Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

প্রধানমন্ত্রীকে ভুল পথে নিয়ে গিয়েছে কারা?

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার শপথ গ্রহণের সময় নরেন্দ্র মোদি হঠাৎ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চিরকাল যারা খড়্গহস্ত, সেই বিজেপির একক গরিষ্ঠতার সরকারের শপথগ্রহণে নওয়াজ শরিফ অন্যতম অতিথি হিসেবে এসেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীকে ভুল পথে নিয়ে গিয়েছে কারা?
  • ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার শপথ গ্রহণের সময় নরেন্দ্র মোদি হঠাৎ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চিরকাল যারা খড়্গহস্ত, সেই বিজেপির একক গরিষ্ঠতার সরকারের শপথগ্রহণে নওয়াজ শরিফ অন্যতম অতিথি হিসেবে এসেছিলেন। এরপর কাবুল সফর থেকে ফেরার পথে আচমকা মোদি পাকিস্তানে বিনা আমন্ত্রণে নওয়াজ শরিফের জন্মদিনের উপহার নিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে এসেছিলেন। পরের মাসেই পাঠানকোটে বায়ুসেনার শিবিরে হামলা চালায় পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদীরা। এই যে নওয়াজ শরিফকে নিজের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ করা কিংবা আমন্ত্রণ ছাড়াই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পাকিস্তানে চলে যাওয়া, এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণের পিছনে কোন পরামর্শদাতাদের ইন্ধন ছিল? এই দুই সিদ্ধান্তের কারণে কিন্তু মোদি কিংবা বিজেপির পাকিস্তান বিদ্বেষ বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। বরং উলটে বিজেপি যদি বিরোধীদের পাকিস্তানের বন্ধু আখ্যা দিয়ে কটাক্ষ করে, পালটা বিরোধীরা প্রত্যাঘাত করে বলে, আমরা তো আর মোদিজির মতো বিনা আমন্ত্রণে পাকিস্তানে চলে যাইনি! অর্থাৎ ওই দুই ভুল সিদ্ধান্ত আজীবন মোদিকে কিন্তু তাড়া করে বেড়াবে। ওই দুই সিদ্ধান্তের দ্বারা মোদি কিংবা বিজেপির কোনো লাভ হয়নি। যা হয়েছে, সবটাই ক্ষতি। প্রশ্ন হল, এই বুদ্ধিটা কে বা কারা দিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীকে? কেন ইচ্ছাকৃতভাবেই মোদির ভাবমূর্তিকে চিরকালীন ড্যামেজ করা হয়েছে?

Advertisement

২০১৪ সালে যখন মোদি ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন তখন তাঁকে উন্নয়নের দিশারি চোখে দেখা হত। বহু মানুষ বলত, আমি বিজেপির ভক্ত নই। কিন্তু মোদিকে নিয়ে আশা আছে। কিছু একটা করবে বলে বিশ্বাস।

সেই মোদি সম্পর্কে মাত্র ১০ বছর পর কিন্তু আর

বিরাট কোনো আশা প্রত্যাশা বেঁচে নেই তাঁর সমর্থকদের মধ্যে। তিনি জনপ্রিয়, তিনি অন্যদের থেকে আলাদা এখানেই শেষ। কিন্তু ভারতকে বদলে দিয়ে বিরাট কোনো পরিবর্তন আনতে চলেছেন, এরকম আর কেউ বিশ্বাস করে না। মোদির এই ক্রমহ্রাসমান জনপ্রিয়তার কারণ হল, উন্নয়নের রাস্তা থেকে তাঁকে সরিয়ে আনা হয়েছে। তাঁকে দিয়ে নানাবিধ অবাস্তব, নন ইস্যু এবং ক্ষোভ বিক্ষোভ উদ্রেককারী অর্থহীন সিদ্ধান্ত বলিয়ে দিয়ে তাঁর ভাবমূর্তির ক্ষতি করা হয়েছে। এজন্য দায়ী কে বা কারা?

