তন্ময় মল্লিক: কেন্দ্রীয় স্বরাষ্টমন্ত্রী অমিত শাহ বাংলায় এলেন। নির্বাচনী ভাষণ দিলেন। কিন্তু, ছাব্বিশের ভোটে বিজেপির আসন টার্গেট বেঁধে দিলেন না। একটিবারও আসন নিয়ে ‘রা’ কাটলেন না। কিন্তু কেন? ‘বিজেপির চাণক্য’ কি বুঝে গিয়েছেন, ভস্মে ঘি ঢেলে কোনও লাভ হবে না। তাই কি তিনি বঙ্গ বিজেপিকে এবার কোনও টার্গেট দিয়ে ফের একবার নিজে হাস্যাস্পদ হতে চাইলেন না?
রোগী যখন সঙ্কটাপন্ন হয় তখন অধিকাংশ চিকিৎসক একটা কথাই বলেন, ‘আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। বাকিটা উপরওলার হাতে। ৭২ ঘণ্টা না কাটলে কিছুই বলা যাবে না।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলায় ‘অপারেশন সিন্দুর’ নিয়ে ঢাক পেটাতে এসে নির্বাচনী দামামা বাজিয়ে দিয়েছেন। ভোট এখনও মাস আষ্টেক, দশেক বাকি। তা সত্ত্বেও নির্বাচনী প্রচার সেরে প্রধানমন্ত্রী বুঝিয়ে দিয়েছেন, গোটা দেশকে একসুতোয় বাঁধা নয়, বাংলা দখলই তাঁর লক্ষ্য। কারণ তিনি জানেন, উনিশের পুনরাবৃত্তি আর বাংলায় ঘটবে না। জাতীয় ভাবাবেগের তাস অন্তত বাংলায় বিজেপির জন্য ‘ট্রাম্প কার্ড’ হবে না। তাই হিন্দুত্বের জিগির তোলার চেষ্টা করেছেন। তাতেও যে খুব একটা লাভ হবে না, সেটা রাজনীতির ময়দানে পোড়খাওয়া এই মানুষটা বুঝেছেন। তাই ‘রোগী’র হাল বোঝার জন্য ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই বাংলায় পাঠিয়েছেন রাজনীতির অভিজ্ঞ চিকিৎসক অমিত শাহকে।
অমিতজি বিজেপির প্রাক্তন সর্বভারতীয় সভাপতি। এখন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। খাতায় কলমে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘নাম্বার টু’ হলেও অনেকে তাঁকে ‘ডি-ফ্যাক্টো’ প্রধানমন্ত্রী মনে করেন। তাঁদের মতে, রাজনীতির অভিজ্ঞ চিকিৎসক অমিতজি নাড়ি টিপলেই বুঝতে পারেন, রোগী আদৌ উঠে দাঁড়াবে, নাকি শয্যাশায়ী অবস্থাতেই কোমায় চলে যাবে। ‘সার্জেন’ হিসেবে অমিতজির যথেষ্ট সুনাম আছে। ‘অপারেশন’টা তিনি ভালো বোঝেন। কিন্তু, রাজনীতির ‘মেডিসিন’ পার্টে ঘাটতি আছে। আর বঙ্গ বিজেপি এতটাই মুমূর্ষু অবস্থায় রয়েছে যে অপারেশন টেবিলে তুললেই অঘটনের আশঙ্কা প্রবল। তাই ‘ভোকাল টনিকে’ই রোগীকে চাঙ্গা করার চেষ্টা।
একুশের নির্বাচনে বঙ্গ বিজেপিকে ২০০ আসনের টার্গেট দিয়েছিলেন অমিতজি। কিন্তু, পেয়েছিল ৭৭টি। চব্বিশে বোলপুরে দাঁড়িয়ে ৪২টির মধ্যে ৩০ আসনের টার্গেট দিয়েছিলেন। দেশের ভোট। বিরোধী দলের প্রধানমন্ত্রীর কোনও মুখ ছিল না। তবুও টার্গেটের অর্ধেক আসনও জোটেনি। দিল্লি যে টার্গেট দেয়, তার অর্ধেকও বঙ্গ বিজেপি জোগাড় করতেও পারে না। সেটা নির্বাচনের আসন সংখ্যা হোক অথবা সদস্য সংগ্রহ।
নেতাজি ইন্ডোরে অমিত শাহ দাবি করেছেন ছাব্বিশে বিজেপিই বাংলায় ক্ষমতায় আসবে। ক্ষমতায় এলে কী করবেন, সেটাও জানিয়েছেন। কিন্তু প্রতিবার নির্বাচনী সুর বাঁধতে এসে আসনের টার্গেট ঝুলিয়ে দিতে অভ্যস্ত অমিতজি এবার সেটা করেননি। তাতে অবশ্য একটা লাভ তাঁরই হবে। ছাব্বিশের ফল বের হওয়ার পর একুশের মতো লজ্জায় মুখ লুকাতে হবে না।
