Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শিক্ষামন্ত্রীর আচরণ এমন হবে কেন?

ফের চর্চায় ‘আত্মনির্ভর ভারত’। সৌজন্যে সুকান্ত মজুমদার। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতবর্ষ কীভাবে উন্নতি করবে, চলছে তারই প্রচার। ‘বিকশিত ভারত’ দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও ২২ বছর।

শিক্ষামন্ত্রীর আচরণ এমন হবে কেন?
  • ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: ফের চর্চায় ‘আত্মনির্ভর ভারত’। সৌজন্যে সুকান্ত মজুমদার। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতবর্ষ কীভাবে উন্নতি করবে, চলছে তারই প্রচার। ‘বিকশিত ভারত’ দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও ২২ বছর। সালটা ২০৪৭। স্বাধীনতা লাভের শতবর্ষ। আলোড়িত করতে হবে ভারতবাসীর হৃদয়। আবেগে ভাসাতে পারলেই কেল্লা ফতে। প্রমাণ বালাকোট। সেই অঙ্কেই ন্যাশানাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে(এনআইটি) গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষা রাষ্ট্রমন্ত্রী। উদ্দেশ্য, 

Advertisement

মেধাবী পড়ুয়াদের আত্মনির্ভর ভারতের স্বপ্ন দেখানো। কিন্তু অঙ্কে তুখোড় এনআইটির পড়ুয়ারা আবেগের চেয়ে বাস্তবকেই প্রাধান্য দিয়েছেন বেশি। তাই 
আবেগে না ভেসে তুলে ধরেছেন ভারতের প্রকৃত ছবি। মানতে পারেননি সুকান্তবাবু। তাই অধ্যাপক হয়েও ছাত্রদের সঙ্গে শিক্ষকের মতো নয়, করলেন ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র মতো আচরণ!
যেকোনও মন্ত্রীর দায়িত্ব মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়িত করা। সেদিক দিয়ে নরেন্দ্র মোদির ‘আত্মনির্ভর ভারতে’র স্বপ্নকে দেশের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্তবাবু ফেরি করবেন, সেটাই স্বাভাবিক। তারজন্য বেছে নিয়েছিলেন দেশের অন্যতম নামী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ দুর্গাপুর এনআইটিকে। অনেকে বলছেন, সুকান্তবাবুও অঙ্ক কষে এনআইটিতে গিয়েছিলেন। মেধাবী যুবসমাজ কীভাবে নরেন্দ্র মোদির ‘আত্মনির্ভর ভারত’ প্রকল্পের সঙ্গে একাত্ম হয়েছে, সেটা সকলের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তারজন্য হয়েছিল গোটা অনুষ্ঠানের ভিডিও রেকর্ডিং। প্রবেশাধিকার ছিল সাংবাদিকদেরও। তাঁর অঙ্ক নির্ভুল হলেও ভুল হয়েছে অনুমানে। তিনি কল্পনাও করতে পারেননি, সদ্য যৌবনে পা দেওয়া ছাত্ররা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর চোখে চোখ রেখে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসবেন।
কেন্দ্রীয় শিক্ষা রাষ্ট্রমন্ত্রী হয়তো ভেবেছিলেন ‘আপনার পাড়া আপনার সমাধানে’র মতো আত্মনির্ভর ভারত গড়ার ব্যাপারেও ছাত্রছাত্রীরা নানান প্রস্তাব দেবেন। সেই আশাতেই ছাত্রদের কাছে গিয়ে জানতে চাইছিলেন তাঁদের মতামত। কিন্তু, রাজস্থানের যুবক আয়ুষ সেই আশায় জল ঢেলে দিয়েছেন। জানতে চেয়েছেন, যে দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নেই, তাঁরা আবার আত্মনির্ভর হবেন কী করে? এমন কঠিন প্রশ্নের জন্য যে মন্ত্রী প্রস্তুত ছিলেন না, সেটা তাঁর উত্তরেই বোঝা গিয়েছে। বলেছিলেন, তুমিই সমাধান করো। আমি আমার মন্ত্রীর চেয়ারে তোমাকে বসিয়ে দিচ্ছি। সমাধান করতে পারলেই প্রশ্ন করো। মন্ত্রীর ধমক দমাতে পারেনি আয়ুষকে। সুকান্তবাবুর চোখে চোখ রেখে আয়ুষ বলেছিলেন, সমাধান করা তো আপনার কাজ।
