Bartaman Logo
৩০ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

খেলায় বাড়ে প্রীতি

ছাত্রজীবনে খেলাধুলোর ভূমিকা অপরিসীম। খেলাধুলো যেমন মানুষকে সুস্থ রাখে, তেমনই নিয়মানুবর্তিতার পাঠ দেয়। খেলাধুলোর উপযোগিতা নিয়ে লিখল দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার গণিপুর হাই স্কুলের পড়ুয়ারা।

খেলায় বাড়ে প্রীতি
  • ৩০ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ছাত্রজীবনে খেলাধুলোর ভূমিকা অপরিসীম। খেলাধুলো যেমন মানুষকে সুস্থ রাখে, তেমনই নিয়মানুবর্তিতার পাঠ দেয়। খেলাধুলোর উপযোগিতা নিয়ে লিখল দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার গণিপুর হাই স্কুলের পড়ুয়ারা।

Advertisement

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ খেলাধুলো
ছাত্রজীবন হল মানুষের গড়ে ওঠার সময়। খেলাধুলো ছাত্রদের মানসিক ও দৈহিক— দু’ভাবেই দৃঢ় করে তোলে। তাই ছাত্রাবস্থায় খেলাধুলোর ভূমিকা অপরিসীম। খেলাধুলো যেমন ছাত্রদের শিক্ষা দেয়, তেমনই দেয় নৈতিকার পাঠ। মাঠই শিক্ষা দেয় কীভাবে জয় উদ্‌যাপন করতে হয়, কীভাবে পরাজয়কে মেনে নিতে হয়। পড়ুয়াদের মধ্যে বন্ধুত্ব আরও গভীর করে। তবে, এখন চলছে খেলাধুলোর সংকটকাল। এখনকার অনেক বাচ্চা মাঠকে ভুলেই গিয়েছে। ধাপসা, বুড়িবসন্ত, কুমির-ডাঙার মতো দলবদ্ধ গ্রামীণ খেলাগুলি হারিয়ে যেতে বসেছে। অনেকে ক্রিকেট, ফুটবল খেললেও লেখাপড়ার চাপ ও মাঠের অভাবে তা চালিয়ে যাওয়া মুশকিল। তাই বেশিরভাগ স্কুল পড়ুয়াই এখন মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ঘেঁটেই অবসর সময় কাটায়। খেলাধুলোর অভাবে আমরা শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছি।
—দীপ্র মণ্ডল, অষ্টম শ্রেণি

বন্ধুত্ব প্রগাঢ় হয়
এখন প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তি যেমন মানুষকে অনেক কিছু দিয়েছে, তেমনই কেড়ে নিয়েছে বেশ কিছু জিনিস। তেমনই একটি বিষয় সোশ্যাল মিডিয়া। আমার বাবা সব সময় বলেন, ‘স্কুল পড়ুয়াদের কখনো সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট খোলা বা এগুলি ব্যবহার করা উচিত নয়। ভার্চুয়াল জগৎ ছোটোদের জন্য নয়।’ তাই খেলাধুলোই একমাত্র আমাদের বয়সিদের বন্ধুত্বকে প্রগাঢ় করতে পারে। আমি পাড়ার মাঠে ফুটবল খেলি। স্কুলে টিফিন টাইমে বন্ধুরা ছোটাছুটি করি। ধরাধরি খেলি। ভারত-পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত খারাপ। কিন্তু খেলার মাঠে দেখেছি, ক্রিকেটাররা একে অপরকে হাসি উপহার দিচ্ছে। অর্থাৎ, খেলা অনেক শত্রুতা ভুলিয়ে দিতে পারে। খেলা মানুষকে আনন্দ দেয়। তাই ২০২৪ সালে টি-২০ বিশ্বকাপ জেতার পর হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেছিলেন মুম্বইয়ের মেরিন ড্রাইভে ভারতের ‘ভিকট্রি প্যারেডে’। অনেক সময়ই দেখা যায়, পাড়ার কোনো মাঠে খেলা দেখে পথচলতি মানুষ থমকে দাঁড়াচ্ছেন। তাই শুধু ছাত্রদেরই নয়, খেলা যেকোনো বয়সের মানুষকে আনন্দ দিতে পারে।
—অনিকেত দাস, সপ্তম শ্রেণি

