সমৃদ্ধ দত্ত: সাধারণত মানুষ সবথেকে বেশি কী পেতে চায়? অর্থসম্পদ এবং প্রশংসা। সাধারণত মানুষ সবথেকে বেশি কী দিতে চায়? পরামর্শ এবং উপদেশ। যাঁরা ক্ষমতার সিংহাসনে বসে থাকেন, তাঁরা তো আর সাধারণ মানুষ নয়। তাঁদের অন্যতম বড় শক্তি হল রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকার। অতএব তাঁরা আরও কয়েকগুণ বেশি চাইবেন যখন তখন পরামর্শ ও উপদেশ দিতে। ক্ষমতা থাকলেই অন্যকে উপদেশ ও পরামর্শ দেওয়ার একটি প্রবণতা আছে গড় বুদ্ধির সেলেব্রিটিদের। সেই সেলেব্রিটি রাজনীতিক হতে পারেন অথবা কোনও চিত্রতারকা কিংবা সঙ্গীতশিল্পী। আজকাল লক্ষ করা যায় সাক্ষাৎকারের জোয়ার। সামান্য পরিচিত মুখ হলেই সকলেই সাক্ষাৎকার দিয়ে থাকেন। এবং আকাশের নীচে যে কোনও ইস্যুতেই নিজেদের মতামত এবং উপদেশ দিয়ে থাকেন। বিচিত্রানুষ্ঠানে উচ্চমঞ্চ থেকে পারফর্মাররা নীচে বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা দর্শক শ্রোতাদের নানাবিধ উপদেশ ও জ্ঞান বিতরণ করেন। কিন্তু সেগুলি সেরকম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
সমস্যা হল, যখন রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে বসে থাকা ব্যক্তিরা দূর থেকে মাঝেমধ্যে এসে বাঙালিকে উপদেশ ও পরামর্শ দিয়ে আবার ফিরতি ফ্লাইটে চলে যান। সম্প্রতি এভাবেই দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান ব্যক্তি এসে বাঙালি ভদ্রলোকদের উদ্দেশে পরামর্শ দিয়েছেন যে, ‘বাঙালি ভদ্রলোকদের বলছি তৃণমূলকে তাড়ান। না হলে বাংলা বাঁচবে না।’ তিনি কি অন্যায় করেছেন? মোটেই নয়। প্রধানমন্ত্রী হন অথবা সাধারণ নেতা, প্রতিপক্ষকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চাইবেন, আহ্বান করবেন তাঁদের বিরোধীকে ভোট না দিতে, এটা তো অত্যন্ত স্বাভাবিক।
প্রশ্ন হল, ওই ‘ভদ্রলোক’ শব্দ নিয়ে। তাহলে কি প্রধানমন্ত্রী মনে করেন বাংলায় দুই শ্রেণি আছে? ভদ্রলোক এবং ছোটলোক? প্রাত্যহিক কথাবার্তায় এই ‘ছোটলোক’ শব্দের ব্যবহার বাঙালি সমাজে বহুল প্রচলিত। বহু ক্ষেত্রে নিছক গরিবদের অথবা নিম্নবর্গের কাজকর্ম করে, অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিতদেরই কেবলমাত্র ছোটলোক বলা হয় এমন কিন্তু নয়। ধনী দরিদ্র যাই হোক, কোনও একটি বিশেষ আচরণ অথবা মনোভাবের প্রেক্ষিতেও বলা হয়ে থাকে যে, ‘লোকটা খুব ছোটলোক জানিস তো’। সেটি লজ্জাহীনতার কারণে হতে পারে, কৃপণতার কারণে হতে পারে, ক্ষুদ্র মানসিকতার কারণে হতে পারে, আর্থিক দুর্নীতির কারণে হতে পারে কিংবা অসৌজন্যের কারণে হতে পারে।
কিন্তু দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন বাঙালি ভদ্রলোকদেরই শুধু একটি আহ্বান করছেন, তখন জানার ঔৎসুক্য হয় যে, তাঁর স্ক্রিপ্টরাইটারদের কাছে তিনি কি জানতে চেয়েছেন যে, এই ‘ভদ্রলোক’ কথাটি আমি উচ্চারণ করব কেন? কাদের বলা হচ্ছে ভদ্রলোক? শিক্ষিত শ্রেণিকে? শহুরে শ্রেণিকে? ধনী ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণিকে? সেদিন বাংলার যে অনুষ্ঠানস্থল থেকে প্রধানমন্ত্রী ওই শুধুই ভদ্রলোক শ্রেণিকে আহ্বান করেছেন, সেই অনুষ্ঠানস্থলের জমায়েতের ছবি ও ভিডিও তীক্ষ্ণভাবে লক্ষ করলে বোঝা যাবে যে, সেখানে নিছক শহুরে, উচ্চশিক্ষিত, ধনী, উচ্চমধ্যবিত্তরাই হাজির ছিলেন দর্শক হিসেবে, এমন তো নয়। এমনকী তাঁর বক্তৃতার যে সরাসরি সম্প্রচার ঘরে অথবা কর্মস্থলে বসে যারা মনোযোগ দিয়ে দেখছিল, তারা যে সকলেই ওই উচ্চশ্রেণির সেটাও হতে পারে না।
