পিনাকী ঢোলে, সিউড়ি: বীরভূমের পাথর মাফিয়া টুলু মণ্ডলের জাল ডিসিআর কাণ্ডে প্রাক্তন ব্লক ভূমি আধিকারিক গ্রেপ্তার হতেই প্রশাসনের অন্দরে শোরগোল পড়েছে। এতদিন কেবল নিচুতলার কর্মী বা টুলুর শাগরেদরাই ধরা পড়ছিল। কিন্তু মহম্মদবাজারের প্রাক্তন বিএলএলআরও সব্যসাচী মণ্ডল শ্রীঘরে যাওয়ায় জেলা থেকে রাজ্যস্তরের অনেক রাঘববোয়ালের কার্যত ঘুম উবে গিয়েছে। রবিবার আদালত সব্যসাচীবাবুকে পাঁচদিন পুলিশি হেফাজতে পাঠিয়েছে। তাঁকে ম্যারাথন জেরা করছেন তদন্তকারীরা। সেই জেরায় এবার প্রভাবশালীদের নাম ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় রীতিমতো জল্পনা শুরু হয়েছে।
পুলিশ সূত্রের খবর, এই মেগা দুর্নীতিতে এখনও পর্যন্ত তিনজন সরকারি কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভূমিদপ্তরের একাধিক কর্তাকে নোটিস পাঠিয়ে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন করছেন তদন্তকারীরা। সূত্রের খবর, একাধিক ডব্লুবিসিএস অফিসারও পুলিশের কড়া নজরে রয়েছেন। ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, টুলুর এই বিপুল বেআইনি সাম্রাজ্য পুলিশ-প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের মদত ছাড়া যে কোনোভাবেই চলতে পারে না, তা ওপেন সিক্রেট। অভিযোগ, টুলুর এই কারবারকে অবাধ ছাড়পত্র দিতে গিয়ে জেলার তৎকালীন রাজনৈতিক ‘কেষ্ট-বিষ্টু’ থেকে শুরু করে পুলিশ ও প্রশাসনের একাধিক শীর্ষকর্তা নিয়মিত মোটা অঙ্কের ‘প্রসাদ’ পেয়েছেন। রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কোটি কোটি টাকা লুটের পাশাপাশি নিজের কারবার নিষ্কণ্টক রাখতে অকাতরে দানধ্যানও করেছেন টুলু। পুলিশ-প্রশাসন এবং টুলুর সিন্ডিকেট একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে।
অভিযোগ, বীরভূমে বিভিন্ন সময়ে ডিউটি করতে আসা ওইসব পুলিশ ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের অনেকেই দুর্নীতির কালো টাকায় রাতারাতি ফুলেফেঁপে উঠেছেন। বেনামে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট সহ বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন তাঁরা। সেইসময় টুলুর দেওয়া অবৈধ টাকার ওই ‘প্রসাদ’ মধুর মনে হলেও এখন তা অনেকের কাছেই বিষ-সম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধরা পড়ার ভয়ে সেইসব রাঘববোয়ালদের রাতের ঘুম উবে গিয়েছে। অনেকের জোরালো দাবি, অবিলম্বে ওইসব কর্তাদের সম্পত্তির খতিয়ান খতিয়ে দেখা হোক।
আদালতে অভিযুক্তদের আইনজীবীরা একাধিকবার প্রশ্ন তুলেছেন, ‘যাঁরা দিনের পর দিন এই লুটের বখরা নিলেন, সেই আসল মাথাদের কবে ধরবে পুলিশ?’ এতদিন যার কোনো সদুত্তর পুলিশের তরফে মেলেনি। তবে নিচুতলার কর্মীদের জেরা করে তত্কালীন বিএলএলআরওকে জালে তুলেছে পুলিশ। তাঁকে জেরা করলে নিশ্চিতভাবেই জেলা ও রাজ্যের কোন কোন প্রশাসনিক কর্তা টুলুর কারবারে মদত দিয়ে লাভের গুড় খেয়েছেন, তা সামনে আসবে। তবে, উপরতলার কর্তাদের বিরুদ্ধে আদৌ পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না এখন সেটাই দেখার।
পাশাপাশি, টুলুর এই জাল ডিসিআর কাণ্ডের তদন্ত স্রেফ মহম্মদবাজার কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। বাস্তবে এই বেআইনি কারবার অক্টোপাসের মতো গোটা বীরভূমজুড়েই ছড়িয়েছিল। বিগত তৃণমূল জমানায় রামপুরহাট, নলহাটি সহ জেলার পাথর শিল্পাঞ্চলের প্রতিটি চেকগেটের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক ছিল ‘টুলু অ্যান্ড কোম্পানি’। ফলে, জেলাজুড়েই জাল ডিসিআরের কারবার চলত। তাই তদন্ত মহম্মদবাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি অন্যান্য ব্লকেও তল্লাশি অভিযান শুরু হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।