শৃঙ্খলাবোধ গড়ে তোলে
ছাত্রজীবনে শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলোর প্রয়োজনীয়তা অনেকখানি। এটি শুধু শরীর-স্বাস্থ্য ভালো রাখে না, সুস্থ মন গঠনেও সাহায্য করে। নিয়মিত খেলাধুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মানুবর্তিতা ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। খেলার মাঠে একে অপরের সঙ্গে মেল বন্ধন ঘটিয়ে সামাজিকীকরণ ঘটাতে সাহায্য করে। যা গভীর বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য গড়ে তুলতে সাহায্য করে। খেলাধুলোর ফলে একাগ্রতা ও ধৈর্য বৃদ্ধি পায়। যা পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াতে দারুণভাবে সাহায্য করে। এছাড়াও খেলাধুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্তরে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
—কণিষ্ক শীল, অষ্টম শ্রেণি

শরীর সুস্থ রাখে
ছাত্রজীবনে খেলাধুলোর ভূমিকা অপরিসীম। নিয়মিত খেলাধুলো শরীরকে সুস্থ ও সবল রাখে। মনকে প্রফুল্ল করে। এছাড়া খেলাধুলোর মধ্যে দিয়ে আমরা শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে পারি। দলগত খেলায় অংশগ্রহণের ফলে একে অপরের প্রতি সহযোগিতা ও সৌভ্রাতৃত্ববোধের বিকাশ ঘটানো সম্ভব। বিভিন্ন ধর্ম, জাতি ও ভাষার শিশু-কিশোররা একসঙ্গে খেলাধুলো করে। এর ফলে পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়। তাই ছাত্রজীবনে খেলাধুলো শুধুমাত্র শরীরচর্চার মাধ্যম নয়। বরং আদর্শ চরিত্র গঠন ও সৌভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
—গৌরব পাল, নবম শ্রেণি

নিয়মানুবর্তিতা শেখায়
খেলাধুলো আমাদের নিয়মানুবর্তিতা শেখায়। নিয়ম মেনে চলা এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে খেলাধুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কোচ, রেফারি, আম্পিয়ারের প্রতি যেমন আমাদের শ্রদ্ধাবোধ থাকে। তেমনই সহ-খেলায়াড়দের প্রতি থাকে অগাধ ভালোবাসা। খেলার মাধ্যমেই আমরা আমাদের লক্ষ্যস্থির করতে পারি। আমাদের চরিত্রে গড়ে ওঠে শৃঙ্খলাবোধ। জয় ও পরাজয় একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। সবাই জয়ে আনন্দিত হয়, কিন্তু পরাজয়কে সহজে মেনে নিতে পারে না। কিন্তু কবি বলেছেন, ‘সত্যকে লও সহজে’। খেলাধুলোর মাধ্যমে আমাদের মধ্যে পরাজয়কে মেনে নেওয়ার শক্তি গড়ে ওঠে।
—চান্দ্রেয় কয়াল, অষ্টম শ্রেণি

