নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: ঘুমের ওষুধ খাইয়ে স্বামীকে বেহুঁশ করার পর কাটারি দিয়ে কুপিয়ে খুন করে স্ত্রী। তারপর চিৎকার করে ডাকাত পড়ার গল্প ফাঁদে। উদ্দেশ্য, খুনের ঘটনাকে অন্য দিকে ঘোরানো। কিন্তু, শেষরক্ষা আর হয়নি। পুলিস গ্রেপ্তার করে অভিযুক্ত স্ত্রীকে। তমলুক গ্রামীণের পিপুলবেড়িয়ায় ২০১৯ সালে ২৪ জানুয়ারি ঘটে যাওয়া সেই হাড়হিম ঘটনায় স্ত্রীর যাবজ্জীবন সাজা দিল তমলুকের ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট। বৃহস্পতিবার সাজা ঘোষণা করেন বিচারক মনদীপ সাহারায়।
সাজাপ্রান্তের নাম সুপর্ণা দাস ওরফে ফুল্টি। নিহত যুবকের নাম কার্তিক দাস। যাবজ্জীবনের পাশাপাশি ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অনাদায়ে আরও এক বছর কারাদণ্ডের সাজা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারিনী তথা নিহতের মা সন্ধ্যা দাসকে পাঁচ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্যের জন্য জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
জানা গিয়েছে, নিহত কার্তিক দাস আখের ব্যবসা করতেন। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর ২০১৮ সালে তিনি সুপর্ণাকে বিয়ে করেন। সুপর্ণারও এটি দ্বিতীয় বিয়ে। কার্তিকের প্রথম পক্ষের দুই মেয়ে রয়েছে। সুপর্ণার প্রথম পক্ষের এক ছেলে রয়েছে। বিয়ে করার ছ’মাসের মধ্যেই দাম্পত্য কলহ শুরু হয়। সেই বিবাদের নেপথ্যে কারণ দু’টি। এক, আর্থিক অনটন। দুই, সুপর্ণাকে সন্দেহ করতেন কার্তিক।
গত ২০১৯ সালের ১৪ জানুয়ারি রাতে খাবার খেয়ে বিছানায় যান কার্তিক। আন্টাসিডের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে সুপর্ণা তাঁকে বেহুঁশ করে দেয় প্রথমে। রাত আড়াইটা নাগাদ অচৈতন্য অবস্থায় কার্তিক দাসকে বিছানা থেকে নীচে নামিয়ে দেয়। মাথায় একটি বাটাম দিয়ে আঘাত করার পর কাটারি দিয়ে গলা কেটে খুন করে স্ত্রী। রক্তে ভেসে যায় গোটা এলাকা। সেই সময় চিৎকার করে সুপর্ণা প্রতিবেশীদের ডাকাডাকি করে। বাড়িতে ডাকাত ঢুকে পড়েছে বলে গল্প তৈরি করে। সেই সময় সে বাথরুমে ছিল বলেও দাবি করে। কিন্তু, বাড়ির সবকটি দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। ফলে তার সেই গল্প ধোপে টেকেনি। তমলুক থানার পুলিস দেহ উদ্ধার করে। জেরায় সুপর্ণা ভেঙে পড়ে। স্বামীকে খুন করার কথা স্বীকার করে নেয়। খুনে ব্যবহৃত কাটারি পুলিসের হাতে তুলে দেয়। এছাড়াও, ঘটনার পুনর্নির্মাণে সবটাই অভিনয় করে দেখায়।
১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যদান শেষে বৃহস্পতিবার ওই খুনের ঘটনার রায় ঘোষণা করে আদালত। এদিন কোর্ট চত্বরে হাজির ছিলেন নিহত কার্তিক দাসের মা সন্ধ্যাদেবী। রায় ঘোষণার পর তিনি কেঁদে ফেলেন। সন্ধ্যাদেবী বলেন, বিনা অপরাধে ছেলেকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। ছ’বছর বাদে অবশেষে ন্যায় বিচার পেলাম। ছেলের খুনি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেল। সরকারি আইনজীবী দেবাশিস ভট্টাচার্য বলেন, আর্থিক অনটন এবং স্ত্রীকে সন্দেহ করা নিয়ে দাম্পত্য ঝামেলা হতো। তারপর স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে খুন করে সুপর্ণা। ওই খুনের দায় অন্যের উপর চাপিয়ে রেহাই পাওয়ার চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু, সেই চেষ্টা ধোপে টেকেনি। এদিন আদালত যাবজ্জীবন সাজা ঘোষণা করেছে।