Bartaman Logo
৩০ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

যেখানে দেখিবে ছাই

জনৈকা অনিতা পাফ নামক এক অধ্যাপিকা সম্প্রতি আবেদন জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টে। তাঁর আরজি, জাপানের রেনকোজি মন্দিরে রক্ষিত তথাকথিত চিতাভস্ম নেতাজিরই।

যেখানে দেখিবে ছাই
  • ৩০ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সৈকত নিয়োগী: জনৈকা অনিতা পাফ নামক এক অধ্যাপিকা সম্প্রতি আবেদন জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টে। তাঁর আরজি, জাপানের রেনকোজি মন্দিরে রক্ষিত তথাকথিত চিতাভস্ম নেতাজিরই। তা যেন অবিলম্বে ভারতে ফিরিয়ে এনে জনসমক্ষে ‘নেতাজিরই চিতাভস্ম’ বলে ঘোষণা করা হয়। জনৈকা অনিতা পাফ, যিনি নেতাজির স্বঘোষিত কন্যা। তাঁর মা ফ্রাউ এমিলি শেঙ্কেল ছিলেন ‘ম্যাজোটা’র স্টেনোগ্রাফার। অস্ট্রিয়ার সোফিয়েনস্ট্রাসে রাস্তার উপর বাড়িতে ফ্রেইস ইন্ডিয়েনের প্রধান সুভাষচন্দ্র বসুর কর্মোদ্যোগে সহায়তা করেছিলেন শ্রদ্ধেয়া এমিলি। কিন্তু তাই বলে মহাযুদ্ধের অগ্নিনির্ঝর রণভূমে বিবাহ? 