সেইসব নিম্নবর্গ, নিম্নবিত্ত, গ্রামীণ, দিনআনা দিন খাওয়া, মজুর অথবা দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক, হকারদের মনে প্রশ্ন উদিত হয়েছে যে, আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী ভদ্রলোকদের শুধু আহ্বান করলেন কেন? তথাকথিত এক শ্রেণির ভদ্রলোক ক্লাস এই শ্রেণিটিকেই সাধারণত ছোটলোক আখ্যা দিয়ে থাকে। তাদের সঙ্গেই সহমত পোষণ করে, তাহলে কি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে ছোটলোক হিসেব ভাবলেন? প্রধানমন্ত্রী যদি বলতেন, আমি গোটা সচেতন বাঙালি সমাজকে বলছি, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে তৃণমূলকে হারিয়ে দিন, আমাদের একবার সুযোগ দিন, আমরা উন্নয়ন করব রাজ্যের, তাহলে সেটি একটি রাজনৈতিক স্টেটমেন্ট হতো। ঠিক ভুল পরের কথা, কিন্তু আহ্বানটি রাজনৈতিক রীতি মেনেই।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ভেবেচিন্তে ভদ্রলোকদেরই আহ্বান করলেন। এর দুটি অর্থ হতে পারে। প্রথমত প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিত বাঙালির মধ্যে দুটি অংশ দেখতে পান। ভদ্রলোক ও ছোটলোক। আর দ্বিতীয়ত যারা তৃণমূলের সমর্থক, তারাই ছোটলোক, এরকম হয়তো তিনি বলতে চেয়েছেন। দুটিই বাঙালির পক্ষে অপমানজনক। কে কাকে ভোট দেবে সেটা তার ব্যক্তিগত অভিরুচি। যে বাঙালি বহু বছর কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছে, তারাই আবার কংগ্রেসকে হারিয়ে দিয়েছে। যে বাঙালি ৩৪ বছরে ধরে বামপন্থীদের জয়ী করেছে, তারাই আবার হঠাৎ বামপন্থীদের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। এমনকী ওই দুই দলকে শূন্যই করে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজের রাজ্যেও কংগ্রেসকে শূন্য করতে পারেননি। আবার কোনও একদিন সময় আসবে, যখন বাঙালি তৃণমূলকেও পরাস্ত করবে। রাজনীতির নিয়মই এরকম। কিন্তু সেটা তো ভোটের মাধ্যমেই হবে। সেজন্য বিরোধীদের প্রচারও চলবে। হিন্দু বনাম মুসলিম বিভাজন চলছে বহুদিন ধরে। সেজন্য সবরকমভাবে নানাবিধ প্ররোচনাও চলছে। এবার কি তার সঙ্গে যুক্ত হতে চলেছে ভদ্রলোক বনাম ছোটলোক?
এই প্রবণতাটি অত্যন্ত হাস্যকর যে, ভিনরাজ্যের রাজনীতিকরা মাঝেমধ্যে এসে বাঙালিকে নানাবিধ উপদেশ বর্ষণ করে। রাজনৈতিক প্রচার একরকম। কিন্তু সেই প্রচার যখন উপদেশ, পরামর্শ, ইতিহাস, সংস্কৃতিকেন্দ্রিক জ্ঞান বিতরণের পর্যায়ে পড়ে, তখন সেটি হয়ে ওঠে অসম্মানজনক এবং বিপজ্জনক। সাড়ে ১০ কোটি বাঙালির কাছে এটা স্পষ্ট হওয়া দরকার যে, ঠিক কাদের প্রধানমন্ত্রী ‘ভদ্রলোক’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করছেন। আর কারা ‘ছোটলোক’ শ্রেণিভুক্ত?
