Bartaman Logo
৩০ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

মৃত্যুসমুদ্রের নাবিক

ইউ-১৮০ সাবমেরিনের ছাদে উঠে এলেন তিনি। এই মুহূর্তে তাঁকে দেখলে সেই ধুতি-পাঞ্জাবি পরা, মাথায় খদ্দরের টুপি পরা সৌম্য চেহারার মানুষটি বলে কল্পনা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব।

মৃত্যুসমুদ্রের নাবিক
  • ৩০ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

রাজা ভট্টাচার্য: ইউ-১৮০ সাবমেরিনের ছাদে উঠে এলেন তিনি। এই মুহূর্তে তাঁকে দেখলে সেই ধুতি-পাঞ্জাবি পরা, মাথায় খদ্দরের টুপি পরা সৌম্য চেহারার মানুষটি বলে কল্পনা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। তাঁর পরনে এখন নাবিকের ইউনিফর্ম, চোখে চশমা, গালে দাড়ি। হঠাৎ দেখলে কাছের মানুষেরাও বোধহয় চিনতে পারবেন না তাঁকে। প্রায় আড়াই মাস তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন এই সাবমেরিনের ভিতরে। পেরিয়ে এসেছেন এক অতি দীর্ঘ পথ। 

Advertisement

আজ থেকে ঠিক আশি দিন আগে জার্মানির কিয়েল শহর থেকে যাত্রা করেছিল একটি জার্মান ইউ-বোট। অকল্পনীয় শক্তির অধিকারী এই জার্মান সাবমেরিনের পেটের ভিতর একসঙ্গে বাস করতে পারেন মোটামুটি ৫০ থেকে ৫৫জন মানুষ। টানা দু’দিন জলের তলায় থাকতে পারে ডুবোজাহাজটি। চব্বিশটি দুর্দান্ত টর্পেডো আছে এর অস্ত্রভাণ্ডারে। আছে অ্যান্টি-এয়ারক্রাফ্‌ট গান। 
এর প্রত্যেকটারই দরকার পড়তে পারত, কারণ এই সাবমেরিনটি পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক একটি সফর শুরু করেছিল জার্মানির কিয়েল বন্দর থেকে। তারপর তা পেরিয়ে এসেছে লম্বা পথ। ইউরোপ থেকে যাত্রা করে, গোটা আফ্রিকার উপকূল অতিক্রম করে, আফ্রিকার দক্ষিণতম বিন্দু ‘কেপ অব গুড হোপ’ পেরিয়ে এই মুহূর্তে সাবমেরিনটি এসে পৌঁছেছে মাদাগাস্কারের উপকূলে। গোটা যাত্রাপথটাই ছিল সাক্ষাৎ নরক। প্রতি পদে মৃত্যুর হাতছানি পেরিয়ে আসতে হয়েছে তাঁকে, কারণ...
কারণ এখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চরম পর্যায়ে চলছে। ১৯৪৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে এই ডুবোজাহাজ যখন তার ভয়ংকরতম অভিযানে বেরিয়েছিল, তখন গোটা সমুদ্রপথটাকে আতঙ্কিত করে রেখেছিল মিত্রশক্তির জাহাজ। জলের তলা দিয়ে যে নিঃশব্দে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে চলেছে জার্মান সাবমেরিন, সেটা একবার প্রকাশ্যে এসে যাওয়ার একটাই অর্থ হয়— বোমার আঘাত আর সলিলসমাধি। তা ছাড়াও পদে পদে ছিল প্রাণঘাতী মাইন-এর ভয়। সবচেয়ে বড়ো কথা, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট আদেশ ছিল— জাহাজের একমাত্র অসামরিক যাত্রী মিস্টার মাৎসুদাকে যেকোনো মূল্যে জীবন্ত অবস্থায় তাঁর গন্তব্যে পৌঁছে দিতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো অসামরিক ভারতীয় ব্যক্তি সাবমেরিনের মাধ্যমে এত দীর্ঘ সমুদ্রপথ অতিক্রম করতে চলেছেন। তাঁরই নাম মিঃ মাৎসুদা। আর সেই পথের প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুভয়। 
