


চাকরিতে সদ্য যোগ দিয়েছে বিহু। বয়স মেরেকেটে ২৫। কিন্তু তার চুল দেখে তা বোঝার উপায় নেই। এখনই সামনের দিকের বেশ কিছু চুলে পাক ধরেছে। যদিও তা নিয়ে মায়ের চিন্তা থাকলেও বিহুর নেই! সে মাঝেসাঝেই হেয়ার কাট বদলায়, মুখের প্রোফাইল পালটায় ‘সল্ট অ্যান্ড পিপার’ চুলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই।
বিহুর মতো এমন বহু অল্পবয়সি ছেলেমেয়েই পাকা চুল নিয়ে আর ভয় পায় না। চুল পাকলেই যে বয়স্ক দেখাবে, সে ভাবনার পথিক তারা নয়। সে এক সময় ছিল। চুল পাকত বয়স ৫০-৬০ পেরলে। তবে এখন আর সে দিনকাল নেই। অভিজ্ঞতা ও বয়সের উপর নির্ভর করে আর চুল পাকে না। বিশ্বায়নের হাত ধরে মানুষের যত ব্যস্ততা বেড়েছে, ততই তার ছাপ পড়েছে শরীরে। যে অসুখ ৬০ পেরলে হওয়ার কথা, তা হানা দিচ্ছে ৩০ পেরলেই! ঘন কালো চুলের হিসেবও পালটে গিয়েছে। বয়স ৩০ পেরলে বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২৫-২৬-এ এসে পৌঁছলেও কালো চুলে দেখা দিচ্ছে রুপোলি বর্ডার! তবে এই প্রজন্ম ফ্যাশন ও স্টাইল নিয়ে যথেষ্ট সচেতন। তাই পাকা চুল লুকনো বা তাকে জোর করে কালো করার যুক্তি তারা খুঁজে পায় না। বরং কাঁচা-পাকা চুলই এখন তাদের কাছে ট্রেন্ডি!
পাকা চুলের স্টাইল ঠিক কেমন হবে? জানালেন হেয়ার স্টাইলিস্ট জলি চন্দ। জলির মতে, ‘এখনকার ছেলেমেয়েরা খুবই ফ্যাশন সচেতন। নিত্যনতুন কিছু ট্রাই করতেও ভালোবাসে। তাই চুল পাকলে সেই চুলই রেখে দিয়ে নতুন স্টাইল করার প্রবণতা যেমন বাড়ছে, তেমন আবার ট্রেন্ড মেনে কেউ কেউ কালো চুলেও সাদা রং করাতে চাইছে। পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে, ২৫-৩৫ এবং ৩০-৪০ বছর বয়সিদের যে গ্রুপ, তারা এই ধরনের স্টাইল বেশি চাইছে। চারপাশে দূষণ বেড়েছে। আবহাওয়া বদলেছে। তার সঙ্গে যোগ করুন মানসিক স্ট্রেস, কাজের চাপ। এসব কারণেই আজকাল অল্প বয়সে চুল পেকে যায়। কিছু ক্ষেত্রে বংশগত কারণও মুখ্য।’
কারণ যা-ই হোক, সেই পাকা চুল হাসিমুখে মেনে নেওয়া ও তা দিয়েই স্টাইল আইকন হয়ে ওঠায় এই প্রজন্ম এগিয়ে। ঠিক কোন কোন স্টাইল এখন ট্রেন্ড? হদিশ দিলেন জলি। তাঁর কথায়, ‘এই ধরনের চুলে ছেলে ও মেয়েদের নির্দিষ্ট কিছু কাট রয়েছে। বেশিরভাগই চান ক্রিয়েটিভ কোনো কাট-এর উপর নিজের লুক সেট করতে। ছেলে ও মেয়েদের ক্ষেত্রে তাই ক্রিয়েটিভ নানা কাটিং সল্ট অ্যান্ড পিপার বা হোয়াইট ব্রাশ চুলে ভালো মানায়। এক সময় মনে করা হত, চুল ছোটো হলে তবেই বোধহয় নানারকম স্টাইল ও এক্সপেরিমেন্ট করা যাবে। আজকাল বড়ো চুলেও দুর্দান্ত সব স্টাইলিং এসেছে। ছোটো চুলের বেলায় সাধারণত ‘সুইপ্টিং ব্যাংস’ ও বড়ো চুলে হালকা লেয়ার কাটলে চেহারায় তারুণ্য বজায় থাকে। এবার আসি চুলের রঙের প্রসঙ্গে। চুল সাদা-কালো হলে বা মাথায় সাদা চুল বেশি থাকলে বেশ কিছু কাটিং ট্রাই করা যেতে পারে।’
ছেলেদের কাটিং
