নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও বারাসত: বুথস্তরের সাংগঠনিক শক্তি কার্যত তলানিতে। গোষ্ঠীকোন্দলও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। এই আবর্তে বিভাজন আর অনুপ্রবেশের ‘তত্ত্ব’কে ইস্যু করলেও, ব্যাপক ‘সাড়া’ যে মিলছে, এমনটাও নয়। তাহলে উপায়? পুলিশ-প্রশাসনের ‘অপছন্দের’ অফিসারদের বদলি এবং ‘পছন্দের’ আধিকারিকদের পোস্টিং। এভাবেই বিধানসভা কেন্দ্র ধরে ধরে ‘শক্তি’ বাড়াতে তৎপর হয়ে উঠেছে বিজেপি। ভিন রাজ্য থেকে যে নেতারা বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে ‘সারথি’ হতে এসেছেন, জেলাওয়াড়ি তাঁরা আশ্বাস দিয়ে বেড়াচ্ছেন—‘চিন্তা করবেন না! রাজ্যের শাসকদলের আস্থাভাজন পুলিশ-প্রশাসনের আধিকারিক কেউ থাকবেন না নির্বাচন প্রক্রিয়ায়। তালিকা দিন, সব বদলি হয়ে যাবে।’ দুর্গাপুরে সম্প্রতি দলীয় কর্মিসভায় পদ্মপার্টির এক প্রথম শ্রেণির নেতা বলেছেন—পুলিশ-প্রশাসনের আধিকারিকরাও জানেন, এবার বিজেপিই সরকার গড়বে। বাড়াবাড়ি করলে, তাঁদেরও বিপদ আছে। শীর্ষ আইপিএস এবং আইএএস কর্তাদের ‘অ্যানুয়াল কনফিডেন্সিয়াল রিপোর্ট’ (এসিআর) তৈরি করে কেন্দ্র, তাঁরা জানেন কী করতে হবে! রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য, ক্ষয়িষ্ণু সাংগঠনিক শক্তির মাঝে পুলিশ-প্রশাসনের আধিকারিকদের ভিন রাজ্যের বিজেপি নেতাদের এহেন ‘হুংকার’ যে কর্মী-সমর্থকদের মনোবল চাঙা করতে, তা স্পষ্ট। পাশাপাশি আধিকারিকদের উপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ বাড়ানোর কৌশলও বটে। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন কমিশন একটি নির্দেশিকা জারি করেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ উল্লেখ করে তাতে বলা হয়েছে, অবাধ্য বা ডিউটি থেকে বিচ্যুত হলে, যে কোনো প্রশাসনিক ও পুলিশ আধিকারিককে ‘সাসপেন্ড’ করতে পারবে কমিশন।
বিজেপি সূত্রে খবর, ইতিমধ্যেই রাঢ়বঙ্গ জোন, বারাসত, বনগাঁ, ডায়মন্ডহারবার, কোচবিহার, বালুরঘাট সহ রাজ্যের বেশ কয়েকটি অংশে থেকে এরকম লিস্ট তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। দুর্গাপুর-বর্ধমান, বিষ্ণুপুর, পুরুলিয়া, বারাসত, হাওড়া, কোচবিহার থেকে ইতিমধ্যেই তথাকথিত শাসকদল ঘনিষ্ঠ পুলিশ ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের তালিকা জোগাড় করা হয়েছে। বারাকপুর, দমদম, কৃষ্ণনগর, বহরমপুর, শিলিগুড়ি, পূর্ব বর্ধমান, উলুবেড়িয়া এমনকি খোদ কলকাতা সাংগঠনিক জেলা নেতৃত্বকে বলা হয়েছে, দ্রুত ওই সমস্ত পুলিশ ও সরকারি অফিসারের নামের তালিকা দিন। ভিন রাজ্য থেকে আসা পদ্ম নেতাদের ‘উৎপাতে’ এখন নাজেহাল অবস্থা বঙ্গ বিজেপির। নিত্যনতুন ফরমায়েশে বিপর্যস্ত বিজেপির ‘কারিয়াকর্তারা’। কার্যত জেলার নেতা-কর্মীদের ‘তৃতীয় শ্রেণি’র নাগরিক হিসাবে ধরে নেওয়া হয়েছে। বারাসত সাংগঠনিক জেলায় পদ্মপার্টির ভিন রাজ্যের নেতা-পর্যবেক্ষকরা বৈঠক করেছেন। সাংগঠনিক জেলার এক বিজেপি নেতার কথায়, এমনিতেই ওঁদের বায়ানাক্কায় নাজেহাল অবস্থা। তার উপর বুথস্তরে সংগঠনের অবস্থা কেমন, প্রচারের কৌশল কী হবে, এসবের ধারেকাছেও যাচ্ছেন না ভিন রাজ্যের নেতারা। বৈঠকে তাঁদের একটাই প্রসঙ্গ—কোন পুলিশ অফিসারকে নিয়ে বিতর্ক আছে? ভোটের সময় কাকে সরালে বিজেপির ভালো হবে? কাকে আনতে হবে? তালিকা দিন। ওই বিজেপি নেতার কথায়, সংগঠনের শ্রীবৃদ্ধি কীভাবে হবে, তা নিয়ে পথনির্দেশের বদলে, শুধুমাত্র পুলিশ-প্রশাসনিক আধিকারিকদের ‘রদবদল’ করলে যে ভোট হবে না, তা বুঝতেই পারছেন না ‘পরিযায়ী’ নেতারা। বাংলার রাজনীতি সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই তাঁদের!
বিজেপির সর্বভারতীয় নয়া সভাপতি নীতিন নবীন সম্প্রতি রানিগঞ্জে বৈঠক করতে এসেছিলেন। সেখানে বিজেপির এক নেত্রী পুলিশের পাশাপাশি ভোটের সময় পাহারা দিতে আসা কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর দাবি ছিল, কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা তাঁদের কথা শোনেন না। উলটে তৃণমূলের হাতে ‘তামাক’ খান। যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন ওই নেত্রী। তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, ‘এখানে সংগঠনের অবস্থা দেখে শিউরে উঠছে পরিযায়ী নেতারা। তাই পুলিশ-প্রশাসনিক আধিকারিকদের দাবিয়ে রেখে ঘাটতি মেটাতে চাইছে। এ কাজ ওদের নতুন নয়। আগে চেষ্টা করেছে, লাভ হয়নি। এবারও হবে না।’