Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পাক সেনাপ্রধানদের আমেরিকার এত পছন্দ কেন?

ষাটের দশকে পাকিস্তান শাসন করতেন জেনারেল আইয়ুব খান। সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতা দখল করেন এবং নিজেকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করেন। এই পদটি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদ, যে পদটি বহু ঔপনিবেশিক দেশ স্বাধীনতার পর গ্রহণ করেছিল।

পাক সেনাপ্রধানদের আমেরিকার এত পছন্দ কেন?
  • ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: ষাটের দশকে পাকিস্তান শাসন করতেন জেনারেল আইয়ুব খান। সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতা দখল করেন এবং নিজেকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করেন। এই পদটি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদ, যে পদটি বহু ঔপনিবেশিক দেশ স্বাধীনতার পর গ্রহণ করেছিল।

Advertisement

ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ক্ষমতা ধরে রাখতে একটি যুক্তি দিতেন। তা হল— তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁদের এই বন্ধুত্বের প্রমাণ অনেক ছবিতে পাওয়া যায়। যেমন—আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট জনসনের গালে হাত দিয়ে আদর করছেন। আবার প্রেসিডেন্ট জনসন করাচির রাস্তায় এক উটের গাড়িচালককে প্রশ্ন করছেন, তিনি তাঁর বন্ধু হতে চান কি না!
এরপরও ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের হয়তো সেই সম্পর্ক নিয়ে কিছু সন্দেহ ছিল। তিনি পরে এই সম্পর্ক নিয়ে একটি বই লেখেন। বইটির নাম ‘ফ্রেন্ডস, নট মাস্টার্স’ (প্রভু নয়, বন্ধু)। এর উর্দু অনুবাদটির নাম আরও কাব্যিক ও আত্মকেন্দ্রিক— ‘যিস রিজক সে আতি হো পারওয়াজ মেঁ কোতাহি’। উর্দু নামটি পাকিস্তানের জাতীয় কবি মহম্মদ ইকবালের একটি কবিতা থেকে নেওয়া। এর অর্থ, ‘আমেরিকা আমাদের যা কিছু দিক না কেন, তা আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হতে পারবে না।’
পাকিস্তান একটি কৃষিপ্রধান দেশ। তাই আমেরিকার কাছ থেকে খাবার নেওয়ার কোনও দরকার ছিল না। কিন্তু আইয়ুব খানের দরকার ছিল আমেরিকার সমর্থন। কারণ, তিনি দেশের রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করতে এবং সেনাবাহিনীকে দেখাতে চেয়েছিলেন, তিনি পশ্চিমি দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষটির খুব কাছের বন্ধু। বিনিময়ে লিন্ডন জনসন কী চেয়েছিলেন? স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালে তিনি চেয়েছিলেন ভূ-কৌশলগত সম্পর্ক। যাতে আমেরিকা পাকিস্তানের উত্তর দিকে একটি বিমানঘাঁটি ব্যবহার করে সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর নজরদারি চালাতে পারে।
পাঁচ দশক পর পাকিস্তানে দ্বিতীয় ফিল্ড মার্শালের উত্থান হয়েছে। গত মে মাসে ভারতের সঙ্গে সংঘাতের পরই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আসিম মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করা হয়। তিনি পাকিস্তানের প্রথম সেনাপ্রধান, যাঁকে হোয়াইট হাউসে সরকারি মধ্যাহ্নভোজের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধানের সঙ্গে দেখা হওয়ায় তিনি সম্মানিত। আসলে পাকিস্তান ট্রাম্পকে সেই সম্মানের জন্য মনোনীত করেছে, যা তিনি চাইছেন— নোবেল শান্তি পুরস্কার! ট্রাম্প সাধারণ রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সময় নষ্ট না করে সেই মানুষটির সঙ্গে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছেন, যাঁর হাতে পাকিস্তানের সব ক্ষমতা। ট্রাম্পের এই উদ্যোগে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
আমেরিকা সব সময়ই পাকিস্তানের সামরিক একনায়কদের পছন্দ করে। কারণ, গোপন ও প্রকাশ্য কৌশলগত পরিকল্পনাগুলি বাস্তবায়নের জন্য সামরিক একনায়করা ‘এক জায়গায় সব সুবিধা’ পাওয়ার মাধ্যম। ১৯৮০-র দশকে আমেরিকা জেনারেল জিয়াউল হকের নৃশংস সামরিক স্বৈরশাসনকে সাহায্য করেছিল। কারণ, তিনি আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীকে পরাজিত করতে ওয়াশিংটনকে সাহায্য করছিলেন।