নরেন্দ্র মোদিকে নোট বাতিল করার আইডিয়া কে বা কারা দিয়েছিল? মোদি কাদের কথায় বিশ্বাস করে ভাষণে বলেছিলেন যে, আমাকে ৫০ দিন সময় দিন, আমি সব ঠিক করে দেব? কিন্তু আদতে নোট বাতিল ভারতের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে পিছিয়ে দিয়েছে বেশ কিছু বছর। অতএব প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক এরকম ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে মোদিকে রাজি করিয়েছে কোন পরামর্শদাতার দল? নাকি এটা তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত? কী রাজনৈতিক লাভ হয়েছে মোদি কিংবা বিজেপির? বরং ক্ষতি অনেক বেশি।

রাত ৮ টার সময় টেলিভিশনের পর্দাঁয় এসে মাত্র চার ঘণ্টা পর রাত ১২ টা থেকে গোটা দেশে লকডাউন হয়ে যাবে, ১৪০ কোটির দেশে এই অবাস্তব ও অবিশ্বাস্য নির্বুদ্ধিতার সিদ্ধান্ত প্রকৃতপক্ষে কাদের ছিল? প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের কিছু উৎসহী দায়িত্বপ্রাপ্ত পরামর্শদাতার? নাকি সরকারের আধিকারিকদের? নাকি বিশেষজ্ঞ কোনো মহল? কারা এই সিদ্ধান্ত মোদির মুখ দিয়ে বলিয়েছিল? লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিককে  চরম নির্মমতায় ঠেলে দেওয়া হল রাস্তায়। মৃত্যু হল। অভিশম্পাত হল। মোদির বিরুদ্ধে প্রবল বিরূপ সমালোচনা হল। কাদের পরামর্শে? মনে রাখতে হবে একজন প্রধানমন্ত্রী  যত শক্তিশালীই হন না কেন, কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত এককভাবে তিনি গ্রহণ করেন না। অন্তত ক্ষুদ্র হলেও একটা কোর গ্রুপ থাকবেই। একটা ছোটো ঘনিষ্ঠ বৃত্ত থাকবে। সে দুজন তিনজনও হতে পারে। কিন্তু থাকবেই। পাশাপাশি এই সরকারের রাজনীতির সিদ্ধান্ত অমিত শাহ, নরেন্দ্র মোদি নিলেও প্রশাসনিক নীতিগত সিদ্ধান্ত কিছু ঘনিষ্ঠ আধিকারিকের পরামর্শমতো নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা কারা?

হঠাৎ বিজেপির কাছে মনে হয়েছে অনুপ্রবেশকারী ইস্যু দারুণ সাফল্য পাবে। অতএব ঝাড়খণ্ড, বিহার, বাংলায় অনুপ্রবেশকারী ইস্যুকে জোরালোভাবে উত্থাপন করে এসআইআর করা হচ্ছে। কিন্তু অনুপ্রবেশ ইস্যুকে মোক্ষম অস্ত্র বিবেচনা করা হলে তো বিহারে আর ১০ হাজার টাকা করে মহিলাদের দিতে হত না! তাহলে কেন দেওয়া হল? প্রশ্ন হল, এই অনুপ্রবেশ ইস্যুকে সামনে রেখেই সিএএ, এনআরসি, এসআ‌ইআর করা হচ্ছে। আর সাধারণ মানুষকে চরম ঝঞ্ঝাটের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ক্রমেই দেখা যাচ্ছে, যত মুসলিম বাদ যাবে বলে ভাবা হচ্ছিল, সেই তুলনায় বহুগুণ বেশি সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু নাগরিকের নাম বাদ যাচ্ছে। তাদের হেনস্তা হতে হচ্ছে। বাংলায় যে এসআইআর করে বিজেপি কার্যত আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটি আর কয়েকমাস পর ভোটের ফলাফলেই স্পষ্ট হবে। কারণ বিজেপির নিজের ভোটব্যাংকই বিদ্রোহ করছে।  নরেন্দ্র মোদিকে ভাবতে  হবে যে, সিএএ করে তাঁর সামান্যতম লাভ হয়নি। অসম এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা ৬ বছর পরও প্রকাশিত হয়নি আজও। অবশেষে এসআইআর করে নিজের পায়ে কুড়ুল মারছে বিজেপি বাংলায়। সাধারণ মানুষ মনে করছে আমরা বৈধ নাগরিক হয়েও, বছরের পর বছর ভোট দিয়ে, ট্যাক্স দিয়ে শেষ পর্যন্ত সন্দেহজনক নাগরিকে পরিণত হচ্ছি! এর থেকে বড়ো সামাজিক অপমান, অসম্মান আর হয় না। অতএব ভোটের বাক্সে কী পরিমাণ প্রতিক্রিয়া আসবে বিজেপি ভাবতেই পারছে না। এখানেও তাই বিস্ময় জাগে যে, এরকম একটি কর্মসূচি নেওয়ার ক্ষেত্রে মোদিকে রাজি করালো কে? কী বলা হয়েছিল তাঁকে?

