সলমন ও শাহরুখ খান অভিনীত ‘করণ-অর্জুন’ সিনেমাটি তো অনেকেই দেখেছেন। খুন হওয়ার পর পুনর্জন্ম নিয়ে খুনিদের মেরে প্রতিশোধ নিয়েছিলেন দুই নায়ক। তবে সেলুলয়েডে তুলে ধরা এমন ঘটনাগুলিকে পাত্তা দিতে রাজি নন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা স্বীকৃতি না দিলেও অবশ্য বাস্তবে বেশ কিছু এমন ঘটনার হদিশ মিলেছে। প্রথম যে ঘটনাটি গোটা দেশে সাড়া ফেলে দিয়েছিল, সেটি ঘটেছিল রাজধানী দিল্লিতে। শান্তি দেবীর জন্ম হয়েছিল ১৯২৬ সালের ১১ ডিসেম্বর। চার বছর বয়স পর্যন্ত মেয়েটি চুপচাপই থাকত। কিন্তু একটু বড়ো হতেই সে বলতে শুরু করে, এটা তার বাড়ি নয়। সে নাকি এর আগে মথুরায় জন্মেছে। গত জন্মে তাঁর নাম ছিল লুকদি দেবী। তাঁর স্বামী ও সন্তান রয়েছে। মথুরায় তাঁর শ্বশুরবাড়ি। স্বামীর নাম কেদারনাথ চৌবে। তিনি একজন ব্যবসায়ী। পাঁচ বছরের শিশুকন্যা শান্তির মুখে এসব কথা শুনে অভিভাবকরা প্রথমে তা বিশ্বাস করতে চাননি। কিন্তু পরে শান্তি দেবীর বাবা মথুরায় খোঁজখবর নিয়ে দেখেন, মেয়ে যা বলেছে সেটা একেবারেই সঠিক। লুকদি দেবী ১৯০২ সালে মথুরায় জন্মেছিলেন। ১০ বছর বয়সে কাপড়ের ব্যবসায়ী কেদারনাথের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। মাত্র ২৩ বছর বয়সে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে লুকদি দেবীর মৃত্যু হয়েছিল। সেটাও সাত বছর আগের ঘটনা। শান্তি দেবীর বাবার কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর খবরটি জানার পরে ব্যবসায়ী কেদারনাথ স্বয়ং দিল্লিতে আসেন। তাঁকে ও লুকদি দেবীর সন্তানদের চিনতে পারেন ছোট্ট শান্তি। ব্যাপারটি সকলে অবাক করে দেয়। কেদারনাথের মনেও বদ্ধ ধারণা হয়, তাঁর প্রয়াত স্ত্রীই ফিরে এসেছেন শান্তি দেবী রূপে।
এই ঘটনার খবর পৌঁছে গিয়েছিল স্বয়ং মাহাত্মা গান্ধীর কানে। তিনি নিজে ব্যাপারটি তদন্ত করে দেখতে একটি কমিশন গঠন করেন। ১৯৩৫ সালের ১৫ নভেম্বর কমিশনের সদস্যরা শান্তি দেবীর বাড়িতে যান। বেশ কয়েকমাস ধরে তাঁরা ছোট্ট মেয়েটিকে গত জন্মের ঘটনা নিয়ে নানারকম প্রশ্ন করে তা মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেন। ১৯৩৬ সালে পেশ করা কমিশনের রিপোর্টে শান্তি দেবীর পুনর্জন্মের বিষয়টি মেনেও নেওয়া হয়।
এ তো গেল ভারতের ঘটনা। বিদেশেও এমন উদাহরণের কমতি নেই। মার্কিন বালক এডওয়ার্ড অস্ট্রিয়ানের পুনর্জন্মের ঘটনাটিও প্যারাসাইকোলজির গবেষণায় এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিষয়। মাত্র চার বছর বয়সি এই বালকের অতীত জীবনের স্মৃতি ও শারীরিক সমস্যার কথা গবেষকদেরও বিস্মিত করেছে। গোড়ায় নিজের মাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কথা বলতে শুরু করে এডওয়ার্ড। দাবি করে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সে একজন সৈনিক ছিল। বৃষ্টি হলে কিংবা মেঘলা দিনে খুব ভয়ও পেত। মাকে বলত, যুদ্ধে