Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / হেলথ

সিজার না নরমাল ডেলিভারি কোনটা বেশি নিরাপদ?

গর্ভাবস্থা একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। মানুষ ছাড়াও অন্যান্য বহু প্রাণীর গর্ভেও ভ্রূণ বেড়ে ওঠে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের সন্তান প্রসব হয়।

সিজার না নরমাল ডেলিভারি  কোনটা বেশি নিরাপদ?
  • ২৬ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুপ্রিয় নায়েক: গর্ভাবস্থা একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। মানুষ ছাড়াও অন্যান্য বহু প্রাণীর গর্ভেও ভ্রূণ বেড়ে ওঠে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের সন্তান প্রসব হয়। একমাত্র মানুষই সেই জীব, যে সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দেওয়ার কাজটি করে! ভ্যাজাইনাল ডেলিভারিকে নর্মাল ডেলিভারি বলা হয় কারণ তা প্রাকৃতিক পদ্ধতি। অথচ দুঃখের বিষয় আমরা শিক্ষিত উন্নত জীব হয়েও সিজারিয়ান সেকশনকেই প্রাকৃতিক পদ্ধতি বানিয়ে ফেলেছি!

Advertisement

সাধারণত, কোনও মহিলার আগের সন্তান নর্মাল ডেলিভারির মাধ্যমে হলে পরবর্তী সন্তানের ডেলিভারিও স্বাভাবিকভাবেই হবে বলে ধরা হয়। এছাড়া ইউটেরাসে বাচ্চার মাথা নীচের দিকে থাকলেও স্বাভাবিক প্রসবের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তবে মায়ের আগে সিজারিয়ান ডেলিভারি হয়ে থাকলে, ইউটেরাসে বাচ্চারা মাথা উপরের দিকে থাকলে সিজারিয়ান ডেলিভারি করানোর প্রয়োজন হতে পারে।
এছাড়া কাঙ্ক্ষিত তারিখের পরেও ব্যথা শুরু না হওয়া, ইউএসজিতে বাচ্চার জল শুকিয়ে যাওয়া, বাচ্চার ওজন কম থাকার মতো বিষয়গুলি সিজারিয়ান সেকশনের ঝুঁকি বাড়ায়। সমগ্র বিশ্বেই ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ডেলিভারিই করানো হয়। সাব সাহারান আফ্রিকায় স্বাভাবিক প্রসবের হার ৯৫ শতাংশ! বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লুএইচও-এর মতে সিজারিয়ান সেকশনের হার হওয়া উচিত—১০ থেকে ১৫ শতাংশ।
প্রত্যেক মায়েরই স্বাভাবিক প্রসবের জন্যই চেষ্টা করা দরকার। যেসব ক্ষেত্রে পরিকল্পনা করে সিজার করার প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে যতখানি সম্ভব প্রসবের প্রকৃত দিনের নিকটে থাকা দিনগুলিতে সিজার করানো উচিত। ৩৯ সপ্তাহ অবধি শিশুর গর্ভস্থ থাকা তার মানসিক ও শারীরিক বিকাশের পক্ষে উপযুক্ত! তাই এই সময়ের পরেই সিজারিয়ান ডেলিভারি করাতে পারলে ভালো।
নর্মাল ডেলিভারি কেন করাবেন?
মায়ের সুবিধা—
১. প্রসবের সময় মায়ের শরীরে অক্সিটোসিন, এন্ডোর্ফিনের মতো হরমোনের নিঃসরণ ঘটে। অক্সিটোসিন ইউটেরাসের সংকোচনে সাহায্য করে। ফলে এই হরমোন শিশুর জন্মের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে ও প্রসবের পরও জরায়ুকে সংকুচিত হতে সাহায্য করে। ফলে প্রসবোত্তর রক্তপাতের ঝুঁকি কমে। এই হর্মোন মায়ের সঙ্গে শিশুর বন্ধন ও এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং-এর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এন্ডোর্ফিন বেদনানাশক হিসেবে কাজ করে প্রসবের কষ্ট ও মানসিক চাপ কমায়।
২. স্বাভাবিক প্রসবে সি-সেকশনের মতো বড় কোনও অস্ত্রোপচার হয় না। ফলে সংক্রমণ, রক্তপাত, রক্ত জমাট বাঁধা, অ্যানেস্থেশিয়ার প্রতিক্রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গের আঘাতের ঝুঁকি অত্যন্ত কম থাকে।
৩. সন্তানের জন্মের পর মা দ্রুত সুস্থ হন। অস্ত্রোপচার না হওয়ায় মায়ের শরীরে পেশি এবং টিস্যুর উপর আঘাত কম হয়। এর ফলে মায়ের শরীর দ্রুত স্বাভাবিক হয় এবং গর্ভাবস্থার পরের ক্লান্তি এবং ব্যথা কম থাকে।
সন্তানের সুবিধা—
১. প্রসবের সময় শিশু যখন ভ্যাজাইনাল ওপেনিং দিয়ে বেরিয়ে আসে, তখন সে মায়ের ভ্যাজাইনা এবং অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসে। এই ব্যাকটেরিয়াগুলি শিশুর ত্বক, অন্ত্র এবং শ্বাসতন্ত্রে কলোনি তৈরি করে, যা শিশুর মাইক্রোবায়োম গঠনে প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপন করে। একটি সুস্থ মাইক্রোবায়োম রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঠিক বিকাশ, হজম প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যতে অ্যালার্জি, হাঁপানি  এবং অটোইমিউন রোগের মতো অবস্থার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।
২. শিশু ভ্যাজাইনাল ওপেনিং দিয়ে বেরিয়ে আসার ফলে শিশুর বুকের উপর চাপ পড়ে। এই চাপ ফুসফুসের অ্যামনিওটিক ফ্লুইড বের করে দিতে সাহায্য করে যা শিশুর জন্মের পর শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়।
৩. প্রসবের ধকল শিশুর শরীরে কর্টিসল এবং ক্যাটেকোলামাইন-এর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটায়। যা শিশুর অভিযোজন ক্ষমতা বাড়ায়।
৪. স্বাভাবিক প্রসবের পর মা ও শিশুর মধ্যে দ্রুত ত্বকের সঙ্গে ত্বকের যোগাযোগ স্থাপন করা সহজ হয়। এই যোগাযোগ এবং মায়ের শরীরে অক্সিটোসিনের প্রবাহ শিশুকে দ্রুত স্তন্যপান শুরু করতে উৎসাহিত করে। প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কোলোস্ট্রাম পান শিশুর ইমিউনিটি বাড়াতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। 
৪. কিছু গবেষণা জানাচ্ছে, স্বাভাবিক প্রসবের সময়ের উদ্দীপনা শিশুর ব্রেনের নির্দিষ্ট কিছু অংশের সক্রিয়তায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা তার স্নায়ুর বিকাশের জন্য উপকারী হতে পারে।
এই বৈজ্ঞানিক কারণগুলোই স্বাভাবিক প্রসবকে মা ও শিশুর জন্য একটি আদর্শ পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