এনআইটির ডিরেক্টর অরবিন্দ চৌবে বুঝেছিলেন, আয়ুষকে না থামালে জল অনেক দূর গড়াবে। তাই কেড়ে নিয়েছিলেন মাইক্রোফোন। তাতে মন্ত্রী আরও অপদস্থ হওয়ার হাত থেকে বাঁচলেও ক্ষোভ ছড়িয়েছিল পড়ুয়াদের মধ্যে। সেটা টের পাওয়া গেল পুরস্কার দেওয়ার সময়। সফল প্রতিযোগীদের পুরস্কৃত করার জন্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন মন্ত্রী। ছাত্রদের নাম ডাকা হল। কিন্তু কেউ পুরস্কার নিলেন না। প্রতিবাদটা শিক্ষামন্ত্রীর আচরণের, নাকি মাইক্রোফোন কেড়ে নেওয়ার, তা স্পষ্ট হয়নি। কিন্তু ছাত্ররা যে ক্ষুব্ধ সেটা তাঁরা বুঝিয়ে দিয়েছেন।
যদিও সুকান্তবাবুর দাবি, মৌলিক অধিকার আছে বলেই একজন ছাত্র কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে এইসব প্রশ্ন করতে পারছে। তাঁর দাবি, আয়ুষদের শিখিয়ে পাঠানো হয়েছে। হতে পারে মন্ত্রী ঠিক বলছেন। যাঁরা প্রশ্নবাণে মন্ত্রীকে জর্জরিত করেছেন, হতে পারে তাঁরা বিজেপির রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধী। আবার এটাও হতে পারে, বিজেপির ধাপ্পাবাজি তাঁরা ধরে ফেলেছেন। এর আগে দেওয়া হয়েছিল, আচ্ছে দিনের স্লোগান। কিন্তু ‘আচ্ছে দিন’ কেমন কাটছে, সেটা দেশবাসী হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছে। গ্যারেন্টি দেওয়া হয়েছিল, বছরে দু’কোটি চাকরির। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে ততই বাড়ছে রেল, ব্যাংক সহ কেন্দ্রীয় সরকারি সমস্ত সংস্থায় শূন্যপদের সংখ্যা। বলা হয়েছিল, সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত কালাধন ফিরিয়ে আনা হবে। কিন্তু মোদিজি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ১১ বছর কেটে গেলেও একটি টাকাও ফেরাতে পারেননি। তাই ছাত্রছাত্রীদের ম঩ধ্যে এনিয়ে প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক। ছাত্ররা প্রশ্নও করলেন। কিন্তু উত্তর দিতে গিয়ে মন্ত্রী যেটা করলেন সেটা আর যাই হোক শিক্ষকসুলভ আচরণের মধ্যে পড়ে না। 
সুকান্তবাবু আর পাঁচজন সাধারণ রাজনীতিবিদের মতো নন। রাজনীতির বাইরেও তাঁর একটা বিশেষ পরিচয় আছে। তিনি অধ্যাপক। বঙ্গ বিজেপির শিক্ষিত নেতৃত্বের মধ্যে তাঁর অবস্থান প্রথম সারিতে। সেই কারণেই বঙ্গ রাজনীতিতে তাঁর উত্থান হয়েছে রকেটের গতিতে। ফলে রাজনীতির কারবারিদের সঙ্গে সুকান্তবাবুর একটা মৌলিক পার্থক্য থাকবে, সেটাই কাম্য। সুকান্তবাবুকে বুঝতে হবে, অন্য রাজনীতিবিদরা যে ভাষায় কথা বলেন সেভাষা তাঁর মুখে মানায় না।
অনেকেই বলছেন, এনআইটির পড়ুয়াদের প্রশ্ন সুকান্তবাবুর পছন্দ না হতেই পারে। তিনি কৌশলে এড়িয়ে যেতে পারতেন। তিনি ক্ষমার চোখে দেখতে পারতেন। তাতে একজন অধ্যাপকের গরিমা ও শিক্ষামন্ত্রী পদের মর্যাদা বৃদ্ধি পেত। কিন্তু তা না করে তিনি প্রশ্নকারী ছাত্রকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ভেবে বসলেন। হাঁটলেন পাল্টা আক্রমণের রাস্তায়। জানতে চাইলেন, সমাজের জন্য ওই ছাত্র কী করেছে? পকেট মানি থেকে ৫০ টাকা গরিব মানুষের জন্য খরচ করেছে কি না! শিক্ষামন্ত্রীর পরামর্শ, আগে সমাজের জন্য কাজ করো তারপর প্রশ্ন। 
সুকান্তবাবু, একজন ছাত্রের কর্তব্য পালন কি শুধুই আর্থিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে বিচার হবে? ছাত্র যদি তার অসুস্থ সহপাঠী বা পাড়ার কাউকে হাসপাতালে নিয়ে যায়, সেটা কি কর্তব্য পালনের মধ্যে পড়ে না? কোনও ছাত্র বা ছাত্র সংগঠন রক্তদান শিবির করলে, সেটা কি সামাজিক দায়িত্ব পালন হিসেবে ধরা হবে না? পড়ুয়া যদি দুঃস্থ পরিবারের সন্তানকে বিনা বেতনে পড়ায়, সেটা কি কর্তব্য পালন নয়? বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে গরিব মানুষকে দেওয়াটাই শুধু কর্তব্য? 
