Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সন্তানের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে কেন?

ন্যাশনাল ‌ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোসায়েন্স (নিমহানস) একটি সমীক্ষা করে জানতে পেরেছে, জেন জি (১৯৯৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে যাদের জন্ম) সবথেকে বেশি দুটি আতঙ্কে ভুগছে।

সন্তানের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে কেন?
  • ১০ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: ন্যাশনাল ‌ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোসায়েন্স (নিমহানস) একটি সমীক্ষা করে জানতে পেরেছে, জেন জি (১৯৯৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে যাদের জন্ম) সবথেকে বেশি দুটি আতঙ্কে ভুগছে। ১) খুব দ্রুত তারা বন্ধু হারাচ্ছে ২) পিতামাতার সঙ্গে তাদের মানসিক সংযোগের দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। একদিকে নিজেদের পেশাগত এবং ব্যক্তিগত সমস্যার কথা পূর্ণাঙ্গভাবে শেয়ার করার মতো বিশ্বাসযোগ্য বন্ধুর অভাব ঘটছে। অর্থাৎ যে বন্ধু অন্য কাউকে এই গোপন কথাটি ফাঁস করবে না। যারা কিছু একটা ভালো পরামর্শ কিংবা বুদ্ধি দেবে যে, কীভাবে সমাধানসূত্র পাওয়া যায়। আবার সেই একই সমস্যার কথা পিতামাতাকে তারা বলছে না সমস্যার সমাধান চেয়ে।  কারণ, এই জেনারেশন সবথেকে বেশি যে কথাটি মনে মনে ভাবছে সেটি হল, আমাদের কথা বাবা মা ঠিক বুঝবে না। তাই বললে অযথা টেনশন করবে। কিন্তু সত্যিকারের সমস্যাটি যে কী, সেটা অনুধাবন করতে পারবে না। ঠিক এই কারণে জেন জি-র মধ্যে দেখা যাচ্ছে একাকিত্ব বোধ বেড়ে চলেছে। যা বৃদ্ধ ও সিনিয়র সিটিজেনদের মধ্যেই মহামারী আকার নেওয়ার কথা, সেটা এখন ক্রমেই প্রবল আকার ধারণ করেছে নতুন প্রজন্মের মধ্যে। আর তারই ফলশ্রুতি হল, খুব সূক্ষ্মভাবে একটি ইতিবাচক প্রবণতা শুরু হয়েছে। সে‌ই প্রবণতা শুধু যে নিমহানস সমীক্ষায় উঠে আসছে, তাই নয়, আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা সমীক্ষক সংস্থা পিউ একটি পৃথক সমীক্ষায় সেই একই কথা জানতে পারছে।

Advertisement

এই নয়া প্রবণতা হল, নতুন প্রজন্ম মোবাইলের বন্দিত্ব ছেড়ে হঠাৎ ধীর লয়ে দল বেঁধে পরস্পরের সঙ্গে দেখা করা, আউটিং, শপিং, পারফরম্যান্স দেখতে যাওয়া অডিটোরিয়ামে, সিনেমায় যাওয়া, ডিনার, ডেটিং এবং ট্র্যাভেল করার মতো একটি আগ্রহের মধ্যে প্রবেশ করার ইঙ্গিত দেখাচ্ছে। বুক মাই শো সংস্থা জানাচ্ছে, এক বছরের মধ্যে তাদের লাইভ কনসার্ট কিংবা পারফরম্যান্স বেড়ে গিয়েছে ১৮ শতাংশ। এবং এইসব অনুষ্ঠানে একা একা শো দেখতে আসা নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়ের সংখ্যা বিপুলভাবে বাড়ছে। একদিকে একাকিত্ব সমস্যা, যেটি নেতিবাচক। কিন্তু ইতিবাচক যে দিকটা মনস্তত্ত্ববিদরা দেখছেন এই প্রবণতায়, সেটি হল, সারাক্ষণ মোবাইলে মুখ ডুবে বসে থাকার চেনা দৃশ্য কমছে। কারণটি অবশ্য উদ্বেগজনক। পিউ (pew) সমীক্ষা অনুযায়ী, মোবাইলে এরা যত বেশি থাকছে, ততই টেনশন, একাকিত্ব এবং ডিপ্রেশন বেড়ে চলেছে। কারণ কী? কারণ হল, অন্যদের আনন্দ করতে দেখা যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়, ভ্রমণ করতে, পার্টি করতে, হ্যাং আউট এবং ডেটিং করার অন্তহীন ছবি আসছে। 
