হিমাংশু সিংহ: রথ টানলে দুর্গা আসে। বাঙালির জীবনে এটা যেমন চিরাচরিত সত্য, তেমনি চিরন্তন উপলব্ধি— ক্ষমতা পেলেই লখিন্দরের নিশ্ছিদ্র বাসর ঘরেও বিষধর সাপের মতোই দুর্নীতি, গুন্ডাগর্দি, জুলুমবাজির অনুপ্রবেশ ঘটে অনিবার্য রকেট গতিতে। এটা কোভিডের চেয়েও দ্রুত সংক্রামক সামাজিক ব্যাধি। ৪ মে’র পর এই সত্যের আর একদফা আত্মপ্রকাশ ঘটছে ধীরে ধীরে বাংলার মাটিতে। জনতার রায়ে তৃণমূল বিদায় নিয়েছে এখনও একশো দিনও অতিক্রান্ত হয়নি। কিন্তু মারধর, অত্যাচার, টাকার বিনিময়ে সেটিং কি নির্মূল হয়েছে? বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন জুলুম বন্ধ হয়েছে সমগ্র গ্রামবাংলায়? অ্যাম্বুলেন্সে চেপে প্রহৃত বিজেপি নেতা সল্টলেকে দলের সদর দপ্তরে রাজ্য নেতৃত্বের দরবারে। কী ব্যাপার? গুরুতর জখম দলেরই এসসি মোর্চার নেতা অমরজিৎ কুমার রবিদাসের অভিযোগ, তাঁকে বেদম মেরেছে বিরোধীদের কেউ নন, বন্দর এলাকার বিজেপি প্রার্থী স্বয়ং। মাঝেরহাটের অদূরে পোর্টল্যান্ড পার্কের ঘটনা। রক্তাক্ত অবস্থায় পাঁচদিন নার্সিংহোমে কাটিয়ে সটান অভিযোগ জানাতে সল্টলেকের অফিসে ছুটে গিয়েছেন অমরজিৎ। ভোটের আগে রাজ্যে গেরুয়া শাসন কায়েমে সকাল সন্ধ্যা এক করে খেটেছিলেন তফসিলি মোর্চার ওই নেতাও। প্রতিদানে এখন মার খেতে হচ্ছে নিজের দলের নেতার হাতেই! সদর দপ্তরে নালিশ জানানোর পর কেটে গিয়েছে অনেকটা সময়, এখনও ওই গেরুয়া নেতা ‘গুন্ডাদমন’ আইনে সুবিচার পেয়েছেন বলে জানা নেই! অভিযুক্তের শাস্তি নিয়েও কোনো উচ্চবাচ্য নেই নেতৃত্বের মুখে। সবার মুখে কুলুপ!
গত বৃহস্পতিবারের ঘটনা। জনতার দরবারে বসেছেন মহামান্য মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সামনে হাজির যাদবপুরের বাসিন্দা ৫৬ বছরের প্রৌঢ়া প্রতিমা রায়। ধারাবাহিকভাবে এই দরবারে তৃণমূল শাসনে মানুষ কতভাবে নিপীড়িত, অত্যাচারিত ও লুণ্ঠিত হয়েছে তারই অভিযোগ আসে ঝড়ের গতিতে। সহৃদয় মুখ্যমন্ত্রী কাগজপত্র খতিয়ে দেখে সুবিচারের আশ্বাস দেন। কিন্তু এবার সব শুনে চক্ষুচড়কগাছ উপস্থিত সবার! সন্তোষপুরের মহিলার অভিযোগ, বিজেপির মদতে তাঁর দোকানঘরটি দখল হয়ে গিয়েছে। ঘটনাটা ৪ মে দুপুর ১২টার পরের। আরও অভিযোগ, পিছনে নাকি স্বয়ং এলাকার বিধায়ক। আশ্চর্যের বিষয়, বিধায়ক দোকানটা দখল করে তৃণমূলেরই কিছু লোকের হাতে তুলে দিয়েছেন! বাহ্-রে সেটিং! মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, তিনি দ্রুত এর বিহিত করবেন।
এরকমই হাজারো ঘটনা প্রতিনিয়ত কানে আসছে সামান্য আড়াই মাসের শাসনেই। বছর ঘুরলে ঝাঁপি যে পূর্ণ হবে বেশ বোঝা যাচ্ছে। ভোটকে, নির্বাচনের ফলাফলকে তাৎপর্যহীন করে নরকগুলজার চলছে বরানগর থেকে বালুরঘাট। কান পাতলেই কোথাও টাকার বিনিময়ে, কোথাও আবার অন্য শর্তে সেটিংয়ের ফিসফাস শোনা যাচ্ছে জেলায় জেলায়। মানতেই হবে, স্তিমিত হয়ে আসছে ডিম থেরাপি! বরানগরে শোনা যাচ্ছে, বিজেপির নীচুতলার কর্মীদের হাহুতাশ। কী ভেবেছিলাম আর কী হল! উত্তর শহরতলির এই মহল্লায় গুন্ডারা নাকি গেরুয়া নেতাদের সঙ্গে সেটিং করে দিব্যি বুক ফুলিয়ে ঘুরছে। কোণঠাসা আদি বিজেপি। কোথাও কিছু বন্ধ হয়নি, সবাই খোশমেজাজে দিব্যি আছেন। পুজোতেও সেটিংয়ের গন্ধ ম ম করছে সর্বত্র। এমনকি নেতার সঙ্গে পুরীতে উলটোরথে একাধিক অভিযুক্তের ঘুরতে যাওয়ার ছবিও ভাইরাল।
