না, এ গল্পে কোনো ফেলুদা নেই। তবে চার বছরের টিটুর সঙ্গে ‘সোনার কেল্লা’র মুকুলের বড্ড মিল। পূর্বজন্মে খুন করা হয়েছিল তাকে। কীভাবে ধরা গেল খুনিকে? সেই কাহিনি, সঙ্গে আরও কিছু ঘটনার বৃত্তান্ত লিখেছেন বিভাস মজুমদার
না, এ গল্পে কোনো ফেলুদা নেই। তবে চার বছরের টিটুর সঙ্গে ‘সোনার কেল্লা’র মুকুলের বড্ড মিল। পূর্বজন্মে খুন করা হয়েছিল তাকে। কীভাবে ধরা গেল খুনিকে? সেই কাহিনি, সঙ্গে আরও কিছু ঘটনার বৃত্তান্ত লিখেছেন বিভাস মজুমদার
গত জন্মের স্ত্রী-সন্তানদের কথা কি আপনার মনে আছে? বা আপনার গত জন্মের খুনিদের কি এই জন্মে চিনে ফেলতে পারবেন? শুনে মনে হতে পারে, কী সব আজগুবি প্রশ্ন করছি। সাধারণভাবে এটা অবাস্তব মনে হতেই পারে। কিন্তু বাস্তব জীবনে এমন ঘটনার নজির রয়েছে। পূর্বজন্মের কথা আপনার জানা না থাকলেও গতজন্মের স্ত্রী-সন্তান, এমনকি খুনিদেরও এজন্মে খুঁজে বের করেছেন আগ্রার এক অধ্যাপক। ডঃ তোরণ সিং চাহার। তাঁর জীবনের এই ঘটনাই তাঁকে সাধারণের কাছে ‘জাতিস্মর’ করে তুলেছে। চলচ্চিত্রে ‘সোনার কেল্লা’র মুকুল চরিত্রটি কাল্পনিক হলেও তোরণ সিং এর জীবনকাহিনি একেবারে ঘোর বাস্তব।
১৯৮৩ সালের ১২ ডিসেম্বর। উত্তরপ্রদেশের আগ্রা থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে বারগাঁওয়ে জন্ম হয় ডঃ তোরণ সিং চাহারের। আদর করে সবাই ডাকতেন টিটু নামে। ছ’জন ভাইবোনের মধ্যে টিটুই সবচেয়ে ছোটো। টিটুর বয়স তখন মাত্র চার বছর। সেই সময় টিটুর মধ্যে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন পরিবারের লোকজন। ছোটো থেকেই মেজাজ তুঙ্গে থাকত টিটুর। কারণে-অকারণে জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলত সে। নিজের সঙ্গে একনাগাড়ে কথা বলে যেত। কারও সঙ্গে বিশেষ মেলামেশা করত না। পরিবারের লোকজনকে বলত, আমার এখানে জন্ম নয়। তোমরা আমাকে এখানে রেখে দিয়েছ ঠিকই, তবে আমার বউ-বাচ্চা আছে। ওরা কেমন আছে, বাবাকে খোঁজ নিতে বল। প্রথমদিকে টিটুর কথাগুলি আজগুবি বলে মনে করতেন পরিবারের লোকজন। গ্রামের লোকেরা ভাবতেন, টিটুকে ভূতে ধরেছে। কারণ, টিটুর কথাবার্তা ছোটোদের মতো নয়। কিন্তু দিন যত এগতে লাগল, ততই টিটু স্ত্রী ও সন্তানদের দেখার জন্য অস্থির হয়ে উঠল। একসময় সে বলতে থাকে, ‘আমার এখানে বাড়ি নয়। আমি আগ্রা শহরে জন্মেছি। সেখানে ব্যবসা করতাম। আমার নিজের রেডিয়ো সারানোর দোকান রয়েছে। আমার নাম সুরেশ ভার্মা। দোকানের নাম সুরেশ রেডিয়ো। স্ত্রীর নাম উমা। দুই ছেলের নাম রোমু এবং সোমু। আমার আসল বাবা-মা ওদের সঙ্গেই থাকে। আমার গাড়ি রয়েছে। আমাকে ওখানে নিয়ে চল। আমাকে দু’জন খুন করেছিল। ওদের আমি কিছুতেই ছাড়ব না।’
এতটুকু ছেলের মুখে বারবার এসব কথা শুনে তাঁর বাবা মহাবীর প্রসাদ সিং ও মা শান্তিদেবী দু’জনেই বিচলিত হয়ে পড়েন। তাঁরা ঠিক করেন, ছেলে যা বলছে, তা সত্যি কি না, একবার পরীক্ষা করে দেখবেন। যদি ছেলের কথা ঠিক না হয়, তবে তাঁকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাবেন। টিটু যা বলছে, তার খোঁজে বড়ো ছেলেকে আগ্রা শহরে পাঠান তিনি। টিটুর বড়দা আগ্রা শহরের বিভিন্ন লোকের কাছে সুরেশ রেডিয়ো নামে কোনো দোকান আছে কি না, তা জিজ্ঞাসা করতে থাকেন। সারাদিন ঘোরার পর যখন ক্লান্ত হয়ে আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন, সেই সময় হঠাৎই শহরের একটি গলির মধ্যে সেই দোকানের সন্ধান পান। দোকানের হোর্ডিংয়ে সুরেশ রেডিয়ো নাম দেখে চমকে ওঠেন। চমক অবশ্য তখনই শেষ হয়নি। দোকানে এক মাঝবয়সি মহিলাকে দেখে জিজ্ঞাসা করেন, আপনার নাম কি উমা ভার্মা? তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমিই উমা ভার্মা।’ একথা শুনে দোকানের সামনেই বসে পড়েন টিটুর দাদা অশোক সিং। ওই মহিলা টিটুর দাদাকে পালটা প্রশ্ন করেন, কেন তিনি তাঁর নাম জানতে চাইলেন। টিটুর বড়দা সব খুলে বলেন। ওই মহিলা এসব কথা শুনে টিটুর দাদাকে তাঁদের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে টিটুর গতজন্মের বাবা চন্দাবাবু ভার্মা ও মা রাজকুমারী দেবীর সঙ্গে দেখা করেন। টিটুর দুই ছেলে রোমু ও সোমুর সঙ্গেও তাঁর দেখা হয়। ঠিক হয়, টিটুকে এই বাড়িতে আনা হবে। পরীক্ষা করে দেখা হবে, সত্যি সে সকলকে চিনতে পারছে কি না।
বাড়ি ফিরে সব কথা বাবাকে জানান টিটুর বড়দা। দু’দিন পর টিটুকে নিয়ে তাঁর বাবা ও দাদা ফের আগ্রা শহরে রওনা হন। শহরের ওই দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ইচ্ছে করেই চালককে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিতে বলেন টিটুর দাদা। চোখের সামনে সুরেশ রেডিয়োর দোকানের গলি পেরিয়ে যেতেই গাড়ির মধ্যে থেকে টিটু চিৎকার করে ওঠে। ‘আমার দোকানের গলি পেরিয়ে গিয়েছে। গাড়ি পিছতে বল।’ এরপর সেই গলির সামনে গাড়ি দাঁড়াতেই সে নেমেই দোকানের দিকে ছুটে যায়। দোকানের ভিতরে ঢুকে গত জন্মের স্ত্রীর কাছে গিয়ে বলে, ‘উমা কেমন আছো? আমাদের ছেলেদের খবর কী? দোকানের এদিকে একটা শো-কেস ছিল, সেটা কোথায় গেল?’ এসব শুনে হতবাক হয়ে যান উমা ভার্মা। একটু ধাতস্থ হয়ে তিনি টিটুকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি কে?’ টিটু সঙ্গে সঙ্গে বলে, ‘আমি সুরেশ ভার্মা। আমাকে চিনতে পারছ না? এরপর আর কথা না বাড়িয়ে টিটুকে নিয়ে উমা সোজা বাড়িতে যান। বাড়ি পৌঁছেই সে গত জন্মের মায়ের কাছে চলে যায়। বাবাকেও চিনে ফেলে। ছেলেদের যাতে চিনতে না পারে, সেজন্য তাঁদের বাড়ির বাইরে খেলতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সকলকে অবাক করে সে নিজের ছেলেদেরও খুঁজে বের করে। বলে ওঠে, ‘রোমু, সোমু কাছে আয়। তোদের কতদিন দেখিনি।’ উমা এবং তাঁর পরিবারের লোকেরা বিশ্বাসও করে নিয়েছিলেন যে, সুরেশই আবার টিটু হয়ে জন্ম নিয়েছে। টিটুর এই কাহিনি এলাকার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তেই সকলে তাঁকে দেখতে ছুটে আসে।
টিটু বলেছিলেন, আগের জন্মে তিনি খুন হয়েছিলেন। কীভাবে খুন হন তিনি? তোরণ সিং ওরফে টিটু জানিয়েছেন, স্ত্রী, সন্তান ও বাবা মাকে নিয়ে আগ্রা শহরে একটি বাংলো বাড়িতে থাকতেন তিনি। বেশ সচ্ছল পরিবার ছিল তাঁদের। বেশ সুখেই দিন কাটছিল। কিন্তু ১৯৮৩ সালের ২৮ আগস্ট সন্ধ্যায় দোকান থেকে গাড়ি চালিয়ে ফেরার সময় দুই দুষ্কৃতী এসে তাঁকে গুলি করে। পরপর দু’টি গুলি তাঁর মাথা ফুঁড়ে বেরিয়ে যায়। বাড়ির কাছেই খুন হন তিনি। ঘটনার তদন্তে নেমে সুরেশের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে দু’জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জেরায় তাঁরা সুরেশকে খুনের কথা স্বীকারও করে। জানা যায়, ব্যবসায়িক শত্রুতার জেরেই সুরেশকে তাঁর দুই বন্ধু খুন করে। বেশ কিছুদিন মামলা চলার পর খুনের অপরাধে তাঁদের সাত বছরের জেলের নির্দেশ দেয় আদালত। এদিকে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় সুরেশ ওই খুনিদের একজনকে চিনে ফেলেছিল।
