Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নরেন্দ্র মোদির হঠাৎ এত তাড়া কীসের?

পুজো উপহার না ভোটের টোপ? ভক্তকুলের ন্যারেটিভ মেনে নরেন্দ্র মোদির দিওয়ালির ‘সওগাত’ও বলতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী মুখে বলেছেন, জিএসটি কমিয়ে বড় প্রতিশ্রুতি পূরণ সম্ভব হল।

নরেন্দ্র মোদির হঠাৎ এত তাড়া কীসের?
  • ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: পুজো উপহার না ভোটের টোপ? ভক্তকুলের ন্যারেটিভ মেনে নরেন্দ্র মোদির দিওয়ালির ‘সওগাত’ও বলতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী মুখে বলেছেন, জিএসটি কমিয়ে বড় প্রতিশ্রুতি পূরণ সম্ভব হল। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, বিগত আট বছরে কি পুজো আসেনি, না উৎসবের রোশনাই এই প্রথমবার ছেয়ে গিয়েছে দেশের আনাচেকানাচে? তাহলে হঠাৎ এই তাড়া কেন? ছোট ও মাঝারি শিল্পের কোমর ভাঙা জিএসটি জটিলতা কাটানোর দাবি তো নতুন নয়! কর কাঠামো সরল করার সঙ্গে এর জেরে রাজ্যগুলির ক্ষতিপূরণ মেটানোর চাহিদাও দীর্ঘদিনের। সরকার ‘হবে-হচ্ছে’ করেও পাত্তা দিচ্ছিল না। জটিলতা জিইয়ে রেখে সরকারের কোষাগার ভরার লুট চোখ এড়ায়নি দেশবাসীর। বিশেষ করে কোভিড পরবর্তী বিগত তিন চার বছর ধরে। কাউন্সিলের একের পর এক বৈঠকে এসব নিয়ে কাটাছেঁড়াও কম হয়নি। কোভিডের সময় থেকেই যুক্তিতে অযুক্তিতে, তর্কের মৌতাতে রাত ক্রমশ গভীর হয়েছে, নানা বাহানায় সরকার কিন্তু কিছুতেই পিছপা হয়নি। জিনিসের দাম চড়েছে পাল্লা দিয়ে, কেনাবেচা কমায় সাধারণের হাত থেকে কাজও চলে গিয়েছে তিলতিল করে। তাহলে এখন কী এমন ঘটল যে এই সময়টাকেই বেছে নেওয়া হল জিএসটি কাঠামোর আমূল বদল ঘটিয়ে সাধারণকে কেনাকাটায় উদ্বুদ্ধ করার মাহেন্দ্রক্ষণ হিসেবে! কোন বাধ্যবাধকতা ও তাগিদ থেকে এতবড় সিদ্ধান্ত, প্রশ্ন তো উঠবেই। কেন লালকেল্লায় স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ঘোষণার পর আর তর সইল না। দু’সপ্তাহ যেতে না যেতেই জিএসটি কাউন্সিল গুরুত্বপূর্ণ ছাড়ের ঘোষণা করে মধ্যবিত্তের মন জয়ের মরিয়া চেষ্টায় ব্রতী হতে হল মহতী সরকারকে?