নরেন্দ্র মোদি রাজ্য ছাড়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই কলকাতায় এসেছেন অমিত শাহ। বোঝা যাচ্ছে, বাংলায় ভোট আসন্ন। তাই শুরু হয়েছে দিল্লির বিজেপি নেতাদের ডেলি প্যাসেঞ্জারি। এরপর আসবেন নাড্ডাজি, যোগীজি, রাজনাথজি....। তবে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটু বেশিই আসবেন। কারণ একুশে নাকে ঝামা ঘষা খাওয়ার জ্বালা এখনও যায়নি। তাই বাংলায় ফের একবার ‘এয়ার স্ট্রাইক’ করতে চাইবেন। তবে, তাতে একুশের ক্ষতে মলমের প্রলেপ পড়বে, নাকি ঘা আরও দগদগে হবে, সেটা সময় বলবে। আশঙ্কা একটাই, শেষপর্যন্ত গ্যাংগ্রিন না হয়ে যায়!
অমিত শাহ এবার যে সব কথা বলেছেন তারমধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হল অনুপ্রবেশ। অনুপ্রবেশের দায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘাড়ে চাপিয়েছেন। বলেছেন, মমতাদিদি, আমরা আপনার থেকে জমি চেয়েছি। পুরো জমি দিয়ে দিন। কাজ শেষ করতে দিন। একটি পাখিও প্রবেশ করতে পারবে না। আপনার ভোট ব্যাঙ্ক যাতে বাড়ে তারজন্য আপনি সীমান্তে জমি দেন না। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এও বলেছেন, বাংলার ভোট দেশের সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইচ্ছা করে বাংলাদেশিদের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছেন। তাঁর আশীর্বাদেই অনুপ্রবেশ হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, রাজ্য সরকার জমির ব্যবস্থা না করায় বেড়া দেওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু, সত্যিই কি তাই! তথ্য কী বলছে? বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের রাজ্যের সীমান্ত এলাকা সবচেয়ে বেশি, ২২১৭ কিলোমিটার। তারমধ্যে ১৬০০ কিমিতে কাঁটাতার আছে। নদীর কারণে কিছু এলাকায় বেড়া দেওয়া সম্ভব নয়। বাকি অরক্ষিত এলাকার ২২৪ কিমিতে কাঁটাতার দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকার জমি দিতে তৈরি। কিন্তু, কেন্দ্র টাকা দিচ্ছে না। এতে স্পষ্ট, কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ায় সদিচ্ছার অভাব কেন্দ্রেরই।
নবান্নের এই দাবি যে অমূলক নয়, তা একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে। শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছাড়ার পর অনুপ্রবেশ আটকাতে কোচবিহার, মালদহ সহ বিভিন্ন সীমান্ত জেলায় তড়িঘড়ি বেড়া দেওয়ার চেষ্টা হয়। বাংলাদেশি দুষ্কৃতীরা সেই কাজে বারবার বাধা দিচ্ছিল। তা নিয়ে অশান্তিও হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রাজ্য সরকার জমির ব্যবস্থা না করে রাখলে অত তাড়াতাড়ি বেড়া দেওয়া কি সম্ভব হতো?
