Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কেন হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে না ভারত

ভারতের প্রাচীন সাংস্কৃতিক দর্শনের একটি মূল ভিত্তি মহোপনিষদের ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’। যার অর্থ ‘সমগ্র পৃথিবীই এক পরিবার’। এই ধারণা ভারতীয়দের মানবজাতিকে এক বিশ্ব-আত্মীয়তার বন্ধনে দেখতে শিখিয়েছে।

কেন হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে না ভারত
  • ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিভাস রায়চৌধুরী: ভারতের প্রাচীন সাংস্কৃতিক দর্শনের একটি মূল ভিত্তি মহোপনিষদের ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’। যার অর্থ ‘সমগ্র পৃথিবীই এক পরিবার’। এই ধারণা ভারতীয়দের মানবজাতিকে এক বিশ্ব-আত্মীয়তার বন্ধনে দেখতে শিখিয়েছে। ভারতের ধর্মীয় ও দার্শনিক ধারায় সহনশীলতা, সহাবস্থান ও সহমর্মিতা— এই তিনটি মূল্যবোধ বারবার উচ্চারিত হয়েছে। প্রতিবেশী, অতিথি, এমনকি ভিন্ন ধর্ম বা জাতির মানুষের প্রতিও ‘অতিথি দেবো ভব’ মনোভাব এই বৃহত্তর পরিবারের ভারতীয় চিন্তাকেই শক্তিশালী করেছে। আজকের বিশ্বায়নের যুগে এই দর্শন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনীতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। এই দর্শনের উপরই দাঁড়িয়ে রয়েছে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত।

Advertisement

গত বছরের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে আওয়ামি লিগের সরকারের পতনের পর হাসিনা ভারতে চলে আসেন। তারপর থেকে ভারতেই সাময়িক আশ্রয়ে রয়েছেন তিনি। হাসিনা সরকারের তৈরি করা ট্রাইবিউনালেই শুরু হয় তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম মামলার বিচার। বাংলাদেশের বিভিন্ন আদালত এবং থানায় এখনও পর্যন্ত হাসিনার বিরুদ্ধে ৫৮৬টি মামলা হয়েছে। হাসিনার অনুপস্থিতিতেই ৩৯৭ দিন ধরে বিচারপ্রক্রিয়া চলার পর সাজা ঘোষণা হয়েছে ওই মামলায়। শেষপর্যন্ত গত বছর ছাত্রজনতার বিক্ষোভের সময় গণহত্যা সংক্রান্ত অভিযোগে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে’ দোষী সাব্যস্ত করেছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবিউনাল। তাঁর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছে আদালত। কিন্তু তা কি এত সহজে সম্ভব?
বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত (হস্তান্তর বলা যাবে না, কারণ তাঁকে গ্রেপ্তার করে রাখা হয়নি) না পাঠানোর ফলে গত ১৫ মাস ধরে দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন চলছে। এখন হত্যার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হওয়ায় সেই উত্তেজনা আরও বেড়েছে। রায় ঘোষণার পর লিখিত বিবৃতি দিয়ে খোদ হাসিনা দাবি করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলির সপক্ষে কোনও প্রমাণ নেই। বরং তাঁর আমলে মানবাধিকার এবং উন্নয়নমূলক অনেক কাজ হয়েছে। সে জন্য তিনি গর্বিতও। তাঁর কথায়, ‘এই রায় অন্তর্বর্তিকালীন সরকারে থাকা চরমপন্থী ব্যক্তিদের নির্লজ্জতা ও খুনি মনোভাবের প্রতিফলন মাত্র। বাংলাদেশের শেষ নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণ করতে এবং আওয়ামি লিগকে রাজনৈতিকভাবে ভেঙে দিতে এই কাজ করা হয়েছে।’ যদিও ঢাকার বিদেশ মন্ত্রক নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে চাপ আরও বাড়াচ্ছে। দু’দেশের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ বলতে চাইছে, হাসিনাকে ফেরত দেওয়া ভারতের ‘বাধ্যতামূলক দায়িত্ব’। তারা বলতে চাইছে, হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে ন্যায়ের প্রতি অবজ্ঞা করছে ভারত।
