Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কাশ্মীরের হামলা এবার সম্পূর্ণ নতুন ধাঁচের কেন?

বেছে বেছে হিন্দুদের গণহত্যা করা হলে ভারতের মতো হিন্দুপ্রধান দেশে খুব স্বাভাবিকভাবেই জঙ্গি হামলার সঙ্গে ধর্ম পরিচয়ের অগ্রাধিকার বেশি করে  জড়িয়ে যাবে। সেটাই হচ্ছে।

কাশ্মীরের হামলা এবার সম্পূর্ণ নতুন ধাঁচের কেন?
  • ২৫ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: বেছে বেছে হিন্দুদের গণহত্যা করা হলে ভারতের মতো হিন্দুপ্রধান দেশে খুব স্বাভাবিকভাবেই জঙ্গি হামলার সঙ্গে ধর্ম পরিচয়ের অগ্রাধিকার বেশি করে  জড়িয়ে যাবে। সেটাই হচ্ছে। আর তার জেরে কী হচ্ছে? হিন্দুপ্রধান ভারতের নাগরিকদের একাংশের মধ্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রবল রাগ তৈরি হয়েছে। এটা হওয়ারই কথা। কারণ কাশ্মীরে যারা ওই নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, প্রাথমিক আইডেন্টিফিকেশনে জানা গিয়েছে তারা সকলেই মুসলিম। এবং লস্কর-ই-তোইবার একটি প্রক্সি সংগঠন দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্টের সদস্য। সুতরাং পাকিস্তানও আছে, লস্কর আছে, মুসলিম আছে। রাগের মাত্রা বেড়ে যাওয়াই প্রত্যাশিত।  

Advertisement

কাশ্মীরে একটি জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। কারা ঘটিয়েছে? ইসলামকে সামনে রেখে সন্ত্রাস ছড়ানো ইসলামিক জঙ্গি গোষ্ঠী। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই জঙ্গিরা কাশ্মীর আর ভারতের মুসলিমদের এত বিপদে ফেলছে কেন? এদের উদ্দেশ্য কী? এভাবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে নাম পরিচয় জেনে গুলি করে মারা হল এবং দেখা গেল সকলেই হিন্দু। একজন স্থানীয় যুবক হিন্দু পর্যটককে রক্ষা করতে গিয়ে জঙ্গিদের হাতে নিহত হয়। সে মুসলিম। কিন্তু খটকা হল, ইসলামের নামে যারা জেহাদে নেমেছে, তারা ভারতের সর্বনাশ চায় বোঝা গেল। অনেক বছর ধরেই এই সর্বনাশ চাওয়া এবং সেইমতো অসংখ্য জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তারা সবথেকে বড় সর্বনাশ তো করে দিচ্ছে মুসলিমদের! আর এটা না বোঝার মতো নির্বোধ তারা নয়। তাহলে তাদের আসল উদ্দেশ্যটা ঠিক কী? 
খটকা লাগার কারণ হল, এই মুসলিম জঙ্গিরা কাশ্মীরিদের কাছে ভালো হতে চাইবে। কাশ্মীরিরা নাকি ভারতের অধীনে থেকে খুব খারাপ আছে। তাই কাশ্মীরিদের আজাদ করতে চায় তারা। কাশ্মীরিরা যেহেতু সিংহভাগ মুসলিম, তাই কাশ্মীরিরাও মুসলিম ব্রাদারহুডের অংশ। পাকিস্তানই নাকি কাশ্মীরের আসল বন্ধু ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব নির্বোধের মতো প্রচার না হয় বোঝা গেল। কিন্তু যা বোঝা গেল না যে, কাশ্মীরে যত জঙ্গি হামলা হয়েছে, তার জেরে সবথেকে বেশি ক্ষতি হয়েছে কাশ্মীরিদের। কাশ্মীরবাসী, রাজ্য পুলিস, সরকারি কর্মী, সাধারণ মানুষ প্রচুর নিহত হয়েছে। সকলেই মুসলিম। আবার ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যারা কাশ্মীরে কাজ করতে যায়, ব্যবসা করতে যায়, তাদেরও হত্যা করা হয়েছে। গরিব পরিযায়ী শ্রমিকদের নাম ধরে ধরে বেছে বেছে হত্যা করা হয়েছে। পুলওয়ামায় ২০১৯ সালে সরাসরি আধা সামরিক বাহিনীকে টার্গেট করা হয়েছিল। তার আগে পাঠানকোটে এয়ারফোর্স বেস স্টেশনে হামলা। উরিতে সেনা ক্যাম্পে আক্রমণ। এসবেই না হয় বোঝা যায় যে, ভারতীয় সিকিউরিটি এজেন্সিকে টার্গেট করা হচ্ছে। কেন? কারণ, জঙ্গিদের বক্তব্য ছিল, সিকিউরিটি এজেন্সি নাকি সাধারণ কাশ্মীরিদের জীবন অত্যাচারে, নিপীড়নে দুর্বিষহ করে তুলেছে। তারই বদলা। বেশ তাও বোঝা গেল। কিন্তু এই যে ২৭ জন হিন্দুকে হত্যা করা হল, বেছে বেছে হিন্দু হিসেবে এবং তাও আবার পর্যটকদের, এটা তো সবথেকে বেশি চরম সঙ্কটে ফেলছে কাশ্মীরিদের, ভারতীয় মুসলিমদের। জঙ্গিরা নিজেদের ইসলামিক ভাইয়েদের এই বিপদে ইচ্ছাকৃতভাবে ফেলছে কেন? কারণ কী? প্ল্যান কী? 