যাঁরা অফিস করেন বা প্রফেশনাল জগতের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের জন্য সবচেয়ে স্টাইলিশ কাট ক্লাসিক শর্ট কাট। জানালেন হেয়ার স্টাইলিস্ট বিমল ঠাকুর। এই ধরনের কাটিংয়ে চুল ছোট করে ছেঁটে দুই সাইডে একটু ফেড লুক আনা হয়। এতে প্রফেশনাল লুক বেশি খোলে। অনেক সময় সামনের দিকের চুল বেশি রেখে, সাইডের দিকটা ছোটো করে ছাঁটা হয়। সল্ট অ্যান্ড পিপার স্টাইলে এই আন্ডারকাট চুল খুব ভালো দেখায়। এছাড়া ক্লাসিক সাইড পার্টও এই ধরনের চুলে ভালো মানায়। খুব ছোটো ছোটো করে চুল ছেঁটে বাজ কাট করলে মুখ খুব শার্প দেখায়। পাকা চুলে স্টাইল করতে গেলে খেয়াল রাখতে হবে মাথার কোন অংশে পাকা চুলের গোছা বেশি। সারা মাথা জুড়ে কাঁচাপাকা চুল থাকলে এসব কাট ভালো মানাবে। যদি মাথার নির্দিষ্ট কোনো অংশে পাকা চুলের পরিমাণ বেশি থাকে, তাহলে সেই অংশটিকে ধরে স্টাইলিংয়ের কথা ভাবতে হবে। সামনের দিকে পাকা চুলের গোছা থাকলে চুলে জেল ব্যবহার করে সামনের পাকা অংশটিকে আলাদা করে স্পাইক করানো যায়। মুখে একটা ছকভাঙা লুক আসে। নতুন প্রজন্ম এই ধরনের হেয়ার কাট খুব পছন্দ করে। পিছনের দিকে সল্ট অ্যান্ড পিপার শেড বেশি থাকলে, সেই অংশকে ধরে পনিটেল করে নিলেও দেখতে ভালো লাগে।
মেয়েদের স্টাইল
মহিলারা সাদা চুল বা কাঁচাপাকা চুল দিয়ে অসাধারণ স্টাইল করতে পারেন। শ্যাগি কাট, ব্লান্ট বব, এ লাইন বব, লং অ্যাংগলড বব কাট ছোটো চুলের জন্য আদর্শ। এছাড়াও পিক্সি কাটও এখন খুব জনপ্রিয়। এতে পিছনদিকের চুল ছোটো থাকলেও সামনের দিকে চুলের লেন্থ বড়ো রাখা হয়। ফলে চুল খুব ঘন দেখায়। কপালের একদিক থেকে চুল ছাপিয়ে নেমে আসে। খুব স্মার্ট লুক এনে দেয়। বয়স ও মুখের আদল যেমনই হোক, এই কাট সবকিছুর সঙ্গেই মানানসই।
চুল একটু লম্বার দিকে হলে লেয়ার কাট ভালো বিকল্প। ধূসর চুলে লেয়ার দিলে ভলিউম ও সফট লুক তৈরি হয়। অনেকের আবার কোঁকড়া চুল হয়। সেক্ষেত্রে ওয়েভি গ্রে হেয়ার দেখতে ভালো লাগে। চুলে কার্ল থাকলে তার উপর ওয়েভ দিলে দেখতে ভারী সুন্দর লাগে। লম্বা চুল স্ট্রেট করে খুলে রাখলেও অভিজাত লুক তৈরি হয়। এছাড়া সাইড পার্টেড পনিটেল, আলগা খোঁপা, বা সামনের দিকের চুল পেঁচিয়ে পিন করাও পাকা চুলের সাজে খুব ট্রেন্ডি।
পাকা চুলের যত্ন
হেয়ার কাট তারপরে ব্লো ড্রাই করলেই যত্ন শেষ হয়ে যায় না। বরং যত্ন নিলে তবেই ভালো থাকবে সল্ট অ্যান্ড পিপার চুল। কীভাবে নেবেন যত্ন? বিশেষজ্ঞরা জানালেন, ‘পাকা চুলে হেয়ার সেরাম বা অয়েল ব্যবহার করলে শাইন বাড়ে। চুলের ধরন ও রোজকার রুটিন বুঝে শ্যাম্পু করতে হবে। শ্যাম্পুর পর কন্ডিশনিং করুন। চুলের ধরন অনুসারে চুলের যত্নেরও রকমফের হয়। মাথা বেশি ঘামলে একধরনের যত্ন, স্ক্যাল্প ড্রাই হলে আর এক ধরনের যত্ন। তাই সোশ্যাল মিডিয়া দেখে হঠাৎ কিছু কিনে চুলে মাখবেন না। বরং হেয়ার স্টাইলারের পরামর্শ নিয়ে চুল মেইনটেন করুন।’
মনীষা মুখোপাধ্যায়