অথচ আমি সেটা করতে পারছি না। অথবা আমাকে বাদ দিয়ে আমার বন্ধুরা কয়েকজন কোনও একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছে অথবা বেড়াতে বেরিয়েছে। অর্থাৎ আমি অবহেলিত এবং উপেক্ষার শিকার। এই মনোভাব গ্রাস করছে। তাই সমীক্ষায় বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিকভাবে মোবাইল ডিটক্সিকেশন শুরু হয়েছে অত্যন্ত মৃদুভাবে। অর্থাৎ কমছে স্ক্রিন টাইম। সিনেমা, ওটিটি সিরিজ দেখা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রিন টাইম কমছে। মাত্র সাতজন মেয়ে তৈরি করেছিল সিটি গার্লস ওয়াক। অর্থাৎ শহরের দর্শনীয় স্থান ঘুরে ঘুরে দেখা দল বেঁধে। দিল্লির এই গ্রুপ এখন পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে। হিউম্যান লাইব্রেরির প্রবণতা বেড়ে চলেছে। অর্থাৎ আমার কথা শোনার কেউ নেই, এই নেতিবাচক মনোভাব এবং ডিপ্রেশন থেকে বেরিয়ে আসতে সকলে একসঙ্গে মিলে নিজেদের 
গল্প শুনছে। অর্থাৎ কারও বুকে জমে থাকা নিজের জীবনের গল্প কারও সঙ্গে শেয়ার করা। অন্যরা মন দিয়ে সেই কাহিনি শুনছে। এই হিউম্যান লাইব্রেরি প্রতিটি মেট্রো শহরেই ক্রমবর্ধমান। নিমহানস সমীক্ষায় জানা যাচ্ছে, জেন জি-র মধ্যে  সবথেকে বেশি 
যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় অতিবাহিত করছে, তাদের মধ্যে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে উদ্বেগ। সারাক্ষণ তারা কোনও না কোনও টেনশনে আক্রান্ত। কেউ একজন তাকে ভুল বুঝল, কেউ একজন তাকে অপমান করল, কেউ একজন অথবা অনেকে মিলে তাকেই টার্গেট করছে এবং আমি সকলের সঙ্গে সমানভাবে আধুনিকতায় তাল মেলাতে পারছি না, এই উদ্বেগ প্রবলভাবে গ্রাস করছে। যাকে পরিভাষায় বলা হচ্ছে, পারফরম্যান্স অ্যাংজাইটি। আর অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার করা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকায় নতুন একটি মস্তিষ্কের অস্থিরতা দানা বেঁধেছে। যাকে বলা হচ্ছে হাইপার ভিজিলেন্স। অর্থাৎ প্রতিনিয়ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর মস্তিষ্ক ব্যস্ত থাকছে নোটিফিকেশন দেখতে। 
এইমাত্র ঩যে নোটিফিকেশন দেখাচ্ছে, সেটি কি লাইক, নাকি কমেন্ট? কোনও নতুন তথ্য অথবা কেউ ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট কিংবা ফলো রিকোয়েস্ট পাঠাল? আমার ভিডিওর ক’টা ভিউজ হল? যখন পেশাগত কাজ থাকে না, যখন পূর্ণ অবকাশ, তখন মস্তিষ্ক বিশ্রাম পাওয়ার কথা অতিরিক্ত কাজ করার থেকে। এক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে না। তাই মস্তিষ্ক অস্থির হয়ে থাকছে সর্বদাই। আর এই কারণেই নতুন প্রজন্মের মধ্যে এবং মধ্যবয়সির মধ্যেও প্রবলভাবে বেড়ে চলেছে বিরক্ত হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, আজ থেকে ২০ বছর আগেও মানুষ এত বেশি বিরক্ত এবং অসহিষ্ণু হয়নি। এখন বহুগুণ বেড়েছে এই দুই সঙ্কট।