আমরা যেটা স্পষ্ট বুঝতে পারছি এবং অবশ্যই পাকিস্তানি জঙ্গিরাও বুঝে গিয়েছে যে, কাশ্মীরিদের আর সন্ত্রাসে আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না। বহু বছর হয়ে গিয়েছে তারা আর আজাদ হতে চায় না। সমস্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন মূলস্রোতে চলে এসেছে। তারা আজকাল ভোটে লড়াই করে। কেন এই পরিবর্তন? কারণ সহজ। ভারত এবং পাকিস্তান, দুই রাষ্ট্রকে দেখে যে কোনও সাধারণ বুদ্ধির নাগরিক বুঝবে কোথায় জীবনে উন্নতি করার সুযোগ বেশি। কোন রাষ্ট্র বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সমীহ, শ্রদ্ধা পায়। কাদের আর্থিক শক্তি কত বেশি। কোথায় জীবিকা এবং জীবন অনেক ভদ্রসভ্য সুস্থিত। কোথায় অনিশ্চয়তা নেই বা কম।  
এই যে টার্গেট কিলিং হল এই প্যাটার্ন থেকে যেটা স্পষ্ট, সেটা হল, এখন আর কাশ্মীরিদের আজাদ করা, তাদের সুবিচার পাইয়ে দেওয়া, তাদের জন্য দরদে প্রাণ কাঁদা, এসব ফ্যাক্টরকে জঙ্গিরা অগ্রাধিকার দিচ্ছে না। জঙ্গিরা ভারতে দাঙ্গা লাগাতে চাইছে। ঠিক যেমন ইসলামিক মৌলবাদী, হিন্দু মৌলবাদীরাও যখন তখন দাঙ্গা লাগাতে চায়, এবার দেখা যাচ্ছে জঙ্গিরাও সেই স্ট্র্যাটেজি নিয়েছে। কারণ একমাত্র দেশজুড়ে দাঙ্গা হলেই ভারতের অগ্রগতি আটকে যাবে। চরম সর্বনাশ হবে। রাজ্যে রাজ্যে বিচ্ছিন্নভাবে লকডাউনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে। অফিস, ব্যবসা, দোকান, কারখানা, উৎপাদন, চাষবাস সব বন্ধ হয়ে যাবে। শুধুই চলবে হিন্দু মুসলমান সংঘর্ষ। ফলে ভয়ে মানুষ ঘরে বসে থাকবে। অথবা বাইরে বেরিয়ে গৃহযুদ্ধ করবে। এটা যদি একবার বাঁধিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে আর কোনও পরমাণু অস্ত্র-টস্ত্র লাগবে না। 
জঙ্গিরা ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যাতে ভারতীয় হিন্দুদের বড় অংশ প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে যায় সেই প্রজেক্ট নিয়েছে। পাকিস্তান এই স্ট্র্যাটেজি শিখিয়ে দিয়েছে। কারণ সরাসরি যুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে ভারতের সামনে ২০ মিনিট দাঁড়ানোও অসম্ভব। ঠিক যেমন বাংলাদেশ থেকে জঙ্গি গোষ্ঠী, মৌলবাদী গোষ্ঠী এসে পশ্চিমবঙ্গে দাঙ্গায় উস্কানি দিচ্ছে। আর এই বাংলার কিছু অংশ সেই প্ররোচনার ফাঁদে পা দিচ্ছে। 
সুতরাং বাংলাদেশ চাইছে ভারতে দাঙ্গা শুরু হোক। পাকিস্তান চাইছে ভারতে দাঙ্গা শুরু হোক। কেন চায়? ১৯৪৭ সালে এই দুই জনগোষ্ঠীই ভারত থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। তখন একজোট হয়ে ভারত থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। তারপর কয়েকমাস যেতে না যেতেই বুঝে গিয়েছিল তারা নিজেরাই পরস্পরের শত্রু। সুতরাং ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত যে পূর্ববঙ্গ ভাবছিল তাদের সবথেকে বড় বন্ধু নয়া পাকিস্তান হবে, তারাই এক বছরের মধ্যে নিজেরাই বলতে লাগল যে, তাদের সবথেকে বড় শত্রু পশ্চিম পাকিস্তান। 