Advertisement

‘যে ব্যক্তি আগুনে ঝাঁপ দিতে চলেছে, সে কি এতটা নিষ্ঠুর খুনি হতে পারে যে, মরণকূপে ঝাঁপ দেওয়ার ঠিক আগে একজন নারীকে অ-শুভ পরিণয়ে আবদ্ধ করবে? আর কোনো নারী যদি এমন একজন পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে চান, তাহলে সেই পুরুষের পক্ষে কি বলা স্বাভাবিক নয়— ‘আচ্ছা, আমাকে আগে এই আসন্ন বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে দাও; সবকিছু শেষ হয়ে গেলে আমরা এ বিষয়ে ভাবতে পারি?’ একথা দেশনায়কের আপ্তবাক্য। অজ্ঞাতবাসকালে এভাবেই তিনি বিবাহতত্ত্বের ষড়যন্ত্র সামনে এনেছিলেন। কিন্তু এই বিবাহতত্ত্বের প্রয়োজন কেন পড়ল? নেতাজির তথাকথিত বিমান দুর্ঘটনার তত্ত্ব জনমানসে ধিক্কৃত হয়েছে তথ্যের আলোকে। বসু পরিবারের সমকালীন প্রজন্ম তথাকথিত চিতাভস্ম আনার প্রয়াস বর্জন করেছিল। তাই পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর মস্তিষ্কপ্রসূত এই বিবাহ-ষড়যন্ত্রের অবতারণা, যাতে উত্তর প্রজন্মে সেই আবেগ প্রশমিত হলে এই প্রয়াস স্ত্রী-কন্যার পক্ষ থেকে করা সম্ভব হয়।
১৯৫৪ সালের ২৪শে মে ইন্ডিয়ান ইনফর্মেশন সার্ভিসের নথি অনুসারে, আজাদ হিন্দ সেনা তহবিলের দুই লক্ষ টাকা জনৈকা অনিতা বোসের কল্যাণে ব্যয় করা হয়েছিল। ২৩ মে সে কথা কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিকে জানান দলের প্রেসিডেন্ট পণ্ডিত নেহরু। নেতাজির নামে নেহরু সরকারের বদান্যতায় অর্থ সাহায্য নিয়ে গিয়েছেন এমিলি শেঙ্কেল ও কন্যা অনিতা, দশকের পর দশক! ডিক্লাসিফায়েড নথিপত্রে এমিলির আচরণ প্রসঙ্গে রহস্যময়তার উল্লেখ রয়েছে—‘She is sure that Mr. Subhas Bose is dead, but keeps on telling visitors that she has the feeling that he is alive. To those who ask her why she does not go to India, she replies cleverly that she would go to India with Mr. Subhas Bose when he comes back.’ তবে কি প্রকৃতপক্ষে এমিলির মনে আশঙ্কা ছিল, সুভাষচন্দ্র ভারতে ফিরে এলে এই ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যাবে? অন্যদিকে, পণ্ডিতজি অবশ্য নেতাজির তদন্তে উৎসাহী না হলেও অনিতার ভবিষ্যৎ একেবারে সোনায় বাঁধিয়ে দিলেন ট্রাস্ট ডিড নির্মাণ করে। ডিক্লাসিফায়েড নথিতে তার প্রমাণ আছে। সেখানে লেখা—‘The Trust Deed which is going to lead to Anita receiving sums of money in future is not conditional on her being an Indian citizen or otherwise. This is irrespective of her citizenship...’  
ভারত সরকার কর্তৃক মা এবং মেয়ের প্রতি ব্যয়ের কিছু হিসাবও সরকারি নথিতে উল্লিখিত। গত শতাব্দীর পাঁচের দশকের অশান্ত সময়। উদ্বাস্তু সমস্যায় সুভাষচন্দ্রের শহর কলকাতার প্রাণ ওষ্ঠাগত। ছিন্নমূল মানুষের ঢল নেমেছে প্রাক্তন রাজধানী অভিমুখে। পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নির্যাতনের বিরুদ্ধে নেহরুর পদত্যাগ দাবি করলেন সুভাষচন্দ্রের হোমফ্রন্টের নেত্রী লীলা রায়। আর তখন পণ্ডিত নেহরুর নেতৃত্বে ভারত সরকার অনিতা ও এমিলির জন্য নববর্ষের ফুল ও মিষ্টি বাবদ ষাট টাকা, ষাট টাকার লিপটনের চা, আশি টাকার কাফে বাস্তেই সিগারেট, একশো দশ টাকার ব্রিটিশ সিগারেট (হোটেল সাচের), সেন্ট নিকোলাস ডে চকোলেট, জামাকাপড় প্রভৃতি প্রেরণ করে চলেছে। মাত্র এগারো বছর বয়স অনিতার, তখন থেকেই ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি ফান্ডের ভাগ পেতে শুরু করেছিলেন। সেই ট্র্যাডিশন কি এখনও চলছে? নাকি সেই টাকায় ভাটার টানেই আজ নেতাজির মিথ্যে চিতাভস্মকে মান্যতা দিতে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন।