যখন জেনারেল পারভেজ মোশারফ ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন, তখন তিনি আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়েছিলেন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকায় হামলার পর তৎকালীন জর্জ বুশ প্রশাসন সেই জেনারেল মোশারফের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলে। কারণ, আফগানিস্তানে হামলা চালানোর জন্য আমেরিকার তাঁর সহযোগিতা দরকার ছিল। জেনারেল মোশারফ দাবি করেছিলেন, ওই সময় এক মার্কিন অফিসার হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, যদি ইসলামাবাদ সহযোগিতা না করে তাহলে পাকিস্তানকে বোমা মেরে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এরপর একজন জেনারেলের আর কী করার থাকতে পারে? তিনি পূর্ণ সহযোগিতার প্রস্তাব দেন এবং আফগানিস্তানে তালিবানের উপর বোমা ফেলতে পাকিস্তানের বিমানঘাঁটিগুলি ব্যবহারের সুযোগ করে দেন। এই সম্পর্ক সত্যিই ফুলেফেঁপে উঠেছিল। জেনারেল মোশারফ একসময় তালিবান নেতাদের, এমনকী তাঁদের পাকিস্তানে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকেও আমেরিকার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। অনেক সময় শুধু সংখ্যা বাড়ানোর জন্য নির্দোষ পাকিস্তানি নাগরিকদেরও মার্কিনদের হাতে তুলে দেওয়া হতো।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে পাকিস্তানের উপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। বলেছিলেন, আমেরিকাকে ‘মিথ্যা আর প্রতারণা ছাড়া কিছুই দেয়নি’ এই দেশ। কারণ, ইসলামাবাদ আফগানিস্তানে ওয়াশিংটনের চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। শূন্য হাতে কাবুল ছাড়তে হয়েছিল মার্কিন সেনাদের। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আমেরিকা ও পাকিস্তানের মধ্যে সেই পুরনো প্রেম আবার ফিরে এসেছে। তাদের এই সম্পর্কের ভিত্তি সেই পুরনো কারণ— ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ তাদের ‘সহযোগিতা’। গত বছর মার্চে পাক সেনাবাহিনী একজন আফগান নাগরিককে গ্রেপ্তার করে আমেরিকার হাতে তুলে দেয়। ওই ব্যক্তি কাবুল বিমানবন্দরে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী বলে অভিযোগ। কাবুলে সেই হামলায় ২০০ জনের বেশি আফগান এবং ডজনখানেক মার্কিন সেনা নিহত হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর প্রথম ‘স্টেট অব দ্য নেশন’–এর ভাষণে পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন, যিনি পাকিস্তানের এই শক্তিশালী সেনাবাহিনীকে দেখে ভেবেছেন, তিনি তাদের কোনও কাজে লাগাতে পারবেন। ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরও প্রথম পাকিস্তানি জেনারেল নন, যিনি বিশ্বাস করেন, আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা মানে কিছুটা প্রভুত্ব এবং কিছুটা বন্ধুত্ব।
ফিল্ড মার্শাল মুনির মার্কিন জেনারেল মাইকেল কুরিলার অবসরে যাওয়ার অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। কুরিলার মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে এটি ছিল পাকিস্তানি ফিল্ড মার্শালের আমেরিকায় দ্বিতীয় উচ্চপর্যায়ের সফর। অথচ, পাক প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এখনও ট্রাম্পের ডাক পাননি। ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ড বলছেন, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা ছাড়া নিকট–ভবিষ্যতে পাকিস্তান আসলে আমেরিকাকে কী দিতে পারে, তা পরিষ্কার নয়।