সুতরাং পূর্ববঙ্গ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। এবং নতুন দেশ হল। ১৯৪৭ সালের পর ৭৮ বছর কেটে গিয়ে দেখা যাচ্ছে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এই দুই অংশই ব্যর্থ রাষ্ট্র। না পেরেছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে, না পেরেছে সফল ইসলামিক রাষ্ট্র হতে।  কিছুই হতে পারেনি। বিশ্বের কেউ এই দুই রাষ্ট্রকে আজকাল সিরিয়াসলি নেয় না।
এই দুই রাষ্ট্রের চোখের সামনে ভারতের বাড়বাড়ন্ত ঈর্ষাযোগ্য। উল্লেখযোগ্য হল, যে যতই বলুক, ভারতের অগ্রগতি কখনও থমকে যায়নি। ভারত কোনওদিন পিছন দিকে হাঁটেনি। কংগ্রেস, জনতা দল, তৃতীয় ফ্রন্ট, বিজেপি যখন যেই আসুক না কেন, ভারতের অগ্রগতি কিন্তু হয়েই চলেছে ৭৮ বছর ধরে। কখনও দ্রুত। কখনও ঢিমেতালে। কিন্তু ধ্বংসের কিনারায় যায়নি কোনওদিন। এই ব্যাপারটা ঠিক সহ্য হয় না পাকিস্তান বাংলাদেশের। তাই খুব রাগ। আর সেই কারণে লক্ষ করেছে তারা যে, একমাত্র দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেওয়াই উপায় ভারতকে থমকে দেওয়ার। দাঙ্গা মানেই সামাজিক অস্থিরতা। দাঙ্গা মানেই নিয়ম করে প্রাণহানি। দু পক্ষেরই মৃত্যু হবে। এসব একবার শুরু হয়ে গেলে ভারত ডুবে যাব। তাই পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং এই জঙ্গি সংগঠনগুলি নতুন প্রজেক্ট নিয়েছে। 
পহেলগাঁওয়ের ঘটনার পর কাশ্মীর একটি বিপ্লব দেখিয়েছে। এই প্রথম গোটা কাশ্মীর রাস্তায় নেমে এসেছে সরাসরি এই ঘটনার বিরুদ্ধে জঙ্গিদের উদ্দেশ্যে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঘৃণা উদ্গীরণ করছে।  হিন্দুস্তান জিন্দাবাদ, পাকিস্তান মুর্দাবাদ, সন্ত্রাস সহ্য করব না এসব স্লোগানে প্রতিদিন সরগরম কাশ্মীর। এই কাজটাই গোটা দেশের মুসলিমদের, গোটা দেশের হিন্দুদের করে যেতে হবে। উগ্র মৌলবাদী মুসলিমদের ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখতে হবে হিন্দুপ্রধান এই ১৪০ কোটির দেশে অযথা জেহাদ টেহাদের কথা ভেবে নির্বোধের মতো মাথা গরম করা ঠিক হবে না। লাভ নেই। আর উগ্র মৌলবাদী হিন্দুদের ভেবে দেখতে হবে যে, দাঙ্গা হলেই পাকিস্তানের লাভ। বাংলাদেশের লাভ। তারা ভাববে ভারতও আমাদের মতো হয়ে গেল। দারুণ ব্যাপার। 
জঙ্গিরা এই প্রথম স্পষ্ট প্রমাণ করে দিল যে, তারা কাশ্মীরেরও বন্ধু না। মুসলমানদেরও বন্ধু নয়। কারণ কাশ্মীরের মানুষের কাছে এই গ্রীষ্মকালের এপ্রিল থেকে অক্টোবরই হল সবথেকে রোজগারের সুসময়। কারণ ট্যুরিস্ট আসে। সুতরাং কাশ্মীরিদের চরম সর্বনাশ করে দেওয়া হল গোটা বছরের জন্য। আবার যেহেতু হিন্দুদের বেছে বেছে মারা হয়েছে, তাই মুসলিম বিদ্বেষ আরও বাড়ছে। এমনকী জঙ্গিদের উপর দেশের মুসলিমদেরও চরম ক্রোধ দেখা যাচ্ছে। 
 ভারত সরকারের কাছে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হল, পহেলগাঁওয়ের হত্যাকারীদের জীবিত পাকড়াও করা। একবার ধরা পড়লে তাদের জেরা করে এবার জানতেই হবে যে, জঙ্গিদের প্রধান উদ্দেশ্য কী? কেন তারা এভাবে বেছে বেছে হিন্দুনিধন করল? তাদের মাস্টারমাইন্ড কারা? এই প্রথম এভাবে পর্যটকদের উপর হামলা করা হল। কারণ কী? রহস্যের সমাধান হওয়া দরকার! আর দরকার এই শিকড়টা উপড়ে ফেলা চিরকালের মতো। অনেক বছর হল! এবার সময় হয়েছে একটা অন্তত এসপার ওসপার করার! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