১৯৯০ সালে ওই খুনিরা সাজা কাটিয়ে জেল থেকে বেরিয়ে টিটুর খবর জানতে পারে। কিন্তু তাদের হাতে খুন হওয়া সুরেশ ভার্মা এই জন্মে তোরণ সিং নামে পরিচিত হয়েছে, সেটা তারা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেনি। তাই আর পাঁচজনের মতো তারা টিটুর সঙ্গে বন্ধুত্বের বাহানায় এক অনুষ্ঠানে দেখা করতে আসে। সেই সময় এক অবাক করা ঘটনা ঘটে। টিটু ওই খুনিদের সঙ্গে হাত মেলানোর সময় তাদের মুখ দেখে একজনকে চিনে ফেলে। তোরণ সিং নিজেই জানিয়েছেন, ওদের দেখে আবার অদ্ভুতভাবে আমার সেদিনের ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়। গতবার আমার জন্ম হয়েছিল ১৯৫৫ সালে। কিন্তু কোন তারিখে তা আমার মনে নেই। কিন্তু আমি খুন হওয়ার তারিখ ও দিনটি এখনও মনে করতে পারি। আর ওদের একজনকে আমি মৃত্যুর মুহূর্তে দেখেছিলাম। তাই এত বছরেও সেই মুখ চিনতে অসুবিধা হয়নি। সেদিন টিটু সকলের সামনে চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘তোরা তো আমায় খুন করেছিলি। তোদের আমি ছাড়ব না।’ সেই দুই খুনি প্রথমে হতবাক হয়ে যায়। সম্বিত ফিরতেই তাঁরা টিটুর পায়ে পড়ে যায়। ক্ষমা করে দিতে বলে। তারা যে সাত বছর জেলে ছিল, সেকথাও জানায়। তবে এই ঘটনার পর আর কোনোদিন তারা টিটুর আশেপাশে আসেনি।
একসময় গোটা দুনিয়ায় সাড়া ফেলে দেওয়া সেই পাঁচ বছরের টিটু এখন হরিদ্বারে পতঞ্জলি বিশ্ববিদ্যালয়ে শারীরবিদ্যা ও যোগ ব্যায়ামের ডিন। এর আগে ছিলেন বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরবিদ্যা ও যোগার অধ্যাপক। অতীতের সেই ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, চার বছর বয়স থেকেই তাঁর আগের জন্মের ঘটনার কথা মনে আসে। তাঁর নিজের মনের মধ্যেও এনিয়ে প্রশ্ন ছিল। কীভাবে তিনি এখানে জন্মালেন তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। এখন অবশ্য সেই অতীতের টানেই তিনি পূর্বজন্মের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। যদিও এখনকার স্ত্রী, সন্তান নিয়ে হরিদ্বারে বসবাস করেন। তবে সময় পেলেই পূর্বজন্মের সেই বাড়িতে যান। সেই সুরেশ রেডিয়োর দোকান অবশ্য আর নেই। সেই দোকানটি এখনও লিজ দেওয়া হয়েছে। আর স্ত্রী জীবিত থাকলেও দু’জন্মের বাবা-মা প্রয়াত হয়েছেন। সেই রোমু ও সোমুও আজ ব্যবসা করছেন।
এই ঘটনার কথা শুনে মনে হতেই পারে, এটা কোনো বলিউড বা টলিউডের সিনেমার গল্প। কিন্তু তা নয়। এ একেবারেই সত্যি ঘটনা। সাধারণভাবে পুনর্জন্মের কথা শুনলেই আমাদের মনে আসে সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লা ছবির মুকুল বা সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘জাতিস্মর’-এর কুশল হাজরার কথা। অথচ বাস্তবে মাত্র পাঁচ বছর বয়সের একটা বাচ্চা ছেলে টিটু নিজের গত জন্মের খুনিদের চিনিয়ে দিয়ে রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিয়েছিল সারা বিশ্বে। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিদেশি সংবাদমাধ্যমও ব্যাপারটা আরও বিস্তারিত জানতে ছুটে এসেছিল ভারতে। নিজের জীবনের সেই কথাই জানিয়েছেন তোরণ সিং চাহার ওরফে টিটু। কিন্তু আদৌ পুনর্জন্ম বলে কি কিছু আছে? সেই প্রশ্নটাই আরও একবার ঘোর বাস্তবের সামনে নিয়ে এসেছে।
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : সত্যেন্দ্র পাত্র