অ্যানুয়াল সার্ভে অফ আনইকর্পোরেটেডে সেক্টর এন্টারপ্রাইজেস নামক সমীক্ষা তৈরি করেছে কেন্দ্রীয় সরকারের ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিক্স অফিস। সেখানে বলা হচ্ছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পক্ষেত্রে বাংলা প্রথম স্থানে। আর এই শহরে, গ্রামে, ব্লকে, জেলায়, সীমান্তজুড়ে এই সেক্টরে সবথেকে বেশি যুক্ত হয়েছে নারীশক্তি। ৩৬.৪ শতাংশ। দেশের সব রাজ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই যে ছোট, মাঝারি কারখানা, ইউনিটে সারাদিন ধরে কাজ করেন যাঁরা, তাঁদের অনেকেই হয়তো ফর্মাল স্কুল কলেজ শিক্ষায় খুব বেশি শিক্ষিত নন, অথচ যাঁরা রাজ্যকে এক নম্বর করেছেন, তাঁরা কি ছোটলোক শ্রেণিতে পড়ছেন? জানা দরকার।
ধান উৎপাদনে বছরের পর বছর ধরে যাঁরা বাংলাকে দেশের মধ্যে প্রথম স্থান পাইয়ে দিচ্ছেন প্রতি বছর, তাঁরা ঠিক কোন শ্রেণিভুক্ত? তাঁদের কি ছোটলোক তালিকাভুক্ত করা হবে? মাছ উৎপাদনে প্রথম হওয়ার জন্য যাঁরা সর্বদাই টক্কর দিয়ে চলেছেন অন্ধ্রপ্রদেশের সঙ্গে, সেই বাংলার নদী, সমুদ্রে ট্রলার নিয়ে যাওয়া মৎস্যজীবীদের স্থান কি তাহলে ভদ্রলোক শ্রেণিতে আসছে না? সব্জি উৎপাদনে উত্তরপ্রদেশের সঙ্গে কখনও প্রথম কখনও দ্বিতীয় স্থান পেতে বাংলার যে সব্জি চাষিরা প্রাণপণে লড়াইয়ে থাকছেন প্রতি বছর, তাঁদের প্রধানমন্ত্রী ঠিক কোন পংক্তিভুক্ত করছেন? ফুল রপ্তানিতে কারা পাল্লা দিচ্ছে অন্য রাজ্যকে হারিয়ে? বাংলার ফুলচাষিরা। এই যে খেটে খাওয়া মানুষেরা, তাঁদের কোন তালিকায় ফেলা হচ্ছে?
এই শ্রেণির মানুষের মধ্যেও কিন্তু বিজেপির ভোটার রয়েছে বহু। প্রধানমন্ত্রীর সভা সমাবেশে তাঁরা হাজির হন। কিন্তু তাঁরা যখন গিয়ে শোনেন প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ‘বাঙালি ভদ্রলোকদের বলছি তৃণমূলকে সরান’, তখন তাঁদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়। তাঁরা ভাবেন, প্রধানমন্ত্রী কাদের উদ্দেশ্য করে ওই কথা বললেন? তাঁরা নিজেরাও কি ওই তালিকাভুক্ত? তাঁদেরও রাষ্ট্রপ্রধান ভদ্রলোক ভাবছেন তো? কিন্তু সেক্ষেত্রে সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি ভোটারকেই ওই আহ্বান করা হল না কেন? আলাদাভাবে ‘ভদ্রলোক’ শব্দটির বিশেষ মাহাত্ম্য কেন রচিত হল রাষ্ট্রপ্রধানের চিন্তায়? তাহলে কি রাষ্ট্রের চোখে সকলে সমান নয়? একদল ভদ্রলোক, অন্য শ্রেণি নিছক ভোটার? রাষ্ট্রের কাছে বাঙালি জানতে চায় যে, দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান ব্যক্তির কাছে ভদ্রলোক বাঙালি কারা? ছোটলোক বাঙালি কারা?
যুক্তিবাদী এবং পক্ষপাতহীন ভদ্রলোক বাঙালির কাছে তারাই কিন্তু ছোটলোক, যারা তারস্বরে মাইক অথবা ডিজে বাজিয়ে অসহনীয় এক পরিবেশ অবাধে সৃষ্টি করে চলে সংবৎসর। যারা ধর্মের নামে বাঙালির মধ্যে দাঙ্গা বাঁধানোর চেষ্টা করে। যারা উচ্চবর্ণ বনাম নিম্নবর্ণের মধ্যে বৈষম্য করে। যারা সংস্কৃতির নামে লুম্পেনরাজের আমদানি করে। যারা মাইনে নেয়, কাজ করে না। যারা দুর্নীতি করে মানুষকে ঠকিয়ে। যারা ভিনরাজ্যের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে বাঙালিত্বকে বিসর্জন দিয়েছে। পাবলিক প্লেসে যারা জানে না সৌজন্য ও ডিসেন্সি কাকে বলে। এসবের সঙ্গে ধনী দরিদ্র, শিক্ষিত অশিক্ষিত, রাজনৈতিক দল, বর্ণ অথবা জাতপাতের সম্পর্ক নেই। সব শ্রেণি এবং সব দলের মধ্যেই এই প্রবণতা অথবা প্রবণতার সমর্থক আছে। সুতরাং ভদ্রলোক বনাম ছোটলোক আইডেন্টিটি ঠিক অতটা সরল নয়! প্রধানমন্ত্রী তাহলে ঠিক কাদের চিহ্নিত করেছেন?