চরিত্র গঠনের শ্রেষ্ঠ পাঠশালা
ছাত্রজীবন চরিত্র গঠনের মূল সময়। আর এই সময়ে খেলাধুলোর ভূমিকা অপরিসীম। প্রথমত, খেলাধুলো শরীরকে সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম রাখে। এটি স্থূলতা ও বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করে। দ্বিতীয়ত, খেলা মনকে সতেজ রাখে। পড়াশোনার চাপ ও মানসিক অবসাদ দূর করতে এটি খুব সাহায্য করে। তৃতীয়ত, মাঠই হল চরিত্র গঠনের শ্রেষ্ঠ পাঠশালা। খেলার মাধ্যমে শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, সহযোগিতা ও দলগতভাবে কাজ করার শিক্ষা পাওয়া যায়। জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়। এতে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ে। তাই সুস্থ দেহ ও সুন্দর মন গঠনের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিদিন খেলাধুলো করা প্রত্যেক পড়ুয়ার একান্ত কর্তব্য। যদিও বর্তমান সময়ে অত্যধিক মোবাইলকেন্দ্রিক জীবনে আবদ্ধ আমাদের ছাত্রসমাজ। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার অন্যতম সেরা পথ খেলাধুলো।
—জয়ন্তী সাঁতরা, একাদশ শ্রেণি

প্রধান শিক্ষিকার কলমে

 দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার মহেশতলা বিধানসভা এলাকার অন্তর্গত একটি সুপরিচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গণিপুর হাই স্কুল। এই স্কুলে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পঠনপাঠন হয়। গণিপুর ও আশপাশের শিক্ষানুরাগী মানুষজন মিলে ১৯৫৪ সালে এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে নীচু ক্লাসের পড়াশোনা হলেও ১৯৬৭ সালে স্কুল ফাইনাল (মাধ্যমিক সমতুল) স্তরে উন্নীত হয়। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের অনুমোদন মেলে ২০০৯ সালে। শুরু হয় বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও কলা বিভাগের পঠনপাঠন।
প্রায় একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষক সংসদ অনুমোদন দেয় ছ’মাসের শর্ট টার্ম কোর্স করানোর। ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং ও ব্লাড কালেকশন অ্যাসিস্ট্যান্টের কোর্স শুরু হয়। ২০১০ সালে ভোকেশনাল এইচএস আইটিইএস ও হেলথ কেয়ার পড়ানোর স্বীকৃতি পায়।
এই বিদ্যালয়ের মুকুটে শেষ পালক যুক্ত হয় ২০২৩ সালে। বাংলা মাধ্যমের পাশাপাশি ইংরেজি মিডিয়ামের পড়াশোনাও শুরু হয়। এছাড়াও ড্রপআউট ছাত্রছাত্রীদের কথা চিন্তা করে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ওপেন স্কুলিংয়ের স্টাডি সেন্টার খোলারও স্বীকৃতি পেয়েছে।
গণিপুর হাই স্কুল থেকে প্রতি বছরই পড়ুয়া মাধ্যমিক  ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় বেশ ভালো ফল করে। পড়াশোনার পাশাপাশি সহ-পাঠক্রমিক বিষয়গুলির উপরেও যথেষ্ট জোর দেওয়া হয়। সারা বছর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, ফুটবল, ক্রিকেট, শারীরশিক্ষা ও স্কাউটের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এখানকার পড়ুয়ারা মহিলা ফুটবল, রাইফেল শ্যুটিং, ক্যুইজ সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ব্লক, রাজ্য ও জাতীয় স্তরে উজ্জ্বল প্রতিভার স্বাক্ষর রাখে।
এই স্কুলের ছাত্রছাত্রী সংখ্যা প্রায় ১২০০। প্রয়োজন আরও শ্রেণিকক্ষ, স্মার্ট ক্লাসরুম, সাইকেল স্ট্যান্ড। সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে গণিপুর হাই স্কুল দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে। শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মী ও অভিভাবকরা পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন। এ প্রসঙ্গে দু’জন ব্যক্তিকে স্মরণ না করলে অন্যায় হবে। প্রথমজন এই বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষক স্বর্গীয় মণীন্দ্রলাল সরকার এবং সদ্য প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক তথা ‘শিক্ষারত্ন’ সম্মানে ভূষিত ডঃ পল্লবকুমার দত্ত। এই স্কুল ভবিষ্যতে আরও উন্নতি করবে, এই কামনা করি।
—চিত্রালী কুণ্ডু (চক্রবর্তী)
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