বালুরঘাটের কিস্সা আরও মারাত্মক। ভোটের প্রচারে সুকান্তবাবুরা যাঁকে পাচারকারীদের মাথা বলে দাগিয়ে দিয়েছিলেন, হিসাব বুঝে নেওয়ার হুংকার দিয়েছিলেন, তিনিই এখন বিদগ্ধ ‘ভালো’ তৃণমূল সেজে দলবদলে রাজ্যসভার সম্মাননীয় সদস্য! কাউকে নেব না, বারংবার খিল তুলে দিয়ে দরজা এঁটে বসে থাকা গেরুয়া নেতানেত্রীদের একেবারে পাশের আসনে স্বমহিমায়। এখন আর ছুঁয়ে দিলে জাত যাবে না, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও কেউ করবে না। কিংবা উত্তর কলকাতার অপ্রতিরোধ্য সেই পরচুলা সজ্জিত জোড়াফুল নেতা যিনি ভোটের পর দিল্লি গিয়ে সেটিংয়ে যতটা ব্যস্ত, ভোটের প্রচারে ততটা সময় দেননি। কী সরকার, কী বিরোধী সবারই আসলে ভোটের আগে এক রূপ আর ভোট মিটলেই ভিন্ন রূপ। তখন দরকার ছিল ক্ষমতা। আর আজ সংখ্যা। লোকসভা ও বিধানসভা দু’জায়গাতেই। সাধারণ মানুষ এসব মেলাতে পারেন না। তাই আটপৌরে পোড়ো বাড়ির দরজাটার ভেঙে পড়ার মতোই হারিয়ে যায় সাধারণ মানুষের তিলে তিলে গড়া বিশ্বাস। এটাই এই মুহূর্তে রাজনীতির পুতুলনাচের শুরু ও শেষ কথা!
বাংলার নতুন সরকারের তিনমাস পূর্ণ হতে আর একসপ্তাহ বাকি। প্রত্যাশা অনেক। কথা ছিল সমাজের শুদ্ধিকরণের, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উন্নয়নের। রাজনীতি থেকে দুর্নীতি দূর করার। নতুন বাংলা গড়ার। অমিত শাহের ভাষায় ‘সুনার বাংলা’। সেইসঙ্গে দুর্নীতির মদতদাতাদের উলটো করে ঝোলানোর। কিন্তু কী দেখলাম? যে প্রতিপক্ষকে নজিরবিহীন আক্রমণ করে গদি দখল, তাদের দল থেকেই এমপি-এমএলএ ভাঙিয়ে শাসক ও বিরোধীর মধ্যেকার বিভেদরেখাকেই ঘুচিয়ে দেওয়ার অতি নিম্নমানের কুনাট্য মঞ্চস্থ হল সগৌরবে। মানুষের রায়ে প্রত্যাখ্যাত তৃণমূলের ২৮ জন এমপির মধ্যে সিংহভাগই (প্রায় কুড়িজন!) ঘুরিয়ে বিজেপির আশ্রয়ে। এনডিএর মিটিংয়েও অংশ নিয়েছেন মুর্শিদাবাদের তিনজন বাদে সবাই। অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ এমপিকে ভালো সার্টিফিকেট দিয়েই দিয়েছে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সেই সার্টিফিকেটে ভর করেই তাঁরা ভুঁইফোঁড় এনসিপিআই ও বিজেপির মধ্যবর্তী এক বায়বীয় অবস্থানে ঝুলছেন। তাঁদের অলিখিত নেতা এখন আর কেউ নন, বিজেপির প্রথম সারির নেতা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব স্বয়ং। এ তো গেল এমপিদের কথা। এবারের গেরুয়া ঝড়েও যে ৮০ জন বিধায়ক জোড়াফুলের প্রতীকে জিতেছেন তাঁদের মধ্যে প্রায় ৬২ জন নতুন ছাতার তলায় নিজেদের সুরক্ষিত করেছেন। কেউ ডিম মারবে না। জেলের ভাত খেতে হবে না। নির্বাচিত ৮০ জনের মধ্যে ৬২, শতাংশের হিসাবে প্রায় ৭৭ শতাংশ এই পথের পথিক। বিজেপি নেতারা যে গলার শিরা ফুলিয়ে ভোটের আগে মাঠে ময়দানে সভা সমিতিতে ক্রমাগত বলে গিয়েছেন, গোটা তৃণমূলটাই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত পাঁকে ভরা। ভোটের পর তার কী হল? যদি আজকের রাজনৈতিক অবস্থানই সত্য হয় তাহলে চার-পাঁচ জন ছাড়া গোটা দলটাই তো ভালো ছিল! এই অবস্থানটাই বড্ড গোলমেলে!