অথচ মিঃ মাৎসুদাকে দেখে একবারের জন্যও মনে হয়নি, সেই মৃত্যুভয় তাঁকে আদৌ স্পর্শ করতে পেরেছে। ডুবোজাহাজের ভিতরের দম বন্ধ করা পরিবেশেও তিনি যেন অবিচল। হাসিমুখে কথা বলেছেন সবার সঙ্গে। নীচু গলায় গল্প করেছেন তাঁর একমাত্র সহকারী মেজর আবিদ হাসানের সঙ্গে। গভীর মনোযোগের সঙ্গে এঁকে নিয়েছেন জার্মান সাবমেরিনের নকশা। পোড় খাওয়া জার্মান নাবিকেরাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, এরকম কোনো মানুষ তাঁরা কখনো কল্পনাও করেননি। 
কিন্তু আজ এক মাহেন্দ্রক্ষণ। উত্তমাশা অন্তরীপ পার হয়ে জার্মান সাবমেরিন এসে পৌঁছে গিয়েছে তার গন্তব্যে। এখান থেকে আবছা দেখা যাচ্ছে মাদাগাস্কারের উপকূল। একটু আগেই খুব সন্তর্পণে জলের উপরে ভেসে উঠেছে ইউ-১৮০। তার আগেই অবশ্য পেরিস্কোপের গুপ্ত-চক্ষু দেখে নিয়েছে আর একটা দৃশ্য। জার্মান ইউ-বোটের উপস্থিতি টের পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অদূরে ভেসে উঠেছে আরও একটা সাবমেরিন। অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেনের তীক্ষ্ম চোখ চিনে নিতে ভুল করেনি, সেটা একটা জাপানি সাবমেরিন। আই-২৯। এই পর্যন্ত এসেই শেষ হচ্ছে জার্মানির দায়িত্ব। এইবার মিঃ মাৎসুদাকে তুলে নেবে জাপানিরা। আর সেই কারণেই ভেসে ওঠা সাবমেরিনের ছাদে উঠে এসেছেন তিনি। 
চারদিকে তাকিয়ে অবশ্য অন্য নাবিকদের মতোই তাঁকেও হতাশ হতে হল। আবহাওয়া মারাত্মক খারাপ। অসম্ভব জোরালো ঝোড়ো বাতাস বইছে। ভারত মহাসাগরের জল যেন টগবগ করে ফুটছে। এই অবস্থায় কোনোমতেই এক ডুবোজাহাজ থেকে আর এক ডুবোজাহাজে যাওয়া যাবে না। 
‘একটাই উপায় আছে।’ সামান্য অনিশ্চিত গলায় বললেন জার্মান ইউ-বোটের ক্যাপ্টেন, ‘আমরা বরং দুটো সাবমেরিনকে পাশাপাশি এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকি। যখন আবহাওয়া একটু ভালো হবে, তখন বরং আপনি একবার চেষ্টা করে দেখুন।’ 
অসম্ভব হতাশ চোখে উথালপাথাল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সেই আশ্চর্য যাত্রী। জলের ঝাপটায় ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ ভিজে গিয়েছেন তিনি। বারবার মুছে নিতে হচ্ছে চোখের চশমার কাচ। 
আরও কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে তিনি বললেন, ‘এছাড়া তো আর কোনো উপায় দেখছি না ক্যাপ্টেন। সেটাই করা যাক। এই মুহূর্তে ধৈর্য ধরা দরকার।’ 
অন্য নাবিকরাও একমত হল— এই অবস্থায় জলে নামার অর্থ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। আর তাদের উপরে কড়া নির্দেশ রয়েছে, কোনোভাবেই এই যাত্রীর প্রাণ বিপন্ন করা যাবে না। 
সরু দরজাটা খুলে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে সাবমেরিনের ভিতর নেমে এলেন সেই যাত্রী। আবিদ হাসান ঊর্ধ্বমুখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন সিঁড়ির নীচে। তাঁকে নেমে আসতে দেখে উৎকণ্ঠিত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী দেখলেন, মিঃ মাৎসুদা? কোনোমতেই ট্রান্সফার সম্ভব নয়?’ 
ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন তিনি। হতাশ গলায় বললেন, ‘এতখানি পথ পার হয়ে এসে যদি আবার অপেক্ষা করতে হয়, কেমন লাগে বল দেখি আবিদ! কিছু করার নেই। সত্যিই এই মুহূর্তে জলে নামা যাবে না।’ 
সান্ত্বনার সুরে আবিদ বললেন, ‘এতখানি পথ যখন পেরিয়ে আসতে পেরেছি, তখন আর কয়েকটা ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দোষ কী!’ 
