বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: যেন ভেজ চাউমিন সঙ্গে চিলি চিকেন! খাবারে প্যাকেজ, চিকিৎসার প্যাকেজ মানুষ শুনেছে, জেনেছে, দেখেছে। কিন্তু সরকারি হাসপাতালেও প্যাকেজ! হ্যাঁ। সেখানে প্রতাপশালী দালালরা এখন রমরমিয়ে চালাচ্ছে প্যাকেজ! যেমন—আউটডোরে টিকিট কাটতে গিয়ে দু’শো জনের পিছনে লাইন? কুছ পরোয়া নেই, দালালদের দ্বারস্থ হলে তার টিম রোগী বা বাড়ির লোকের হয়ে দাঁড়িয়ে পড়বে। রোগী বিশ্রাম নিক। ঘুরে বেড়াক। টিকিট ঠিক কাটা হয়ে যাবে ২০০ টাকা দিলে!
এভাবে বিনা পরিশ্রমে, লাইনে না দাঁড়িয়েই, টিকিট কাটা, টিকিট এন্ট্রি হয়ে ডাক্তারবাবু বা ডাক্তারম্যাডামের একেবারে সামনে সবাইকে টপকে চলে যাওয়া—এই ‘জনপ্রিয়’ প্যাকেজ এখন চলছে পিজি, মেডিকেলে। খরচ? ২ হাজার টাকা। স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে এ খবরই মিলেছে। আর আউটডোরের সময় শেষ হয়ে গেলে? তারও উপায় করে রেখেছে বেপরোয়া দালালরা। সন্ধ্যা হোক বা রাত, সরাসরি ইমার্জেন্সি থেকেই ওয়ার্ডে ভর্তি করিয়ে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে দালালি ‘প্যাকেজ’ ৫ হাজার টাকা দিয়ে শুরু!
মেডিকেলের পোড়খাওয়া এক কর্মী বলেন, ‘ওদের নীতি হল—যেমন ‘মুরগি’ তেমন ‘বলি’। কথাবার্তায় চৌখস দালালরা নিমেষে ধরে ফেলছে, কার পকেটে কেমন রেস্ত আছে। তাই কারও কাছে ৫ হাজার, আবার অনেকের পকেটে ফাঁকা করে ১০-১৫ হাজার টাকাও নিচ্ছে! কলকাতার সরকারি মেডিকেল কলেজগুলিতে সবচেয়ে হাই ডিমান্ড আইসিইউ, আইটিইউ বেডের। ওরা সেগুলিও ছাড়েনি! মেডিকেলে এখন দালালরা একটি আইসিইউ বেড পিছু ২৫ হাজার টাকাও চাইছে!
পিজিতে ডাক্তার দেখাতে গিয়ে দিন পনেরো আগে দালালের খপ্পরে পড়েছিলেন ছায়া আদক (নাম পরিবর্তিত)। ফিসচুলায় সমস্যায় ভুগছিলেন যাদবপুরের বাসিন্দা ছায়াদেবী। সার্জারির সিনিয়র চিকিৎসককে দেখালে, তিনি গ্যাসট্রোর চিকিৎসককে দেখাতে বলেন। বলেন, কোলোনস্কপি করতে হতে পারে। গ্যাসট্রোএনটেরোলজির চিকিৎসক দেখানোর লাইন দেখে তাঁর ভিরমি খাওয়ার জোগাড় হলে, উদয় ‘রাজু’ নামে এক দালালের। ছায়াদেবীর আধার নম্বর ইত্যাদি নিয়ে তিনি বলেন, ২০০ দিন! গ্যাসট্রোর টোকেন পেয়ে যাবেন (পিজি’র একমাত্র এই বিভাগে প্রথমে টোকেন দেওয়া হয়, তা নিয়ে যেতে হয় ডাক্তার দেখাতে)। আর ২ হাজার দিলে ডাক্তারের সামনে নিয়ে যাব! কোলোনোস্কপির সামনে ডেটও হয়ে যাবে!’
শনিবার ছায়াদেবী বলেন, ‘ভাবুন, হাসপাতালে মালদহ, মুর্শিদাবাদ থেকে আগের রাতে এসে লাইন দেওয়া রোগী ছিলেন। তাঁদের একজনের টোকেন নম্বর ছিল ২৩। আর ওই দালালের জোগাড় করা টোকেনের নম্বর ১৮!’ তিনি বলেন, ‘শরীরের যা অবস্থা, অত লাইনে দাঁড়াতে পারতাম না। তাই বাধ্য হই ওকে টাকা দিতে। কিন্তু মনেপ্রাণে চাইব, দালালচক্র সমূলে উৎপাটিত হোক।’ শুধু গ্যাসট্রোর লাইনের ওই রাজুই নন, সার্জারির সামনেও দু’জনে আমাদের কাছে এসে বলেন, ‘২০০ দিন, লাইন ম্যানেজ হয়ে যাবে! শুধু অ্যারেস্ট করলে হবে না। এই চক্র ভাঙতে গেলে লাইনে দাঁড়ানোর সময় কমাতে হবে। আরও বেশি টিকিট কাউন্টার বানাতে হবে। আরও বেশি কর্মী দিতে হবে।’
পিজি’র এক পদস্থ আধিকারিক জানান, রোগী কল্যাণ সমিতির বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ডিসি সাউথের সামনে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, দালালরা যত প্রতাপশালী হোক না কেন, চক্র ভাঙতেই হবে। নো টলারেন্স! মেডিকেলের এক পদস্থ কর্তা বলেন, দালালচক্র নিয়ে লিখিত দু’টি অভিযোগ জমা পড়েছে অফিসে। পুলিশকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলেছি। মন্ত্রী ডাঃ ইন্দ্রনীল খাঁ বলেন, সাধারণ মানুষকে বলব, দালালদের ব্যাপারে তথ্য থাকলেই ১০০তে ফোন করুন। পুলিশে জানান। টিকিট কাউন্টার বাড়ানো, লাইনে দাঁড়ানোর সময় কমানোসহ অন্যান্য বিষয়গুলিও আমরা দেখছি।