Advertisement

নরেন্দ্র মোদি কীসের ভয় পাচ্ছেন? ট্রাম্পের শুল্ক গুঁতো, আম জনতার জীবনে মূল্যবৃদ্ধির অভিশাপ, চাকরি দিতে না পারার ব্যর্থতা, নাকি বিজেপি সরকারের ভাবমূর্তির আচমকা ক্ষয়? নাকি পঁচাত্তর বছর ছুঁয়ে ক্ষমতায় থাকলেও মনে সর্বদাই সময় ফুরিয়ে যাওয়ার বিপন্নতা! যতই গালভরা সুসময়ের স্বপ্ন বোনা চলুক, একান্তে সবাই একমত অর্থনীতির গতিকে গ্রাস করছে মন্দা! টাকা ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। শেয়ার বাজার টালমাটাল। রপ্তানি বাণিজ্য এই হারে মার খেলে বহু সংস্থা ঝাঁপ গোটাতে বাধ্য হবে। নতুন করে বেকার তৈরি হবে দেশে। চামড়া, অলঙ্কার ও বস্ত্র শিল্পে এখনও স্বল্পশিক্ষিত কয়েক কোটি মানুষ কাজ করে। বিশেষ করে পূর্বভারতের পরিযায়ীরা। সেই সূত্রেই বিহার থেকে ভোট ঘোষণার আগেই কোনও খারাপ খবর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, নাকি বেচারা রাহুল গান্ধীর ভোট অধিকার যাত্রায় মানুষের ঢল দেখে মাথা ঘুরে গিয়েছে? বিহারে এনডিএ শরিকদের দাবি মেটাতে এমনিতেই অমিত শাহরা হিমশিম। দফায় দফায় বৈঠকের পরও আসন বণ্টন থমকে। এর উপর বাংলার আসন্ন নির্বাচনে বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা তাড়া করছে। হালে অল্প সময়ের ব্যবধানে তিন তিনবার বাংলায় এসে অনেক ঢাক পিটিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। তোপও দেগেছেন তারস্বরে। কিন্তু একটা ভাত টিপতেই আক্কেল গুড়ুম! তাঁর মঞ্চে শুধুই দলবদলুদের রমরমা। পুরনোরা সব গেল কোথায়? তামিলনাড়ু ও কেরলেও বিরাট পরাজয়ের হাতছানি। তামিলভূমে ডিএমকের বিরুদ্ধে এবারও জোট করে লড়ার আশা ক্ষীণ অমিত শাহদের। ভোটের এই চোরাবালিতে গেরুয়া আহ্লাদ কখনও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে? অসম ছাড়া এককভাবে ভোটমুখী ৬ রাজ্যে গেরুয়া সম্ভাবনা আর কোথায়? বারবার গিয়েও দূরবিন দিয়েও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না দক্ষিণে। সাধারণ মানুষের ভ্রম হচ্ছে বিদেশ নীতির ডিগবাজি দেখেও। আমেরিকার কোল থেকে রাশিয়ার কাঁধে বিদেশ নীতির অবিশ্বাস্য লাফ এবং কমিউনিস্ট চীনের সঙ্গে এসসিও বৈঠকে অন্তরঙ্গ মুহূর্তও বড্ড মনোগ্রাহী, কিন্তু ডিগবাজি আর নাটক দিয়ে তো দেশ চলে না! হাওয়া বদলের এই মরশুমে মোদি রাষ্ট্রসঙ্ঘের আসন্ন অধিবেশনে বক্তৃতা দিতে যাওয়ার পরিকল্পনাও বাতিল করেছেন। ট্রাম্পের সঙ্গে মোলাকাতে রাজি নন বলে এ মাসের শেষে দেশের হয়ে যাচ্ছেন শুধু বিদেশমন্ত্রী। কিন্তু একদা উদ্বাহু হয়ে এখন আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ককে ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’-এ নিয়ে যাওয়াও কি খুব বুদ্ধিমানের কাজ?
