Bartaman Logo
৪ অক্টোবর, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

জঙ্গলে এক রাত

আমার বন্ধু তাপসের বাড়ি উত্তরবঙ্গের মাদারিহাটে। তাপসের কাছেই ওখানকার গল্প শুনি। জায়গাটা একদমই জঙ্গল ঘেঁষা।

জঙ্গলে এক রাত
  • ৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমি মিত্র রায়: আমার বন্ধু তাপসের বাড়ি উত্তরবঙ্গের মাদারিহাটে। তাপসের কাছেই ওখানকার গল্প শুনি। জায়গাটা একদমই জঙ্গল ঘেঁষা। জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের কথা কত শুনেছি, আগে দেখার সৌভাগ্য হয়নি কখনো। ইনফ্যাক্ট কোনো জঙ্গলই আমার দেখা হয়নি। একবার শুধু বেথুয়াডহরি জঙ্গলে গেছিলাম, ওখানে এক দুটো হরিণ ছাড়া আর কোনো জন্তু-জানোয়ার নেই। ওই জঙ্গলের গল্প শুনে তাপস বলে, ‘এর সঙ্গে তুই দয়া করে উত্তরবঙ্গের জঙ্গলকে গুলিয়ে ফেলিস না ভাই, তোর কোনো ধারণা নেই আমরা কীভাবে থাকি। আমাদের ওখানে প্রায়ই হাতি এসে বাড়িঘর ভেঙে দেয়, রান্নাঘরের দরজা ভেঙে ঢুকে ভাতের হাঁড়ি নিয়ে চলে যায়।’