ভোটের আগে বিজেপির যে অংশটা নেতাদের পিছন পিছন অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিল, প্রাণ হাতে করে খেটেছে তাদের হতাশ করছে এই ধন্দটাই। এরকম চললে আরও কয়েক মাস পরে পুরভোটেও তৃণমূলের নিঃশব্দ অনুপ্রবেশ গেরুয়া দলের আদিরা মেনে নিতে তৈরি আছেন তো?
নিজেকে নিরাপদ রাখা, রোজগার ঠিক রাখা কোনো অন্যায় নয়। কিন্তু যাঁরা হিসাব বুঝে নেওয়ার হুংকার দিয়েছিলেন, তাঁরাই যদি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেটিং আহ্লাদে আত্মহারা হয়ে যান, তাহলে মানুষের বিশ্বাসভঙ্গ হতে বাধ্য। দুদিন আগে আর দুদিন পরে!
গত আড়াই মাসে এরাজ্যে পেটে লাথি পড়েছে শুধু গরিব হকারের! তাহলে ভোটের আগে মন্ত্রীসান্ত্রি থেকে রাজ্যের নেতারা যে হিসাব বুঝে নেওয়ার হুমকি দিতেন তা শুধু গরিব হকারদের উদ্দেশেই। গত আড়াই মাসে প্রান্তিক হকাররা ছাড়া আর্থিকভাবে আর কেউ সেভাবে সংগঠিত রাজরোষের শিকার হননি। দমদম, হাওড়া, ব্যান্ডেল, শিয়ালদহ সহ সর্বত্র দীর্ঘদিনের দোকান হারিয়ে তাঁরা আজ পথে বসেছেন। ওই দু’ফুট বাই এক ফুটেই যে প্রান্তিক মানুষের যন্ত্রণার আমৃত্যু যাপন!
বলুন তো গত আড়াই মাসে পশ্চিমবঙ্গে একটিও তোলাবাজির ঘটনা ঘটেনি! গুন্ডাগর্দি, ভয় দেখানো, সম্পত্তি লুট, দোকান দখল, সবই তো চলছে আগের মতোই। শুধু রং বদলেছে, ঢং পালটেছে, রেট কমেছে-বেড়েছে। পেটে লাথি পড়েছে হকারের! সেটিংয়ে অভ্যস্ত দিনে দুশো বার বাজারে-হাটে বিক্রি হওয়া নেতানেত্রীদের গায়ে হাত দেয় সাধ্য কার? হকাররা তো আর বিল পাশ করাতে পারবে না, সংসদে বিল পাশের মহাযজ্ঞে দুই তৃতীয়াংশের শক্তিও জোগাবে না শাসককে! সেই কারণেই ভোটের আগে যাকে ফিনিশ করার ডাক, ভোট মিটলেই সে নয়নের মণি! এই দু’মুখো নীতি কতদিন চলবে?
প্রকল্পের নাম বদলাচ্ছে। শর্ত সংযোজন হচ্ছে। ২০১৩ সালে চালু হওয়া জনপ্রিয় ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পের নাম বদলে এবার থেকে রাখা হচ্ছে ‘কন্যারত্ন।’ পাশাপাশি, স্কুল ছাত্রছাত্রীদের সাইকেল বিতরণের বহুল প্রচলিত ‘সবুজ সাথী’ প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে রাখা হচ্ছে ‘সারথি।’ নাম বদলে মানুষের কী এল গেল। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের নাম বদলে অন্নপূর্ণা যোজনা হয়েছে। কিছু মানুষ দ্বিগুণ পেলেও উপভোক্তার সংখ্যা কিন্তু অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। স্বাস্থ্যসাথী বদলে গিয়েছে আয়ুষ্মানে। কিন্তু সবাই পাবে না। কিন্তু নাম আর রং বদলের এই কিস্সায় মানুষের কী বা আসে যায়! সেটিং আর দল ভাঙাভাঙির এই উৎসবে বদলায় না কিছুই। শুধুই থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়, আবার থোড় বড়ি খাড়া। বাকিটা প্রচারের ঢক্কানিনাদ আর ফানুস!
মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ, শিল্প আসুক। উন্নয়ন হোক। বিনিয়োগ স্বাগত। কিন্তু এরাজ্যের জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ যে সম্প্রদায় দখল করে আছে, তাদের দয়া করে ‘শুক্রবারিয়া’ বলে সম্বোধন করবেন না। শুক্রবার তো সন্তোষী মায়ের ব্রতপালনও হয়। আমার মা লক্ষ্মীপুজো করতেন। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে আপনার ওই উক্তি ধর্মনিরপেক্ষ বাংলার পক্ষে কতটা গৌরবের আর কতটা অগৌরবের, তা আপনি নিজেই বিচার করে দেখুন। গুন্ডা দমন যেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের তুরুপের তাস না হয়! বাংলার মানুষ কিন্তু আপনাকে দেখছে।