মনীষা মুখোপাধ্যায়: একটা সময় ছিল যখন প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক প্রসবই আদর্শ জন্মপদ্ধতি হিসেবে গণ্য করা হতো। তখন ঘরে ঘরে ধাই-মা কিংবা চিকিৎসক ও নার্সদের সাহায্যে হাসপাতালে সন্তানের জন্ম দিতেন প্রসূতিরা। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান যত এগিয়েছে, ততই স্বাভবিক উপায়ে ডেলিভারির বদলে প্ল্যানড বা সিজারিয়ান ডেলিভারি বা সি-সেকশন প্রয়োজনীয় ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
জনপ্রিয়তার কারণ কী?
• সিজার করে বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুর জন্ম হলে প্রথমেই যে সুবিধার কথা বলতে হয়, তা হল পরিকল্পনা। সিজারের নির্ধারিত তারিখ বেশ কিছুটা আগে থেকে জানা থাকে বলে অনাগত শিশুর মা-বাবা ও পরিবার সবদিক থেকে প্রস্তুত থাকার সময় পান।
• ইঁদুরদৌড়ের যুগে বেশিরভাগই একটু দেরি করে বিয়ে করেন। পরিবার পরিকল্পনা করেন আরও কিছুটা সময় নিয়ে। ফলে বেশি বয়সে মা হওয়ার কারণে বা প্রসূতির শারীরিক সমস্যা থাকার জন্য কয়েকটি ক্ষেত্রে প্লাসেন্টা প্রিভিয়া, ব্রিচ বেবি ইত্যাদি জটিলতা আসতে পারে। সেসব ক্ষেত্রে সিজারিয়ান উপায় মা ও শিশুর প্রাণ বাঁচায়। তাছাড়া গর্ভাবস্থায় শিশুর শারীরিক জটিলতা তৈরি হলে তড়িঘড়ি তাকে প্রাণে বাঁচাতে সিজারিয়ান ডেলিভারিই সেরা উপায়।
• কোনও কোনও হবু মায়ের পেলভিক গঠন সরু ও শিশুর ওজন অনেক বেশি হয়। এইসব ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রসবে সমস্যা হতে পারে। সেই জটিলতা এড়াতে সিজারিয়ান নিরাপদ বিকল্প।
• সিজারিয়ান পথ বেছে নিলে শিশুর জন্মকালীন আঘাতের শঙ্কা কমে। শিশুকে মায়ের গর্ভ থেকে বের করার সময় তার মাথা বা কাঁধে টান পড়া, ব্র্যাকিয়াল প্যালক্সাস ইনজুরি হওয়া ও জন্মকালীন আঘাতের ঝুঁকি কমে।
• একমাত্র অস্ত্রোপচার বা সিজারিয়ান ক্ষেত্রেই মায়ের পেলভিক ফ্লোরের অক্ষুণ্ণতা বজায় রাখা যায়। প্রাকৃতিক ডেলিভারিতে অনেক সময় শিশুর জন্ম দেওয়ার পর মায়েরা প্রস্রাব ধরে রাখতে পারেন না। মায়ের জরায়ু নীচে নেমে যাওয়া বা পেলভিক অঞ্চলের বিভিন্ন জটিলতাও বহুলাংশে দেখা যায়। সিজার এই ধরনের ভবিষ্যৎ সমস্যাগুলির প্রতিরোধে সহায়ক।
• যেসব প্রসূতির হারপিস বা এইচআইভি’র মতো সংক্রমণ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে একমাত্র সিজারই সেরা বিকল্প। কারণ সিজারের মাধ্যমে মায়ের শরীরের সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে পারে নবজাতক।
• প্রসূতি বা নবজাতকের হঠাৎ কোনও জটিলতা এলে অপারেশনের সিদ্ধান্তই তাদের প্রাণ সংশয় থেকে বাঁচাতে পারে।
স্বাভাবিক প্রসবের অসুবিধাই বা কোথায়?
১. স্বাভাবিক প্রসবের সময় প্রসূতিকে প্রসববেদনা ও সন্তান জন্ম দেওয়ার যন্ত্রণা অনেক বেশি সহ্য করতে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ১২-১৪ ঘণ্টা বা তারও বেশি বেদনা সহ্য করতে হতে পারে। কিন্তু সিজারিয়ান প্রসবে প্রসূতিকে অজ্ঞান করে বা নিম্নাংশ অসাড় করে অপারেশন করা হয় বলে সন্তান জন্ম দেওয়ার কষ্ট তুলনায় অনেক কম।
২. স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক উপায়ে প্রসবের সময় শিশুর জন্মকালীন আঘাত লাগার শঙ্কা অনেক বেশি থাকে। এতে শিশুর শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি হয়। ফরসেপ বা বাহ্যিক যন্ত্র ব্যবহারে শিশুর চোট লাগার আশঙ্কা থাকে।
৩. প্রাকৃতিক উপায়ে প্রসব হলে প্রসূতির প্রসবকালে ফিশার বা টিয়ার হওয়ার শঙ্কা বেশি থাকে। এতে হবু মায়ের যোনিপথে বা পেরিনিয়ামে ফাটল দেখা দিতে পারে যা সেলাই করে ঠিক করতে হয়। ফলে বেদনা তাতেও থাকে।
৪. স্বাভাবিক পদ্ধতিতে শিশুর জন্ম দেওয়া বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। প্রসবের সময় আভ্যন্তরীণ কোনও কারণে বা প্রসূতি ও নবজাতকের শরীরের অবস্থার প্রভাবে হঠাৎ প্রসব বন্ধ হয়ে যায়। শিশুর হার্ট রেট কমে যেতে থাকে। তখন জরুরিভিত্তিতে অপারেশন করা ছাড়া গতি নেই।
৫. স্বাভাবিক পদ্ধতিতে সন্তানের জন্ম দিতে গেলে অনেক সময় জরায়ু নীচে নেমে আসে। ফলে পরবর্তীকালে প্রসূতির যৌনজীবনে সমস্যা হতে পারে।