প্রাপ্তবয়স্ক মানবদেহে ২০৬টি হাড় থাকে। কিন্তু তাতে দাঁতের স্থান নেই! দেখতে একই রকম হলেও দাঁত কেন হাড় নয়, সেই কারণই জানালেন স্বরূপ কুলভী।
প্রাপ্তবয়স্ক মানবদেহে ২০৬টি হাড় থাকে। কিন্তু তাতে দাঁতের স্থান নেই! দেখতে একই রকম হলেও দাঁত কেন হাড় নয়, সেই কারণই জানালেন স্বরূপ কুলভী।
দাঁত আর হাড় দেখতে প্রায় একই রকম। দুটোই সাদা আর শক্ত। তাহলে কি দাঁতকে হাড় বলা যায়? না, একেবারেই না। দুটোই শক্ত, সাদা আর ক্যালশিয়ামে ভরপুর। এরপরও দাঁতকে কঙ্কালতন্ত্রের অংশ ভাবা হয় না। দাঁত ও হাড়ের বেশ কিছু মিল রয়েছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে দু’টি কিন্তু একেবারেই আলাদা। দাঁত ও হাড়ের সবচেয়ে বড়ো মিল হল দু’টিই ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, ফ্লুয়োরাইড ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো খনিজ দিয়ে তৈরি শক্ত টিস্যু দিয়ে গঠিত। আণবিক গঠনের স্তরে এই খনিজগুলো একটি স্ফটিকের মতো শক্ত কাঠামো তৈরি করে। এজন্য দাঁত ও হাড় মানবদেহের অন্য যেকোনো অঙ্গের চেয়ে বেশি শক্তপোক্ত হয়। ব্যস, মিল বলতে এতটুকুই।
দাঁত ও হাড়ের কাজের তফাত:
এই দু’টির কাজে আকাশপাতাল তফাত। হাড় যে কাজ করে তার সঙ্গে দাঁতের কোনো মিল নেই। এজন্যই দাঁত অস্থি ব্যবস্থার মধ্যে ঠাঁই করে নিতে পারেনি। দাঁত খাবার চিবিয়ে টুকরো টুকরো করে। এতে খাবার পরিপাকতন্ত্রে যাওয়ার উপযোগী হয়ে ওঠে। আবার কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রেও দাঁত সহায়তা করে। তবে প্রথম কাজের জন্য দাঁতকে পরিপাকতন্ত্রের অংশ বলে ধরা হয়। হাড়ের আবার আলাদা কাজ। সেটি শরীরের কাঠামো তৈরি করে। পেশিকে সংযুক্ত রাখার স্থান দেয়। হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিতে বর্মের মতো হয়ে সুরক্ষা জোগায়। শুধু কি তাই? হাড় লোহিত ও শ্বেত রক্ত কণিকার আঁতুড়ঘর। লোহিত কণিকাগুলিই সারা দেহে অক্সিজেন বয়ে নিয়ে গিয়ে পৌঁছে দেয়। রোগ প্রতিরোধ সিস্টেমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে শ্বেত কণিকা। আবার দাঁতের সঙ্গেও একযোগে কাজ করে হাড়। চোয়ালের হাড়গুলি দাঁতকে ধরে রাখে এবং খাবার চিবোতে সাহায্য করে। এক্ষেত্রে দাঁত ও হাড় একসঙ্গে কাজ করে। কিন্তু কাজের ধরনটা আলাদা।
গঠনগত পার্থক্য:
কাজ আলাদা। তাই দু’টির গঠনও ভিন্ন। দাঁতের একেবারে বাইরের অংশকে বলে এনামেল। তা খনিজ সমৃদ্ধ টিস্যুর একটা পাতলা স্তর। তা শরীরের সবচেয়ে শক্ত বস্তু। ক্যালশিয়াম ও ফসফেটের স্ফটিক ঠাসাঠাসিভাবে গঠনের কারণে এটি সহজে ক্ষয়ে যায় না। এই আবরণই দাঁতের সুরক্ষা কবচ। এনামেলের নীচেই থাকে ডেন্টিন। এই অংশ এনামেলের চেয়ে নরম। কিন্তু তাহলেও তা কঠিন। ডেন্টিনই দাঁতের বেশিরভাগ অংশ গঠন করে। এখানে থাকে রক্তনালি ও স্নায়ুর প্রান্তভাগ। দাঁতের একেবারে ভেতরের অংশে থাকে জেলির মতো পাল্প। সেখানে আরও বেশি রক্তনালি থাকে, যা দাঁত ও স্নায়ুকে পুষ্টি জোগায়। এই স্নায়ুগুলি দাঁতের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে।
অন্যদিকে, হাড়ের গঠন দাঁতের থেকে একেবারেই আলাদা। হাড়ের বাইরে থাকে পেরিওস্টিয়াম নামে পাতলা অথচ শক্ত একটা আবরণ। এখানে থাকে রক্তনালি ও স্নায়ু। এগুলি হাড়ের টিস্যুর বৃদ্ধি ও ক্ষত সেরে ওঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পরের স্তরটি তৈরি হয় বেশ নিরেট ও শক্তপোক্ত হাড়ের টিস্যু দিয়ে। হাড়ের একেবারে ভেতরের অংশে থাকে স্পঞ্জের মতো অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত এক ধরনের নরম টিস্যু। এই ছিদ্রগুলিতেই থাকে অস্থিমজ্জা। এখানেই শরীরের নতুন রক্তকণিকা তৈরি হয়।
সক্রিয় আর নিষ্ক্রিয়:
দু’টির গঠন থেকে আমরা জানতে পারে, দাঁতের বাইরের অংশ এনামেলে রক্তনালি ও স্নায়ু থাকে না। কিন্তু হাড়ের ভিতরে ও বাইরে রক্তনালি ও স্নায়ুর একটি জটিল নেটওয়ার্ক ছড়ানো থাকে। এখানেই রয়েছে দাঁত ও হাড়ের ফারাক। একেবারে শিশু অবস্থায় আমাদের শরীরে বিশেষ কিছু কোষ তৈরি হয়। এগুলি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শক্ত হয়ে দাঁতের বাইরের শক্ত অংশ এনামেল তৈরি করে। দাঁত পুরোপুরি গঠনের পর এই বিশেষ কোষগুলি আর থাকে না। এরফলে নির্দিষ্ট বয়সের পর দাঁতে চিড় ধরলে বা ভেঙে গেলে তা আর জোড়া লাগে না বা গজায়ও না। কিন্তু হাড়ের ক্ষেত্রে তা নয়। সেখানে ভাঙাগড়া চলতে থাকে। অস্থিতে একধরনের জীবন্ত কোষ থাকে, যেগুলির কাজ হল পুরানো টিস্যু ভেঙে নতুন তৈরি করা। সেকারণে হাত বা পায়ের কোনো হাড় ভেঙে গেলে তা সেরে ওঠে। এজন্যই বোধহয় চলতি কথায় বলে, ‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বোঝা উচিত।’