সাউথ ব্লক মনে করে, ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণ নিয়ে চুক্তি থাকলেও আদালতের রায়ের পর বাংলাদেশে হাসিনার প্রাণসংশয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ওই চুক্তিতে থাকা নিয়ম অনুসারেই ভারত হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ করতে বাধ্য নয়। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় গা ঢাকা দেওয়া অপরাধীদের নাগাল পেতেই প্রত্যর্পণ চুক্তি করেছিল ভারত এবং বাংলাদেশ। চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অপরাধটির যদি রাজনৈতিক চরিত্র থাকে, তা হলে প্রত্যর্পণ করা হবে না। চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, বিচারের নেপথ্যে যদি সৎ কোনও উদ্দেশ্য না-থাকে, তা হলে ভারত বা বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করবে না। হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না-করার জন্য এই যুক্তিগুলিই যথেষ্ট। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে ভারত বাংলাদেশি জনগণের শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি ও স্থিতিশীলতার সর্বোত্তম স্বার্থে অঙ্গীকারবদ্ধ। এই লক্ষ্য অর্জনে আমরা সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করে যাব’। এতে স্পষ্ট, এই মুহূর্তে দিল্লি হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া দেবে—এমন সম্ভাবনা কম। ভারতের থিঙ্ক ট্যাংক প্রতিষ্ঠান মনোহর পারিক্কর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিসের গবেষক স্মৃতি এস পট্টনায়কের মতে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ‘সীমিত কর্মপরিধি ও দায়িত্বসম্পন্ন একটি রূপান্তরকালীন সরকার। ভারত অপেক্ষা করবে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই তারা দ্বিপাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করবে।’ ভারতের ঘোষিত অবস্থান হল— একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সুরক্ষা ও নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁকে এদেশে ‘সাময়িক’ (ফর দ্য টাইম বিয়িং) আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এর বেশি কিছু নয়।
বস্তুত, শেখ হাসিনা বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর একটি মিলিটারি এয়ারক্র্যাফটে করেই দিল্লির কাছে হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে এসে অবতরণ করেন। ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর পরদিনই মানে ৬ আগস্ট পার্লামেন্টে জানান, শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি যাতে দিল্লিতে এসে নামতে পারে, তার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তরফে ভারতের কাছে আগাম অনুমতি বা ‘ফ্লাইট ক্লিয়ারেন্স’ও চাওয়া হয়েছিল। এবং সেই ঘটনার পর থেকে আজ অবধি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বেও কোনও পরিবর্তন হয়নি। তখনও বাহিনীর প্রধান ছিলেন জেনারেল ওয়াকার উজ জামান, এখনও তিনিই সেনাপ্রধান আছেন। ফলে, যে পরিস্থিতিতেই শেখ হাসিনা ভারতে এসে থাকুন, তার পিছনে বাংলাদেশের বর্তমান সেনা নেতৃত্বের একটা সক্রিয় ভূমিকা অবশ্যই ছিল। যা অস্বীকার করা কঠিন। শেখ হাসিনা এখন আমাদের অতিথি হতে পারেন, কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে— তাঁকে কিন্তু আমরা ডেকে আনিনি। সেই ঘটনাক্রম আজ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধকে বেশ কিছুটা দুর্বল করে দিয়েছে। প্রাক্তন কূটনীতিবিদ পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী বলেছেন, ‘মনে রাখতে হবে ৫ আগস্ট তারিখেও শেখ হাসিনার নামে সে দেশে কোনও মামলা ছিল না। ফলে ভারত যখন তাকে আতিথেয়তা দিয়েছে, সেই মুহূর্তে তিনি কিন্তু কোনও ফেরার আসামি নন। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর যদি তাঁর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে শত শত মামলা একসঙ্গে দায়ের করা হতে থাকে, তাহলে এটা মনে করার যথেষ্ঠ কারণ থাকতে পারে এগুলি রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক। যার ভিত্তিতে প্রত্যর্পণের কোনও প্রশ্নই ওঠে না।’ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর পক্ষে ভারতের অন্দরে সমর্থন খুবই কম। তাঁর মৃত্যুদণ্ড রায়ের পর এই সমর্থন আরও কমেছে। ভারতের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তাঁর প্রত্যর্পণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এর মূল কারণ, ভারতের সঙ্গে আওয়ামি লিগ ও শেখ হাসিনার পরিবারের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে ভারত সমর্থন করেছিল, যেখানে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন আওয়ামি লিগ ও হাসিনার বাবা শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫ সালে মুজিবের হত্যার পর হাসিনা ও তাঁর বোন ভারতে আশ্রয় পান এবং সেখানে ছ’বছর কাটিয়েছেন। শেখ হাসিনা ও আওয়ামি লিগের সঙ্গে ভারতের আবেগপ্রবণ সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ হাসিনার জমানায় দুই দেশের মধ্যে গড়ে ওঠা দৃঢ় রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক। বাংলাদেশের কট্টর ইসলামপন্থী সংগঠন ও ভারতবিরোধী জঙ্গি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হাসিনার কঠোর অবস্থান দিল্লিতে প্রশংসিত হয়েছে। ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে শেখ হাসিনা গুরুত্ব দিয়েছিলেন, এর ফলে ভারতও তাঁর স্বৈরশাসনকে শক্তভাবে সমর্থন করেছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এক ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’কে মৃত্যুদণ্ডের মুখে ফেলে দেওয়ার জন্য প্রত্যর্পণ করা হলে ভারতের অন্যান্য মিত্রদের কাছেও বার্তা যাবে যে, দিল্লি নির্ভরযোগ্য বন্ধু নয়। অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা—উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ অনেক বড়। তাই আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত ভারত এই বিষয়ে স্পষ্ট কোনও অবস্থান নেবে না।
এই ধারাবাহিকতায় গত কয়েক মাস ধরেই বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী একটা প্রচার চালানো হচ্ছে। উস্কানিমূলক মন্তব্য করা হচ্ছে। ফের, ভারতের উত্তর-পূর্ব অংশকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ভারতীয় দূতাবাস ও উপ-দূতাবাসে হামলা চালানোর ডাক দেওয়া হচ্ছে। সব রাগ যেন গিয়ে পড়ছে ভারতের উপরেই। ইঙ্গিত পরিষ্কার। ভারতের ক্ষতিসাধন। ভারতের বদনাম। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, কারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে? ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অবশ্যই পাকিস্তানের নাম এই তালিকার সবার উপরে থাকবে। বিশেষ করে, হাসিনার পতনের পর, সেদেশে পাক সেনা ও আইএসআই-এর প্রভাব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের কট্টরপন্থী, মৌলবাদী ও সন্ত্রাসীরাও বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। উদ্দেশ্য একটাই, বাংলাদেশিদের আরও ভারত-বিরোধী করে তোলা। তাদের মনে ভারত-বিদ্বেষের বিষ ভরে দেওয়া। এর জন্য, যদি এক-দুটো প্রাণের বলি চড়াতে হয়, তাতেও আপত্তি নেই। বিশ্লেষকদের মতে, হতে পারে হাদি-হত্যা এই বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ। তালিকায় পিছিয়ে নেই চীন-আমেরিকাও। তাদের উদ্দেশ্য ভারতের উন্নতি রোখা। ভারতের বিরুদ্ধে ‘ডিপ-স্টেট’ কার্যকলাপ করা। এক কথায় বাংলাদেশকে অগ্নিগর্ভ করে ভারতকে এই দিকে আটকে রাখা, যাতে ভারত অর্থনৈতিকভাব সুপারপাওয়ার হওয়ার দিকে মনোনিবেশ না করতে পারে। কিন্তু তা কি সম্ভব?
লেখক: প্রাক্তন বায়ুসেনা আধিকারিক, মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