Advertisement

আমি ওকে খেপানোর জন্য বললাম, ‘আর তোকে হাতি সুড়সুড়ি দিয়ে যায়?’
‘সুড়সুড়ি কী রে? পেঁচিয়ে তুলে নিয়ে যায়! ওখানে থাকতে গেলে দম লাগে, তোরা ওসব পারবি না।’ 
‘হুহ, কত এসেছেন সাহস দেখাতে।’
‘এসেছেন মানে? সিরিয়াসলি ওখানে থাকতে গেলে বুকের পাটা লাগে। চাইলাম আর সন্ধেবেলা নাচতে নাচতে বেড়াতে চলে গেলাম, তা হয় না বন্ধু।’ 
তাপসের কাছে ভাঙলাম তাও মচকালাম না।
‘শোন, আমার সঙ্গে ছুটিতে চল। উত্তরবঙ্গ ভীষণ সুন্দর। আর আমার বাড়ি তো জঙ্গলের পাশেই, তোকে আর হোটেলে থাকতে হবে না।’
 ভাবলাম ভালোই হবে। ক’দিনের জন্য ছুটি কাটিয়ে আসা যাবে। সে ভেবেই চলে গেলাম। দেখলাম তাপসের কথা এক বর্ণ মিথ্যা নয়। ঠিক জলদাপাড়া জঙ্গলের ঢোকার রাস্তার উলটোদিকে ওদের বাড়ি। একতলা কাঠের বাড়ি।  
তাপস বলল, ‘মাঝে মাঝেই হাতি বেরয়। এখানকার সব মানুষেরই হাতির অভিজ্ঞতা রয়েছে। ব্যাপারটা গায়ে সওয়া হয়ে গেছে এখন। তবে তটস্থ থাকতে হয়, সব সময়, বুঝলি?’
‘তুই কি ভেবেছিস, আমি ভয় পেয়েছি? তবে তো আসতামই না।’ 
‘গুড। মা-বাবা তোকে দেখলে খুব খুশি হবে। কত কী রান্না করেছে মা।’
কিন্তু ঢোকার পর তাপসের মা-বাবাকে গম্ভীর মুখ করে কিছু আলোচনা করতে দেখা গেল। ওদের দেখে ম্লান হেসে মাসিমা বললেন, ‘এসেছিস বাবা তোরা? কোনো অসুবিধা হয়নি তো?’ 
‘না মা, সব ঠিক আছে। কিন্তু তোমাদের মুখটা এমন থমথমে হয়ে আছে কেন?’
বাবা বলল, ‘কী যে বলি, তোরা এসেছিস আর এমনই ভাগ্য যে...।’ 
‘কী হয়েছে বল!’ 
‘তোর দিদার শরীর খুব খারাপ হয়েছে । আমাদের এক্ষুনি বেরিয়ে যেতে হবে শিলিগুড়িতে। তোর কথা বারবার বলছে দিদা। তুইও যেন অবশ্যই সঙ্গে আসিস।’ 
তাপস অবাক চোখে আমার দিকে তাকাল।
‘আগে জানলে তোকে ফোন করে দিতাম, তাহলে তোদের আর এতদূর আসতে হত না। ট্রেন থেকে সোজাসুজি শিলিগুড়িতেই চলে যেতিস।’
‘তাতে কী মা? দিদা যখন অসুস্থ আমাদের যেতে হবে। তবে বেচারা ওকে একটা দিন একলা থেকে যেতে হবে এখানে। কালই আমি চলে আসব দুপুরের মধ্যে। কি রে পারবি তো?’ 
আমি মুখে কিছু বললাম না। আস্তে করে একটা ছোট্ট ঢোক গিলে বললাম, ‘হ্যাঁ পারব না কেন? এটা কোনো ব্যাপার?’ 
এদিকে মনে মনে ভাবছি তাপসের দিদা অসুস্থ হওয়ার আর সময় পেল না? এই ঘন জঙ্গল ঘেঁষা এলাকায় আমাকে একা থাকতে হবে!
মাসিমা বলে গেলেন, সব রান্না করা আছে খেয়ে নিতে। 
ওদের গাড়ি রওনা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফাঁকা হয়ে গেল গেটের বাইরেটা। আর তার জায়গায় ফুটে উঠল উলটো দিকের ঘুটঘুটে অন্ধকার জঙ্গল। দুপুরবেলাতেই এত গহিন কালো। রাতে তবে কেমন হবে? মনে হচ্ছে আমাজনকে চারটি গোল দিয়ে দিতে পারে জলদাপাড়া। ধ্যাত, সব ভাগ্যের দোষ। 
নিজের ভাগ্যকে চূড়ান্ত মাত্রায় গালমন্দ করে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। তাপস অবশ্য বলেছিল যে, কে এক বিশ্বস্ত লোক আছে যিশুভাই নামে, আদিবাসী লোক, কানে শোনে না। তাঁকে পাঠিয়ে দেবে, রাতে এসে আমাকে পাহারা দেবে। 
আমি অতিরিক্ত সাহস দেখিয়ে বলে ফেলেছি, ‘কোনো লোক লাগবে না। আমাকে কি বোকা পেয়েছিস? আমি একাই একশো।’
এদিকে ক’দিন আগেই আমি এমন একটা ভয়ের সিনেমা দেখেছি যে, উঠতে বসতে সেই সিনেমার দৃশ্যগুলো মনে আসছে। যাইহোক, বিকেলবেলা একটু এদিক-ওদিক ঘুরতে বেরলাম। ছুটির দিন না হওয়া সত্ত্বেও রাস্তাঘাট বেশ ফাঁকা ফাঁকা। এমনিতেই ছোটো জায়গা, যাও দু’-তিনটে দোকান ছিল সেগুলোর ঝাঁপ বন্ধ। মোবাইলে দেখলাম সাড়ে ছ’টা, এর মধ্যেই রাস্তাঘাট শুনশান। চা দোকানটা বন্ধ হবে হবে করছে। চা দোকানি তাড়াহুড়োয় চা দিয়ে বলল, ‘ভাই তাড়াতাড়ি খেয়ে বাড়ি চলে যাও।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘তাড়াতাড়ি চলে যাব কেন?’ 
‘উমা, জানো না? কয়েকদিন ধরে একটা মদ্দা হাতি খুব জ্বালাচ্ছে। বেটা দল ছুট, এইগুলোই ডেঞ্জারাস। সামনে পড়লে হয়েছে, জয় বাবা মহাকাল-এর জয়,’ বলে কপালে হাত-ঠেকালো লোকটি। 
মনে মনে বললাম, যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়। এখানে শুধু বাঘের জায়গায় ‘হাতি’ হবে। ঘুরেফিরে এমন সময় এলাম, যখন বিপদ একেবারে দোরগোড়ায়। আর কী, কপালকে ‘যত দোষ নন্দ ঘোষ’ বলে তাড়াতাড়ি বাড়িতে ঢুকে ছিটকিনি তুলে নিশ্চিন্ত। 
....