জিএসটি বৈঠকেও সেই ডিগবাজিরই রিপ্লে। এতদিন কর হ্রাসের বিরোধিতা করে হঠাৎ ভোলবদল। কমাতে হবে এবং এখনই, যেন ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে! পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশে কোনও অবস্থাতেই জিএসটি হ্রাসের বিরোধিতা করা কোনও রাজ্যের অর্থমন্ত্রীর পক্ষে সম্ভব নয়। বিরাট ক্ষতি জেনেও তা কেউ করেনওনি। এমনই এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে নীতিগতভাবে রাজ্যগুলি রাজি হলেও অস্বীকার করার উপায় নেই চরম অস্বস্তিতে ফেলেই এই কাজটা করা হল। ‘সিঙ্গল ইঞ্জিন’ আট রাজ্য আলাদা করে বৈঠক করে তাদের সেই আশঙ্কার কথা জানিয়েও দিয়েছে। মোদিজি বলেছিলেন দিওয়ালিতে কার্যকর হবে, বাস্তবে তার এক মাস আগেই নবরাত্রি শুরুর দিন থেকেই কার্যকর হয়ে গেল। বুধবার ৫৬তম জিএসটি কাউন্সিলের বৈঠকে শেষে ঐকমত্যের ভিত্তিতেই যাবতীয় প্রস্তাব পাশ হয়ে যায়। জিএসটি হ্রাসের ধাক্কায় কেন্দ্রীয় সরকারের লোকসান যেখানে ৯৩ হাজার কোটি টাকা, সেখানে পশ্চিমবঙ্গের রাজস্ব ক্ষতি ১০ হাজার কোটি ও কর্ণাটকের ১৫ হাজার কোটি টাকা। অপেক্ষাকৃত ছোট রাজ্য ঝাড়খণ্ড, সেখানকার অর্থমন্ত্রীও বললেন তাদের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ হাজার কোটি। রাজ্যগুলির এই ক্ষতি মেটাবে কে? কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ক্ষতিপূরণের হাজারো পথ আছে। যেমন ইতিমধ্যেই সফ্ট কার্বোনেটেড ড্রিংকস, গুটখা, সিগারেটের উপর ৪০ শতাংশ কর বসিয়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তি আয়ের পথ খোলা হচ্ছে। অন্যান্য বিকল্পও খুঁজে দেখা চলছে যাতে বাকি ৪৮ হাজার কোটি টাকাও তোলা যায়। কিন্তু রাজ্যগুলি কী করবে? তাদের রাজস্ব আদায়ের পথ তো সীমিত। পেট্রল-ডিজেলে সেস বসালে উল্টো চাপের মুখোমুখি হতে হবে। এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার যদি ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা না করে রাজ্যে রাজ্যে উন্নয়ন বন্ধ হতে বাধ্য। এমনিতেই কেন্দ্রের একতরফা সিদ্ধান্তে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে। গত তিন বছর ১০০ দিনের কাজ ও আবাসের টাকাও পায়নি বাংলা। তার উপর জিএসটি কমায় দশ হাজার কোটি টাকার বাড়তি রাজস্ব ক্ষতি নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা। কেন্দ্র এই রাজস্ব ক্ষতি পূরণ না করলে শুধু বাংলাই নয় গোটা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোই দুর্বল হতে বাধ্য। অবশ্য খুব সমস্যায় না  পড়লে মোদিজি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ধার যে ধারেন না তা কারও অজানা নয়। চাপে পড়ে ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ ট্যারিফের গুঁতো সামলাতে রপ্তানিকারকদের জন্য শীঘ্রই প্যাকেজ ঘোষণা করার কথা জানিয়েছে সরকার। রপ্তানিকারকরা প্যাকেজ পেলে জিএসটি হ্রাসের দরুন ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্য ‘রিলিফ’ পাবে না কেন? কোন যুক্তিতে বাংলা সহ বিরোধী রাজ্যের দাবি অস্বীকার করবে নির্মলা সীতারামনের অর্থমন্ত্রক।