এখন প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি হল, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার কি সত্যিই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চায়? উত্তরটা হল, না। কিছু ইস্যু জিইয়ে রাখতে পারলে রাজনীতি করাটা সহজ হয়। অনেকেই মনে করেন, সিপিএম ক্ষমতাচ্যুত না হলে এখনও দার্জিলিংয়ে এবং জঙ্গলমহলে অশান্তি লেগেই থাকত। কারণ দার্জিলিং এবং জঙ্গলমহল দেখিয়ে একের পর এক নির্বাচনে জিতত বামেরা। এক্ষেত্রেও বেড়ার কাজ শেষ হলে অনুপ্রবেশ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিজেপির রাজনীতি করাটা বন্ধ হয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় কথা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পর কোথাও কাঁটাতারের বেড়া উপড়ে ফেলা হয়নি। সীমান্ত সমস্যাটা দীর্ঘদিনের সমস্যা। তবুও বিজেপি এরজন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই দায়ী করে যাবে। এটাই রাজনীতি।
বাংলায় ক্ষমতায় এলে বিজেপি কর্মীদের খুনিদের মাটির নীচ থেকে তুলে শাস্তি দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর কথা শুনে অনেকেই বলছেন, এতই যদি ক্ষমতা তাহলে ভারতে ঢুকে ২৬জন পর্যটককে যারা খুন করল তাদের কিছু করতে পারছেন না কেন? তাদের তো মাটির নীচ থেকে মানে কবর থেকে তুলে আনতে হবে না। তারা তো দিব্যি মাটির উপরেই ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তবে, অমিতজির একটা কথা ঠিক। তাঁর কথায়, ‘অপারেশন সিন্দুর এখনও শেষ হয়নি।’ কারণ এখনও বিহারের, বাংলার নির্বাচন বাকি। তাই ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টকে দিয়ে হাওয়া তোলা না গেলে ‘এয়ার স্ট্রাইক’ প্রয়োজন হতেই পারে। এখন চলছে পাকিস্তানের চর ধরার কাজ। যারা দেশের গোপন তথ্য বিদেশে পাচার করছে, সেই সব ‘মিরজাফর’কে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত যারা ধরা পড়েছে তাদের বেশিরভাগই বিজেপি শাসিত রাজ্যের বাসিন্দা। তারজন্য সেই রাজ্যের শাসক দল বা মুখ্যমন্ত্রীকে কেউ দোষারোপ করছে না। কিন্তু এটা বাংলায় হলে কী হতো? বিজেপি সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূলকে পাকিস্তানি জঙ্গিদের আশ্রয়দাতা প্রমাণে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তারপরই উঠত মাথা পর্যন্ত পৌঁছনোর দাবি। অমিত শাহ কি সেই রাস্তাই তৈরি করে দিয়ে গেলেন? সেই জন্যই কি তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আপনি যত ইচ্ছা পাকিস্তানের পাঠানো সন্ত্রাসবাদীদের পক্ষ নিন, অপারেশন সিন্দুর চলবে।’
জন বার্লা, শঙ্কর মালাকারের মতো একের পর এক হেভিওয়েট বিরোধী নেতা তৃণমূলে যোগ দিচ্ছেন। লাইনে আছেন নাকি আরও অনেকে। তাই একুশের মতো বিজেপির সামনে ‘যোগদান মেলা’ করার সুযোগ নেই, উল্টে ‘বিয়োগে’র আশঙ্কাই প্রবল। সেইজন্যই কি পরিকল্পিতভাবে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সন্ত্রাসবাদীদের পক্ষ নেওয়ার কুৎসিত অভিযোগ? এরপর কি বাংলায় ধরা পড়বে কোনও জঙ্গি অথবা পাকিস্তানের চর? তারপরই দেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন ধুয়ো তুলে সপ্তমে চড়ানো হবে বাংলাকে মোদির হাতে তুলে দেওয়ার আওয়াজ? এটাই কি বিজেপির ছাব্বিশের ব্লুপ্রিন্ট? প্রশ্নটা তোলা রইল।