দেশের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে সুকান্তবাবুর কাছে এ খবর থাকার কথা, বহু ঠেলাচালক, রিকশচালক, খেতমজুর পরিবারের সন্তান বিভিন্ন সরকারি মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়াশোনা করেন। স্রেফ মেধা আর পরিশ্রমের জোরে। তাঁরা পরিবার থেকে কোনও আর্থিক সাহায্য পান না। পড়াশোনার খরচ নিজেরাই জোগাড় করেন। তাঁদের সামনে লক্ষ্য থাকে একটাই, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারকে আর্থিক সঙ্কট থেকে মুক্তি দেওয়া। ‘পকেট মানি’ শব্দটি তাঁদের কাছে বিলাসিতা। তাই জানতে ইচ্ছা করছে, সমাজসেবা করার মতো বাবার টাকার জোর না থাকলে কি সেই ছাত্র প্রশ্ন করতে পারবে না?
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক নেতা-মন্ত্রীদের প্রশ্ন করার অধিকার সকলের আছে। এখন কেউ সুকান্তবাবুর কাছে জানতে চাইতেই পারেন, মানুষের সেবা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আপনি সাংসদ হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী আপনাকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী করেছেন। দেশের শিক্ষা রাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে আপনি বাংলার শিক্ষার উন্নতির জন্য কী করেছেন? কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে ফান্ড এনে বাংলায় বা বালুরঘাট লোকসভা এলাকায় কতগুলি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করেছেন?
‘পকেট মানি’র একটা টাকা খরচ না করেও আপনাকে এই সব প্রশ্ন করা যায়। কারণ আপনি মানুষের মঙ্গল করবেন, এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে কী করেছেন? কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা বাংলাকে না দিয়ে গরিব মানুষের পেটে লাথি মারার পক্ষে বারবার সওয়াল করেছেন।
রাজনৈতিক নেতারা প্রায়ই বেয়ারা প্রশ্নের সম্মুখীন হন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংগঠনের সভায় গিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। সভায় তাণ্ডব চালানোর পরেও তিনি ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তারপরেও তাঁর গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছিল। গাড়ির বনেটে উঠে চলেছিল নাচানাচি। জখম হয়েছিলেন এক ছাত্র। তারপরেও ব্রাত্যবাবু উষ্মা প্রকাশ না করে বলেছিলেন, ‘জখম ছাত্রের পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে চাই।’ এটাই শিক্ষকসুলভ আচরণ। মানুষ গড়ার কারিগরদের এমনটাই হওয়া উচিত।
সেদিন ব্রাত্য বসু যেটা পেরেছিলেন, সেটা সুকান্ত মজুমদার পারলেন না। তিনি শুধু আয়ুষদের উপরেই চটেননি, রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুকেও আক্রমণ করেছেন অত্যন্ত কদর্ষ ভাষায়। দু’জনই শিক্ষামন্ত্রী। দু’জনই অধ্যাপক। তারপরেও কেন এহেন কুৎসিত আক্রমণ? মন্ত্রিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য, নাকি ভোটের আগে নম্বর বাড়ানোর তাগিদ?
‘মানীর মান করিব হানি/ মানীরে শোভে হেন কাজ?’ লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সুকান্তবাবু, আপনি দেশের মন্ত্রী। তাও আবার শিক্ষামন্ত্রী। অগাধ পাণ্ডিত্য আপনার। তবুও কেন পারলেন না একজন অধ্যাপক হয়ে আর একজন অধ্যাপককে সম্মান দিতে? সম্মান পেতে গেলে দিতে হয় সম্মান। এটাই সনাতনী শিক্ষা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