এখন অর্থনীতির বাজারকে মন্দা গ্রাস করায় এবং আমেরিকার চাপানো ৫০ শতাংশ শুল্কের ত্র্যহস্পর্শ থেকে দেশীয় বাজারকে বাঁচানোর তাগিদেই জিএসটি কমাতে কার্যত বাধ্য হল বিজেপি সরকার। দেড় দশক টানা ক্ষমতায় থাকার ধাক্কায় মোদিজি নিজেও বুঝতে পারছেন গদি মিডিয়ার তারস্বরে ড্রাম আর তালি বাজানো সত্ত্বেও জনসমর্থন কিন্তু গোঁত্তা খাচ্ছে। এক দশক আগের সেই পরিস্থিতি আর নেই। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা যে ভোটবাক্সে সিঁধ কাটছে তা প্রমাণিত সত্য। গত বছরই ৪০০ পারের গল্প শুনিয়ে একদম গা ঘেঁষে কোনওমতে সরকার গড়া সম্ভব হয়েছে। বিজেপির একক গরিষ্ঠতা ধাক্কা খাওয়ায় অন্ধ্রের চন্দ্রবাবু আর বিহারের নীতীশ কুমারের ক্রাচে ভর দিয়ে তৃতীয়বার সরকার গড়তে হয়েছে। এদেশে ভোটের চেয়ে বড় বালাই আর কিছু হয় না, এই সারসত্যটা সবারই জানা। দেওয়ালি পেরলেই বিহারে ভোট। বিহারে ফল বেরলে নীতীশ কুমার কী করবেন, কতটা মোদির অনুগত থাকবেন তা ভবিষ্যতের গর্ভে। বিহারে এতদিন পরেও বিজেপি’কে ক্রাচ নিয়ে চলতে হয় নেতৃত্বে তেমন কোনও মুখ নেই বলে। নীতীশ এককভাবে ক্ষমতায় এলে কিংবা লালুর ছেলেদের কাছে হারলে, দু’ক্ষেত্রেই তাঁর বিজেপির উপর নির্ভরতা যে কমবে তা বলাই বাহুল্য। সেক্ষেত্রে ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ নীতীশ কী করবেন কোথায় যাবেন, কেউ জানে না। তাঁর শিবির বদলের কিস্‌সা অমিত শাহদের অজানা নয়। ইন্ডিয়া জোটেরও প্রথম আহ্বায়ক ছিলেন তিনিই। শিবির বদলের দৌড়ে চন্দ্রবাবুও পাকা খেলোয়াড়, যিনি নিজের মেন্টর শ্বশুরমশাইকেও পথে বসাতে ছাড়েননি। 
নরেন্দ্র মোদির সামনে তাই আর একদফা ‘ত্রিমুখী’ অগ্নিপরীক্ষা। অনিশ্চিত শরিক, নিত্য সমস্যায় জর্জরিত সাধারণ মানুষ এবং আমেরিকার সঙ্গে শুল্ক যুদ্ধ। তা নিয়েই সরকার হিমশিম। বিহার আর অসম ছাড়া তামিলনাড়ু, বাংলা, কেরল এবং পুদুচেরিতে গেরুয়া শিবিরের সম্ভাবনা বিরাট উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। না আছে মুখ, না আছে মুখোশ! বাকি পড়ে রইল শুধু পেন্সিল আর দেড় সপ্তাহ বাদে প্রধানমন্ত্রীর ৭৫ বছরে পদার্পণের শুভ মুহূর্ত। কাড়া-নাকাড়া এবং বিপণনের দু’শো রঙিন বেলুন তৈরি। কিন্তু সেই বেলুনে ইতিমধ্যেই কটাক্ষের পিন তাক করেছেন তাঁরই সতীর্থ নীতিন গাদকারি সাহেব। গত রবিবার মহারাষ্ট্রের নাগপুরে অখিল ভারতীয় মহানুভব পরিষদ আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যদের বোকা বানাতে পারেন, তিনি তত বড় নেতা’। বিজেপি বলে থাকে মোদিজি বিশ্বের সবচেয়ে বড় নেতা। তা কি মানুষকে বোকা বানিয়েই! গাদকারি কি তাঁকে উদ্দেশ্য করেই এ সব বললেন? জিএসটি কমিয়ে নরেন্দ্র মোদি অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে নিঃসন্দেহে তিনিই সিকান্দর। আবার উল্টোটাও সত্যি! তাই এত তাড়া। কিন্তু মানুষ সন্তুষ্ট না হলে, ঩জিএসটি কমার সুফল সাধারণ না পেলে? দীর্ঘদিন দেশকে বোকা বানানোর এমন শক্তিশালী ওষুধ আর কার সন্ধানে আছে! বিজেপি ও সঙ্ঘ আপাতত তারই অমৃত সন্ধানে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