গলায় গুলি লেগেছিল তার। গলার সেই জায়গাটাতেই বড্ড ব্যথা করছে। প্রথমে তাঁর বাবা মা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু বারবার একই কথা বলায় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় ছোট্ট এডওয়ার্ডকে। কিন্তু চিকিৎসক বারবার পরীক্ষা করেও তাঁর টনসিলে কোনো সমস্যা খুঁজে পাননি। পরে অবশ্য এডওয়ার্ডের গলায় সিস্ট দেখা দেয়। কোনো চিকিৎসাতেই সেটি ভালো হচ্ছিল না। প্যারাসাইকোলজির গবেষকরা তাঁর অতীতের জীবনের কথা শুনে, তা নিয়ে খোঁজখবর শুরু করেন। দেখা যায়, তা অনেকাংশেই মিলে যাচ্ছে। এরপরে আরও একটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। সে অতীত জীবনের কথা যত বলতে থাকে, তত গলায় ব্যথা বাড়তে থাকে। কিন্তু শেষপর্যন্ত একদিন হঠাৎ করেই তার গলার সেই সিস্ট মিলিয়ে যায়।
এবার আসি আর এক মার্কিন শিশু জেমস লিলিনজারের কথায়। ১৯৯৮ সালের ১০ এপ্রিল জন্ম। জন্মের পর তাঁর মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল না। আমেরিকার টেক্সাসে থাকার সময় বাবার হাত ধরে ডালাসে সেনাবাহিনীর একটি জাদুঘরে যায় জেমস। সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিডিয়ো দেখে বাবার কাছে বায়না করে একটা ছোটো খেলনা প্লেনও কিনে আনে। আর পাঁচটা শিশুর যেমন করে থাকে আর কী! কিন্তু ওই জাদুঘর দেখে ফিরে আসার দু’মাসের মধ্যে ঘটে যায় এক অস্বাভাবিক ঘটনা। সে প্রায়ই প্লেনে আগুন লেগেছে বলে চিৎকার করতে থাকে। অভিভাবকরা প্রথমে বিষয়টিকে মজা বলে ধরে নেয়। কিন্তু জেমস বারবার একই কথা বলতে থাকে। কোন প্লেনে আগুন লেগেছে? জিজ্ঞাসা করলে সে বলে, যুদ্ধবিমানে! সঙ্গে আরও জানায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সে যুদ্ধবিমান চালাত। তাঁর নাম ছিল জেমস হাসটন জুনিয়র। ক্রসএয়ার ফাইটার নামে এক যুদ্ধবিমান চালানোর সময় হঠাৎ সেটির ইঞ্জিন বিগড়ে গিয়েছিল। আসলে জাপানে তাঁর বিমানকে গুলি করে নামানো হয়েছিল। গুলি লাগার সঙ্গে সঙ্গে বিমানে আগুন ধরে যায়। বিমানটি মাটিতে আছড়ে পড়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়। ছোট্ট জেমসের মুখে এই কাহিনি শুনে তার বাবা অবাক হয়ে যান। প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও পরে খোঁজ নিয়ে দেখেন, ১৯৪৫ সালে সত্যিই এরকম একটা যুদ্ধবিমান আছড়ে পড়েছিল। তার পাইলটের নাম ছিল জেমস হাসটন। বিষয়টি তিনি অন্যদের জানান। জেমস লিলিনজারকে নিয়ে আলোড়ন পড়ে যায়। একের পর এক এরকম ঘটনা সত্যিই মানুষের মৃত্যুর পর পুনর্জন্মের কোনো অধ্যায় রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নকেই উসকে দেয়। যদিও বিজ্ঞান পুনর্জন্মের তত্ত্বকে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু কীভাবে এটা সম্ভব, সেই প্রশ্নের উত্তর আজও খুঁজে চলেছেন গবেষকরা। একদিন হয়তো তার উত্তর মিলবে। সেই সূত্র ধরেই উদ্ঘাটন হবে জন্ম-মৃত্যুর রহস্য।