ঠিক এরকমই এক আবহে বিস্ময়কর একটি প্রবণতা দেখা গিয়েছে। হেল্প এজ ইন্ডিয়ার সমীক্ষায় বলা হচ্ছে, জেন জি প্রজন্ম পিতামাতার তুলনায় অনেক বেশি মনের দিক থেকে খোলামেলা হয়ে কথা বলে, কমিউনিকেট করে দাদু, দিদা, ঠাকুমা, ঠাকুরদাদের সঙ্গে। যে পরিবারগুলিতে সকলে একসঙ্গেই থাকে, সেখানে দেখা যায় এই নতুন প্রজন্ম একটি ইমোশনাল বন্ডিং তৈরি করে পরিবারের সিনিয়র সিটিজেনদের সঙ্গে। অর্থাৎ পিতামাতার তুলনায় তাদের ক্রমেই একটি বিশেষ শর্ত ও স্বার্থহীন, দ্বিধাহীন সম্পর্ক স্থাপিত হয় বয়স্ক সদস্যদের সঙ্গে। প্রসঙ্গত ভারতে এখন সবথেকে বেশি সংখ্যায় দুই প্রজন্ম। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি এবং ৬০ থেকে ৮০ বছর বয়সি। অর্থাৎ যাদের পরস্পরের সঙ্গে কোনওরকম চিন্তাভাবনা অথবা টেকনোলজি জ্ঞানে সাদৃশ্যই নেই, তারাই সবথেকে বেশি কাছাকাছি আসছে মনের দিক থেকে।
২০১০ সালের পর যাদের জন্ম, সেই আলফা প্রজন্মের মধ্যে মানসিক গঠনের জটিলতা আরও বেড়ে যাচ্ছে। বহু শহর ও আধুনিক সমাজ তাদের  অবকাশ সময় কাটানোর মতো কোনও ব্যবস্থাই উপহার দিতে পারছে না।  পার্ক নেই, বন্ধু নেই, মা বাবা চাকরি করতে গিয়েছে। এই সমস্যা আগেও ছিল। কিন্তু এখন যেটা হয়েছে, ক্রমেই পাড়া সংস্কৃতি, দল বেঁধে পাড়ার মাঠ বা পার্কে খেলতে যাওয়া ইত্যাদি আর নেই। অতএব স্কুল এবং বাড়ি, দুটোর মধ্যে বন্দিজীবন। সবথেকে বড় যে মানসিক প্রবণতা দেখা দিয়েছে আলফা প্রজন্মের কাছে, সেটি হল মোবাইল নিয়ে সারাক্ষণ থাকা যে কেন অন্যায় অথবা অনুচিত, এটা তারা মন থেকে অনুধাবন করতে পারছে না। অর্থাৎ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, যেহেতু এই প্রজন্ম বালক বয়স থেকে ডিজিটাল জগতেই বড় হয়েছে, তাই হঠাৎ করে তাকে যখন বলা হচ্ছে মোবাইল ছেড়ে এটা করো, ওটা করো, সে মানসকিভাবে সেই নির্দেশ বা উপদেশের কার্যকারণ ধরতে পারছে না। তাই বিরোধ বাড়ছে পিতামাতার সঙ্গে। পিউ আন্তর্জাতিক সংস্থা সেই কারণেই সর্বশেষ যে সমীক্ষা করেছে সেখানে জানতে পেরেছে, বর্তমানে পিতামাতাদের কাছে সবথেকে বড় সঙ্কট হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে মোবাইল ম্যানেজমেন্ট! অর্থাৎ পিতামাতারা সম্পূর্ণ দিশাহারা যে, সন্তানদের তারা ঠিক কীভাবে বলবেন মোবাইল ব্যবহারের পদ্ধতি নিয়ে। তারা নিজেরাই জানে না! ৪৮ শতাংশ পিতামাতাই সমীক্ষায় বলেছে, তাদের সবথেকে বেশি উদ্বেগ হল, সন্তানের মনের গতিপ্রকৃতির হদিশ পাচ্ছে না তারা! অর্থাৎ সন্তান টিন এজ হলে একসময় ধীরে ধীরে তারা অচেনা হয়ে যেত। দুর্বিনীত হতো। অবাধ্য হতো। কিন্তু হঠাৎ সেই বয়ঃসীমা আরও কমে গিয়েছে। এখন বাল্য ও কৈশোরে পা দেওয়া সন্তানদেরও মনের সন্ধান পাচ্ছে না পিতামাতা! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