জাপানের রেনকোজি মন্দিরে রক্ষিত চিতাভস্মের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে এক বিরাট প্রশ্ন দশকের পর দশক ধরে বিরাজ করছে। ১৯৫৩ সালের ২৭ জানুয়ারি যার গোড়াপত্তন ঘটে। জাপানের জনপ্রিয় ‘'দ্য মাইনিচি’ সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ‘সুভাষচন্দ্র বসুর চিতাভস্ম পাওয়া গিয়েছে টোকিওতে।’ মাত্র সাত বছর আগে স্বাধীন হয়েছে ভারত। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বৈদেশিক সম্পর্ক বড্ড ছন্নছাড়া। টোকিওর কারাকু হোটেলে বসেছে ভারত-জাপ ভ্রাতৃ সংঘের বৈঠক। সেখানে হঠাৎই হাজির হলেন এক বৌদ্ধ পুরোহিত, রেনকোজি মন্দিরের কাইয়োয়ি মোচিজুকি। তিনি বললেন, ১৯৪৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বেশ কিছু ভারতীয় সৈন্য এসে তাকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর চিতাভস্ম সংবলিত পাত্রটি সংরক্ষণের জন্য দিয়ে যায়। কিন্তু সেই সেনাদের পরিচয় কী? নেতাজির বিমান দুর্ঘটনা ঘটল ১৮ আগস্ট আর চিতাভস্ম রেনকোজির মন্দিরে এল সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে।  এতদিন ভস্মাধারটি কোথায় ছিল? কার উদ্যোগে সেটি রেনকোজির মন্দিরে পাঠানো হল? পুরোহিত সদুত্তর দিতে পারেননি। তবু ‘নেতাজি-কন্যা’ অনিতা পাফের নেতৃত্বে বসু পরিবারের উত্তর প্রজন্মের একাংশ সেই চিতাভস্ম ভারতে আনার দাবি করে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ান সরকারের স্পষ্ট বার্তা, নেতাজির তথাকথিত বিমান দুর্ঘটনার কোনো প্রমাণ তাদের কাছে নেই। তবু সেই ষড়যন্ত্র থামার নাম নেই।
কলেজ স্ট্রিট বইপাড়া সংলগ্ন ট্যামার লেন। বন্ধ গলিতে ঢুকলেই বাঁহাতে লিটন ম্যাগাজিন লাইব্রেরি। পাশ কাটিয়ে দুটো দোকান এগলেই পুরনো জীর্ণ বাড়ির গায়ে জেলখানার মতো গরাদ জানালা দেওয়া একটা দোকানঘর। বড়ো অদ্ভুত সেই দোকান। নিয়মিত খোলে, তবে শুধু শনিবার। বইপত্রে ঠাসা, কিন্তু আসল উদ্দেশ্য নেতাজির কথা প্রচার করা... দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কেমনভাবে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের শব্দ দিয়ে চলত এই কলকাতা শহরে আজাদ হিন্দের সিক্রেট কোড কিংবা কীভাবে নেতাজির হোমফ্রন্টে জড়িয়ে পড়লেন ছিলেন অনুশীলন-যুগান্তর দলের বিপ্লবীরা। নিবেদিতপ্রাণ এক চিরতরুণ বলে যান নেতাজির জীবিত থাকার গল্প। দেখান নেতাজির হাতের লেখা। ছয়-সাত-আটের দশকে মুখার্জি কমিশনে ‘ডিপোনেন্ট’ ছিলেন তাঁরা। ১৯৩১ সালে প্রতিষ্ঠিত বিপ্লবী দেশনেত্রী লীলা রায়ের ‘জয়শ্রী’ পত্রিকা স্বাধীন ভারতে পরিণত হয়েছিল নেতাজি যোদ্ধায়। কাশীকান্ত মৈত্র,  রামমনোহর লোহিয়া, পবিত্র মোহন রায়, সমর গুহরা দশকের পর দশক ধরে আদালতে, বিধানসভায় রুখেছেন নেতাজির মৃত্যুতত্ত্ব প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র! নেতাজির বিপ্লব লক্ষ্য বদলেছে, বদলায়নি আদর্শ। নেতাজি অনুগামী, গবেষকদের মধ্যে অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আছে নিশ্চিত। কিন্তু নেতাজির চিতাভস্মের প্রসঙ্গ এলেই সব বিরোধের অবসান হয়। মনে পড়ে সুভাষচন্দ্রের সেই রাজনীতির দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় দিনের কথা। ঠাকুরবাড়ির বিপ্লবী নেতা সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর সেবার বলেছিলেন, ‘সুভাষবাবু, আপনি ‘অমুক’ দলকে বাম সংহতি কমিটিতে নিয়েছেন! ওরা কনফর্মিস্ট!’ সুভাষবাবুর স্পষ্ট উত্তর ছিল, ‘মতাদর্শের সংঘাত হবে স্বাধীন ভারতে, সংসদীয় গণতন্ত্রে। স্বাধীনতার যুদ্ধ সবাই একসঙ্গেই লড়ব।’ তেমনই আজ নেতাজি গবেষকদের মধ্যে যতই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-সংঘাত অবস্থান করুক, চিতাভস্ম এনে মিথ্যে বিমান দুর্ঘটনা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস একজোটে যুক্তি-তথ্যে রুখতে হবে। নেতাজি কোনো পারিবারিক সম্পত্তি নন, অখণ্ড ভারতের অনির্বাণ আলোকবর্তিকা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