ওড়িশায় গিয়ে ওড়িয়া ভাষায় ভাষণের প্রথম কয়েকটি বাক্য ভুল উচ্চারণে বলা। বাংলায় এসে বাঙালি মনীষীদের বন্দনা করে ভুল তথ্য দেওয়া কিংবা বিকৃত ভাষ্যে কবিতা উদ্ধৃত করা। কর্ণাটকে গিয়ে বলতে হয় কর্ণাটক হবে দেশের এক নম্বর রাজ্য। বিহারে গিয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া যে, বিহার হবে দেশের এক নম্বর রাজ্য। ত্রিপুরায় গিয়ে বলা, উত্তর পূর্ব ভারত আগামী দিনে দেশকে পথ দেখাবে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বঙ্কিম দা বলে সম্বোধন। সভা সমাবেশে গিয়ে মরশুমি বঙ্গপ্রীতি দেখানোর এই কৌশল কে শিখিয়েছে তাঁকে? প্রত্যেকবার মোদি বাংলার মনীষী. বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার ধর্মাচার ইত্যাদি নিয়ে বলেন, তখনই হাস্যকর কিছু মন্তব্য করেন, ভুল উচ্চারণ করেন। কিন্তু কথাটি হল, এসব করার জন্য তাঁকে কে বারংবার প্ররোচনা দেয়? কারা স্ক্রিপ্ট লিখে দেয় বাংলার জন্য? কেন তাঁকে এভাবে অপ্রস্তুত হতে হচ্ছে? এসবের পিছনে কারা আছে?

বাংলায় বারংবার সাম্প্রদায়িকতা, হিন্দু মুসলিম ইত্যাদি ইস্যু ব্যর্থ হলেও বিজেপি আবার ভোটের প্রাক্কালে সেই ইস্যু নিয়েই ঝাঁপাচ্ছে কেন? বাংলায় কোনো নতুন স্ট্র্যাটেজি নিয়ে নামতে পারছে না বিজেপি। এমনকি সবেমাত্র লোকসভা ভোটে বিজেপির যে ভোট কমে গিয়েছে সেটাও ভুলে গিয়েছে অতি আত্মবিশ্বাসী হয়ে। মোদি কি জানেন না যে বাংলায় এসব উগ্র ধর্মীয় ইস্যু কাজ করবে না। বরং ক্রমেই বিজেপি বাঙালি বিরোধী দল হিসেবে তকমা পাচ্ছে বিজেপি বিরোধীদের কাছে। যে অভিযোগটি বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে বিজেপি। রবীন্দ্রনাথ কীসের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, ধরা যাক কোনও এক রাজনীতিবিদ নাই জানতে পারেন।  কিন্তু তাঁকে ভুল জেনেও সেটা বলার জন্য এত আকুল হতে হচ্ছে কেন? বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি সর্বশেষ উদাহরণ। তিনি বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন।

নরেন্দ্র মোদি কি কিছুই জানেন না যে, তাঁকে যে যা শিখিয়ে দেবে তিনি সেটাই বলবেন? তাঁর যথেষ্ট ক্ষুরধার রাজনৈতিক বুদ্ধি। এখানেই খটকা লাগছে। ১১ বছর ধরে মোদিকে বারংবার এমন কিছু সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে হয়েছে, এমন সব স্ক্রিপ্ট পড়তে হয়েছে, এমন কিছু উদ্ধৃতি উচ্চারণ করতে হয়েছে, যেগুলির তাঁর মানহানি ঘটিয়েছে। ক্ষোভ, বিক্ষোভ, সমালোচনা, হাস্য পরিহাসের জন্ম দিয়েছে। ক্রমেই অনেক বিষয়ে তাঁর কথাকে সিরিয়াসলি আর নেওয়া হচ্ছে না। এভাবে মোদিকে বারংবার বিপদে ফেলা হয়েছে। বিজেপি অথবা সরকারের অন্দরেই কি মোদির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি কোনো অন্তর্ঘাত চলেছে? তাঁর ইমেজ কিন্তু আর ঊর্ধ্বমুখী নয়! লাগাতার বহু ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মোদি কাদের কথায় প্রভাবিত হয়ে? মোদি কি ভেবেছেন যে, এইসব সিদ্ধান্ত যারা নিয়ে তাঁকে বাধ্য করেছে প্রয়োগ করতে, তাদের এবার চিহ্নিত করার পালা! এবং জবাব নেওয়া যে, কেন এইসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল? উদ্দেশ্য কী ছিল?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