কয়েক ঘণ্টায় অবশ্যই ব্যাপারটা মিটে গেল না। পরবর্তী দুটো দিন, যেন পৃথিবীর দীর্ঘতম আটচল্লিশ ঘণ্টা ধরে দুই সাবমেরিন পাশাপাশি এগতে লাগল। এতদিন হাসিমুখে সকলের সঙ্গে মেলামেশা করলেও এই সময়টুকু মিঃ মাৎসুদা বসে রইলেন পাথরের মতো মুখ করে। বোঝাই যাচ্ছে, শুধু ভারত মহাসাগরে নয়, তাঁর বুকের মধ্যে একটা ঝড় চলছে‌। কারওর সাহস হল না এগিয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলার। 
দু’দিন পরে অবশ্য ভাগ্যদেবতা প্রসন্ন হলেন। ঝড় থেমে গেল। জল অবশ্য এখনও ভয়ংকর অশান্ত হয়ে রয়েছে, কিন্তু সমুদ্রের এই অঞ্চলে এর চাইতে শান্ত পরিস্থিতি আশা করা যায় না। 
আবার সাবমেরিনের ছাদে উঠে এলেন মিঃ মাৎসুদা। ক্যাপ্টেন ইতিমধ্যেই উঠে এসেছেন। ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রয়েছেন জলের দিকে। বড়ো বড়ো ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে সাবমেরিনের উপর। টলমল করছে দৈত্যাকার ডুবোজাহাজটা। 
মিঃ মাৎসুদাকে ছাদে উঠে আসতে দেখে তিনি বললেন, ‘এর চাইতে ভালো অবস্থা অদূর ভবিষ্যতে আসবে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু আপনি কি...।’ 
মিঃ মাৎসুদা ঠান্ডা চোখে একবার তাকালেন ক্যাপ্টেনের দিকে। তারপর সরাসরি আদেশের সুরে বললেন, ‘লাইফবোট নামাতে বলুন, ক্যাপ্টেন।’ 
দ্বিধাগ্রস্ত চোখে এই অদ্ভুত যাত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন ক্যাপ্টেন। হায়ার অথরিটির আদেশের ব্যাপারটা বাদ দিলেও একটা কথা থেকেই যায়। এই ভারতীয় ভদ্রলোক একজন সম্পূর্ণ অসামরিক ব্যক্তিত্ব। ইতিমধ্যেই তিনি অমানুষিক চিত্তবলের পরিচয় দিয়েছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সেই মনের জোর জার্মান নাবিকদেরও শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে নিয়েছে। কিন্তু এই ফুঁসতে থাকা সমুদ্রে একটা অকিঞ্চিৎকর লাইফবোটে চড়ে একটা ডুবোজাহাজ থেকে আরেকটা ডুবোজাহাজে যাওয়ার পরিকল্পনাটাও নিছক আত্মহত্যা বলেই মনে হচ্ছে। 
তাঁর দুশ্চিন্তা আঁচ করতে অসুবিধা হল না মিঃ মাৎসুদার। শান্ত গলায় তিনি বললেন, ‘কিছু করার নেই, ক্যাপ্টেন। আমার স্বদেশ আমার অপেক্ষায় আছে। আপনি স্বাধীন দেশের নাগরিক। আমার মনের অবস্থা আপনি ঠিক বুঝতে পারবেন না। প্লিজ আপনার ক্রু-দের বলুন, আমি সমুদ্রে নামতে তৈরি। আমার সঙ্গীরও এতে কোনো আপত্তি নেই।’ 
আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন ক্যাপ্টেন। তারপর চড়া গলায় আদেশ দিলেন লাইফবোট নামানোর। তাঁর পাশে দাঁড়ানো বহু যুদ্ধের অভিজ্ঞতা পার হয়ে আসা নাবিকেরাও মুখ চাওয়াচাওয়ি করল একবার। তারপর জলে নামিয়ে দিল ছোট্ট একটা রাবারের ডিঙি। প্রচণ্ড ঢেউয়ে আছাড়ি-পিছাড়ি খাচ্ছে সেই ডিঙিটা, বারংবার আছড়ে পড়ছে সাবমেরিনের গায়ে। 
একবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বড়ো একটা নিঃশ্বাস নিলেন মিঃ মাৎসুদা। মুহূর্তের জন্য ঘুরে তাকালেন আবিদের দিকে। আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন তিনিও। ‌
পরের মুহূর্তেই নীচের লাইফবোটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি। মুহূর্তের জন্য মনে হল, ছোট্ট ডিঙিটা বোধহয় সেই আঘাতেই তলিয়ে যাবে ভারত মহাসাগরের অতলে। তা হল না অবশ্য। একবার খানিকটা তলিয়ে গিয়ে আবার ভেসে উঠল সেটা। ততক্ষণে সেই অদ্ভুত যাত্রী দু’হাতে তার কিনারা আঁকড়ে প্রায় শুয়ে পড়ে ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করে চলেছেন। কাজটা অসম্ভব কঠিন, কারণ প্রতিমুহূর্তে উন্মত্ত ঢেউ ডিঙিটাকে ছুড়ে দিচ্ছে আকাশে, পরক্ষণেই তা আবার আছড়ে পড়ছে জলে। 