যত রাত বাড়ছে তত একটা অজানা ভয় ঘিরে ধরতে শুরু করল আমায়। একদম নিশুতি রাত। জঙ্গল, রাস্তা, আকাশ আলাদা করে বোঝার উপায় নেই। 
এর মাঝে তাপস ফোন করে বলল, ‘দিদা এখন ভালো আছে। আগামী কাল সকাল সকালই রওনা দিয়ে দেব, রাতটা শুধু একটু কষ্ট করে কাটিয়ে দে ভাই।’
নানান অজানা জন্তুর চিৎকার ভেসে আসছে উলটো দিকের জঙ্গল থেকে। অন্ধকার যেন গিলে খেতে চাইছে এলাকাটাকে। আমি চেষ্টা করছি, যতটা সম্ভব অন্যদিকে মন দেওয়ার। মোবাইলে খুট খাট শুরু করলাম। আর আরও আশ্চর্যের বিষয় হল পৃথিবীর যত ভয়ংকর গল্প বা সত্য ঘটনা সব পরপর দেখানো শুরু করল মোবাইলে। কোথায় কোন বাড়িতে ভূতুড়ে কাণ্ডকারখানায় সেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে বাড়ির লোক। অথবা এক মহিলার অবয়ব ঘুরে বেড়াচ্ছে!
অতি কষ্টে মনটাকে অন্য দিকে দিয়ে অবশেষে ঘুম নেমে এসেছিল। কিন্তু একটা ঝাকুনি আর শব্দের প্রাবল্যে ঘুম ভেঙে গেল। 
স্বপ্ন নয়। বাইরে একটা বিশাল আওয়াজ, মনে হচ্ছে কোনো বিরাটকার জন্তু ধাক্কা দিচ্ছে, এক্ষুনি দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে পড়বে। শব্দটা যেন হাতুড়ির মতো বুকে এসে ধাক্কা দিচ্ছে আমায়। 
হৃদযন্ত্রের গতি অসহ্য রকমের বেড়ে গেল, মনে হচ্ছে এখনই হার্টফেল করব। কাঠের দরজা যেন ধুলোর মতো গুঁড়ো হয়ে পড়ে যাবে আর তার মধ্যে চাপা পড়ে থাকব আমি। কেউ আর আমার শরীরের কোনো অংশই খুঁজে পাবে না। 
শুধু মায়ের কথাই মনে হচ্ছে আমার, আর কিছু না। মা বলেছিল, ‘তুই ঘুরে আয় তারপর তোর প্রিয় কচি পাঠার ঝোল বানাব, সঙ্গে নলেন গুড়ের পায়েস।’ 
ভাবতে ভাবতে জিভে জল আসার বদলে চোখে জল এল আমার। মা, মা গো!
থর থর করে কাঁপছি বিছানায় বসে। কী করব বুঝতে পারছি না। মোবাইল নিয়ে লাফ দিয়ে খাটের তলায় ঢুকে পড়লাম। আওয়াজটা যেন এবার আরও বেশি। দরজা জানলা সব এই মুহূর্তেই ভেঙে পড়বে। কে আছ বাঁচাও আমাকে! তাপসকে ফোন করলাম। 
কী রে, রাত দুটোয় ফোন করছিস যে! 
ভ্যা করে কেঁদে ফেললাম, আমাদের পাশের বাড়ির নান্টুদার দু’বছরের বাচ্চাটার মতো।
তাপস উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘এ কী রে, কী হয়েছে বলবি তো!’
‘দরজার বাইরে শব্দ, বাড়ি মারছে, ঘর কাঁপছে থরথর করে, এখনই ঢুকে পড়বে আর আ...মি!’
‘কী ঢুকে পড়বে?’ 
‘হা হাতি, বাইসন! তার চেয়েও বড়ো কোনো জানোয়ার! বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাঁদের পাহাড়ের ভয়ংকর জন্তু বুনিপ নিশ্চয়ই আছে এখানে?’
‘শান্ত হ, ওসব গল্প। আমার মনে হয় তুই খুব ভয় পেয়েছিস। ওরকম কিছু হবে না, কাঠের দরজা পোক্ত। হাতি ছাড়া কোনো জন্তুর ক্ষমতা নেই ভাঙার, তবে আমার সন্দেহটা অন্য জায়গায়। ফোনটা নিয়ে দরজার সামনে যা।’
‘কী বলছিস? আমি ওখানে যেতে পারব না, আমি এখানেই ঠিক আছি। সকাল হওয়া পর্যন্ত যদি বেঁচে বর্তে থাকি তবে দেখা হবে তোর সঙ্গে । ভালো থাকিস ভাই...।
ফোন কেটে গেল। দেখলাম চার্জ শেষ। এটাই বাকি ছিল আর এখন উঠে গিয়ে চার্জ দিতে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। 
তবু কী মনে হল বিকট হাড় হিম করা শব্দের প্রাবল্যের মধ্যে সাহস করে খাটের তলা থেকে বেরিয়ে এলাম। দুরু দুরু বক্ষে বাইরের ঘরে এলাম। মায়ের আদর, ঠাকুমার কোলে শোয়া— এগুলো যেন বড়ো বেশি মনে আসতে লাগল। শব্দটা এখন আরও বেশি বুকে হাতুড়ি পেটার মতো বাজছে। সাহস সঞ্চয় করে জানলার একটা পাল্লা খুললাম অতি সন্তর্পণে। 
ওদের বাড়ির বাইরে একটা ছোট্ট ঘর আছে, গ্যারেজের মতো। সেখানে একটা কম পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। দেখতে পেলাম একজন লোক সেই ঘরের মেঝেতে তোষক পেতে চিত হয়ে শুয়ে রয়েছে। আর তার প্রতিটি নিঃশ্বাস নেওয়া আর ফেলার সময় তার নাসিকা গহ্বর থেকে যে অ্যাটম বোম পড়ার শব্দ হচ্ছে তা রীতিমতো কোনো একটি দেশকে  নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। 
হাঁ হয়ে রইলাম। 
পরে তাপস বলেছিল, ‘তোকে বলা হয়নি, যিশুভাইকে খবর দেওয়াতে ও চলে এসেছিল রাতে শুতে। তোর অসুবিধে হবে ভেবে ও আর রাতে ডিস্টার্ব করেনি। ওর কাছে বাইরের ঘরটার চাবি থাকে, নিজেই এসে শুয়ে পড়েছিল। আর হ্যাঁ, ওটাই তোকে বলতাম তখন, ফোনটা কেটে গেল বলে বলতে পারিনি। যিশুভাই ভয়ংকর নাক ডাকে। ইস, কেন যে তোকে আগে বলিনি!’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