারার চেষ্টা চলছে। শিশিরকুমার ভাদুড়ি একবার বলেছিলেন, আমি যদি খেতে না পাই, তবে আমি শীর্ণ হয়ে যাব, কিন্তু আমার উচ্চতা একটুও কমবে না। এই যে আত্মগরিমা, এটুকু না বুঝলেই আমাদের বিনাশ। বাঙালি মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে জানে। 
একসময় বড়বাজারের ব্যবসার হাল ধরা ছিল বাঙালির হাতে। সেই ব্যবসা শুধু উদ্যমের অভাবে হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে। বাংলা নববর্ষ মানেই ছিল নতুন গানের, নতুন বইয়ের আত্মপ্রকাশ। নববর্ষের পুণ্য প্রভাতে একসময় কত  নতুন পত্রিকা আত্মপ্রকাশ করেছে। ১৮৭২ সালের পয়লা বৈশাখ প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার। বাংলা বছরের প্রথম দিনটিকে শুভ বিবেচনা করে বিদ্যাসাগর মহাশয় এই দিনে প্রকাশ করেন বাঙালির নিজস্ব অভিজ্ঞান ‘বর্ণপরিচয়’। পয়লা বৈশাখ পথচলা শুরু হয়েছিল উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘সন্দেশ’ পত্রিকা। সুরেশচন্দ্র সমাজপতির ‘সাহিত্য’ ও রামানন্দ চট্টোপাধ্যয়ের ‘প্রবাসী’ পত্রিকা জন্ম নিয়েছিল নববর্ষের পুণ্য বাসরে। বাঙালির প্রাণের আরাম আর আত্মার শান্তির দিকনির্দেশ করে বাংলা নববর্ষ। তাই আজ তর্কবাগীশ, অনুকরণপ্রিয়, আত্মঘাতী বাঙালির ঘুরে দাঁড়ানোর দিন। নববর্ষ শুধু একটা পার্বণ নয়, তার আত্ম-আবিষ্কারের দিনও, তার নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলার দিন। নিজের অস্মিতাকে ফিরে পাওয়ার দিন। সেটা ভুললে কালিদাসের মতো হবে। যে ডালে বসে আছি, সেই ডালটা কেটে আত্মবিনাশের পথে হেঁটে যাব। আর নয় প্ররোচনা। এবার আপন জাতিসত্তার গৌরবকে সামনে রেখে এগিয়ে চলার কথা ভাবতেই হবে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