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আরও একবার থরথর করে কেঁপে উঠল লাইফবোট। বোঝাই যাচ্ছে, আবিদ তাঁর সর্বাধিনায়ককে এই অবস্থাতেও অনুসরণ করে চলেছেন। সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখেও তাঁর আনুগত্য এতটুকু বিচলিত হয়নি। 
এবার দু’জনে শুরু করলেন সেই অসম্ভব কাজটা। দু’হাত দিয়ে জল কেটে তাঁরা ডিঙিটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন জাপানি সাবমেরিনের দিকে। সেই জাহাজের নাবিকেরাও অবশ্য ইতিমধ্যেই সেই মরণপণ লড়াইটা দেখতে পেয়েছেন। কারণ তার ছাদেও এই মুহূর্তে উঠে এসেছেন অন্তত কুড়িজন জাপানি নাবিক। সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য কিছু দেখলে মানুষের যেরকম মুখচ্ছবি হওয়া উচিত, তাঁদের অবস্থা এখন ঠিক সেরকম। বিস্ফারিত চোখে তাঁরা তাকিয়ে রয়েছেন অনন্ত মহাসাগরের বুকে তিল তিল করে এগিয়ে আসতে থাকা একটা ছোট্ট রাবারের ডিঙির দিকে। প্রতি মুহূর্তে ঢেউয়ের জিভ দিয়ে অনন্ত নোনা জলের রাশি গ্রাস করে নিতে চাইছে খুদে ডিঙিটাকে। বারংবার চোখের আড়াল হয়ে যাচ্ছে রাবারের তৈরি তুচ্ছ নৌকোটা। মনে হচ্ছে, সব সমেত বুঝি তলিয়ে গেল জলে। পরের মুহূর্তেই আবার নাছোড়বান্দা ডিঙিটা ভেসে উঠছে উত্তাল তরঙ্গের শীর্ষে। 
সমস্ত নিরাপত্তা সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দিয়ে নাবিকেরা এবার হাত তুলে চিৎকার করতে শুরু করলেন। হঠাৎই তাঁরা বুঝতে পেরেছেন, এই মুহূর্তে তাঁরা এক ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছেন। এক পরমাশ্চর্যের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ পেয়ে গিয়েছেন তাঁরা। এ আশ্চর্য অসম যুদ্ধ। জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর সম্মুখযুদ্ধ। আদিগন্ত টগবগ করে ফুটছে মৃত্যু, আর তার লেলিহান জিভ থেকে প্রাণপণে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে করতে ইঞ্চি ইঞ্চি করে জীবনের দিকে এগিয়ে আসছে দুটো মানুষ। 
প্রায় আধঘণ্টা পরে ডিঙিনৌকোটা এসে পৌঁছাল জাপানি সাবমেরিনের কাছাকাছি। তার উপরে উপুড় হয়ে শুয়ে আছেন দু’জন অপরাহত ভারতীয়। তাঁদের জামাকাপড় ছিঁড়েখুঁড়ে গিয়েছে ঢেউয়ের তীব্র আক্রোশে, ডিঙিটার অবস্থাও তথৈবচ। 
কিন্তু দু’জনের মুখে লেগে রয়েছে অপরাজিত প্রতিজ্ঞার রেখা। সমুদ্র অন্তহীন মৃত্যুর জাল বিছিয়েও অমৃতের বিন্দুটাকে গ্রাস করতে পারেনি। 
আর এইবার তাঁদের দিকে এগিয়ে এল কয়েক জোড়া হাত। অমানুষিক পরিশ্রমের পর শিশু যেন আশ্রয় পেয়ে গেল মায়ের কোলে। 
পরক্ষণেই চওড়া হাসি মুখে নিয়ে এগিয়ে এলেন জাপানি আই-২৯ সাবমেরিনের ক্যাপ্টেন মাসাও তেরাওকা। এতক্ষণে তিনিও হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন। দু’হাত দিয়ে মিঃ মাৎসুদার জলে ভিজে সাদা হয়ে যাওয়া হাত দুটো চেপে ধরে তিনি বললেন, ‘ওয়েলকাম, মিঃ মাৎসুদা। নাকি এখন আপনাকে মিঃ বোস বলতে পারি?’
একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে মৃদু হাসলেন তিনি। তারপরে বললেন, ‘স্বচ্ছন্দে বলতে পারেন। আমিই বোস। সমস্ত ভারতবর্ষের পক্ষ থেকে আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’ 
জাপানি কায়দায় মাথা নত করে অভিবাদন জানিয়ে ক্যাপ্টেন তেরাওকা বললেন, ‘এবার যাত্রা করা যাক। জাপানে ভারতীয় সৈনিকেরা তাঁদের নেতাকে দেখার জন্য অপেক্ষা করে আছেন, নেতাজি!’ 
সামরিক কায়দায় কপালে হাত ঠেকিয়ে দৃপ্ত পদক্ষেপে সিঁড়ি বেয়ে সাবমেরিনের ভেতরে নেমে গেলেন সুভাষচন্দ্র বসু। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