পাকিস্তানের চীন ঘনিষ্ঠতাও আমেরিকার সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্কের পথে বাধা হতে পারে। চীন এখন পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। পাকিস্তান এখন চীনের তৈরি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র কিনছে। পাকিস্তানের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত মালিহা লোধির কথায়, ‘পাকিস্তানে চীনের বিনিয়োগ বা আমাদের প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ পূরণের ক্ষমতার সঙ্গে আমেরিকা পাল্লা দিতে পারবে না।’ ফলে দুই দেশের এই উষ্ণতা কত দিন টিকবে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমেরিকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের আরেক প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত হুসেইন হাক্কানি বলেন, ‘ট্রাম্পের খাতায় ভালো থাকার সুবিধা আছে। আপনি তাঁর প্রশংসা করুন, তিনিও আপনার প্রশংসা করবেন। কিন্তু আমেরিকা কি কারও নির্ভরযোগ্য মিত্র হতে পারে? ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে মোদি বিনিয়োগ করেছিলেন। আর এখন দেখুন মোদির কী অবস্থা।’
পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা ধরে রাখতে আমেরিকার প্রভাব বেশ কাজে লাগে। আসিম মুনিরের সেনাবাহিনী এখন নিজেদের পছন্দমতো শাসক দল বেছে নিতে পারে, বিরোধী দল ঠিক করে দিতে পারে, আদালতকে প্রভাবিত করতে পারে, নির্বাচনে কারচুপি করতে পারে। তাদের ব্যবসার সাম্রাজ্য এখন আগের চেয়েও বেশি বিস্তৃত। আবাসন থেকে শুরু করে সার, সকালের নাস্তা থেকে বিনোদন পার্ক— সবকিছুতেই তাদের ব্যবসা আছে। কিন্তু পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর একটি বিশেষ দক্ষতা আছে। আর তা হল পেশাদার সেনা হিসেবে কাজ করা। সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে ছোটখাটো সংঘর্ষে মার্কিন জেনারেলরা সম্ভবত লক্ষ্য করেছেন, তাঁদের পুরনো মিত্র এখনও শিকার করতে পারে। কিন্তু দেশের ভিতরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনপ্রিয়তা ক্রমশ তলানিতে নেমেছে।
পাক সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক মহম্মদ হানিফ টাইম ম্যাগাজিনের অনলাইন সংস্করণে লিখেছেন, আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পাকিস্তানের ভিতরে জনপ্রিয়তা বাড়ায় না। মানুষ এখন তাদের কৌশলগত জোট এবং পাকিস্তানের ‘বিশাল তেলভাণ্ডার’ খোঁজার প্রতিশ্রুতির আড়ালে কী আছে, তা বুঝতে পারে। ট্রাম্প আমাদের দেশে তেল আবিষ্কারের কথা বলার পর পাকিস্তানি সোশ্যাল মিডিয়ায় হাস্যরসে ভরে যায়। আমরা যে রান্নার তেল ব্যবহার করি, তার ছবি দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে মিমের স্রোত। সবচেয়ে সরল পাকিস্তানিরাও বিশ্বাস করে না, পাকিস্তানে কোনও তেলভাণ্ডার থাকতে পারে।
মহম্মদ হানিফ লিখছেন, আগেও আমরা এই প্রেমের গল্প দেখেছি। এর শেষটা কখনওই ভালো হয়নি। এর শেষ হয়েছিল যখন আফগানিস্তানে শত শত নাগরিক মার্কিন বিমানে উঠতে গিয়ে ঝুলে পড়েছিলেন। এবং পড়ে মারা গিয়েছিলেন। আমেরিকার সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর অংশগ্রহণের কারণে দুই দশকে ৭০ হাজারের বেশি পাকিস্তানি নিহত হয়েছেন। দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে কয়েক মাস পরপরই পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে যেতে হয়েছে। ঋণের জালে আটকে পড়েছে গোটা দেশ। পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের মধ্যে আমেরিকার বিরুদ্ধে চাপা ক্ষোভ রয়েছে। শাসকদের উপর জনগণ ক্ষুব্ধ হলেই তা ঘৃণার আকারে বিস্ফোরিত হয়। কারণ, তারা তাদের শাসকদের আমেরিকার ক্ষমতারই অংশ হিসেবে দেখে।
ওয়াশিংটনে তাঁদের পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে শাসকদের সম্পর্ক পরীক্ষা করার জন্য একটি দেশলাই যথেষ্ট। এক পাক রাজনৈতিক কর্মী সেই পাক সাহিত্যিক মহম্মদ হানিফকে একবার বলেছিলেন, যখনই তাঁদের কোনও দাবিদাওয়া থাকে, তখন শুধু একটি মার্কিন পতাকা, একটি দেশলাইয়ের বাক্স আর একটি ক্যামেরার প্রয়োজন হয়। কেন? ওই কর্মীর বলেছিলেন, ‘যদি আপনারা আমাদের দাবি মেনে না নেন, তাহলে আমরা এই দেশলাই দিয়ে মার্কিন পতাকায় আগুন লাগিয়ে দেব এবং একটা ছবি তুলে ছড়িয়ে দেব। তারপর দেখব, আমেরিকা আসলে আপনাদের সম্পর্কে কী ভাবে। বন্ধু? প্রভু? নাকি সেই পুরনো দ্বিমুখী মিত্র, যে এখনও শিকার করতে পারে!’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