আগামী শনিবার শিক্ষক দিবস। ছোটোবেলায় কীভাবে তাঁর শিক্ষক ডঃ এ পি জে আব্দুল কালামের জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন, সেই ঘটনাই লিখলেন অনির্বাণ রক্ষিত।
আগামী শনিবার শিক্ষক দিবস। ছোটোবেলায় কীভাবে তাঁর শিক্ষক ডঃ এ পি জে আব্দুল কালামের জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন, সেই ঘটনাই লিখলেন অনির্বাণ রক্ষিত।
১৯৩১ সালে তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমে এক দরিদ্র মত্স্যজীবী পরিবারে জন্ম আবুল পকির জয়নুল আবদিন আব্দুল কালামের। যিনি হয়েছিলেন দেশের একাদশতম রাষ্ট্রপতি। তিনিই দেশের একমাত্র বৈজ্ঞানিক, যিনি রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করেছেন। তিনি বাবার কাছ থেকে সততা ও আত্মশৃঙ্খলার গুণ পেয়েছিলেন। আর মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলেন ভালো কাজের প্রতি বিশ্বাস ও গভীর সহমর্মিতা! তাঁর এহেন উত্থানের কাহিনি শিক্ষা দেবে আজকের নব্য প্রজন্মকেও। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুবৃত্তে কোনো ধর্মীয় ভেদাভেদ ছিল না। এই সময় তিনি এমন কিছু মানুষের সংস্পর্শে এসেছিলেন যাঁরা তাঁর মনের ভিতরে একে একে জ্বেলে দিয়েছিলেন ছোটো ছোটো মোমবাতি, যা অচিরেই হয়ে ওঠে বাতিস্তম্ভের মতো উজ্জ্বল। ছোট্ট বন্ধুরা, আজ আমরা জানব কালামের তেমনই এক শিক্ষকের গল্প। একটি ঘটনায় তাঁর একটি মন্তব্য আব্দুল কালাম সারা জীবন মনে রেখেছিলেন।
স্কুলে ডঃ এ পি জে আব্দুল কালামের বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন শিবসুব্রহ্মণ্য আইয়ার। এই মানুষটিই তাঁর মনে বিজ্ঞানচর্চার অনুপ্রেরণার বীজ পুঁতেছিলেন। আত্মজীবনী ‘উইংস অব ফায়ার’-এ কালাম লিখেছেন— ‘আমার বিজ্ঞান শিক্ষক শিবসুব্রহ্মণ্য আইয়ার ছিলেন একজন গোঁড়া ব্রাহ্মণ। তাঁর স্ত্রী ছিলেন অত্যন্ত রক্ষণশীল এক মহিলা।’ একদিন, ওই শিক্ষকের বাড়িতেই কালাম আমন্ত্রিত হলেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রী যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না! স্বামীর সঙ্গে এক সারিতে বসে খাবে এই মুসলিম ছেলেটি! তাঁর স্ত্রী সটান জানিয়ে দেন কালামকে খাবার পরিবেশন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু এমন আচরণের সামনে ধৈর্য হারাননি শিবসুব্রহ্মণ্য। স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়াও করেননি। বরং পরম যত্নে নিজের হাতেই খাবার বেড়ে দিলেন ছাত্রের পাতে। তারপর তাঁরই পাশে বসে নিজেও খেতে শুরু করেন। পুরো বিষয়টাই রান্নাঘরের বাইরে থেকেই দেখছিলেন তাঁর স্ত্রী। কালাম পরে লেখেন, তিনি বুঝতে পারছিলেন, সম্ভবত একজন মুসলিমের খাওয়ার সঙ্গে হিন্দুর পার্থক্য কোথায় সেটাই যেন বুঝে নিতে চাইছিলেন ওই মহিলা। এরপর তিনি লিখেছেন— ‘তাঁর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় শিবসুব্রহ্মণ্য আইয়ার পরের সপ্তাহেও ফের আমাকে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানান। আমার দ্বিধা দেখে তিনি আমাকে মন খারাপ না করার পরামর্শ দিয়ে বললেন, যখন তুমি কোনো প্রথা বা সিস্টেমের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেবে, তখন এই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি তো হতেই হবে। পরের সপ্তাহে যখন আমি তাঁর বাড়িতে গেলাম, তখন আইয়ারের স্ত্রী আমাকে রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে নিজের হাতেই খাবার পরিবেশন করলেন।’
এই ঘটনা কালামকে জীবনের একটা মস্ত শিক্ষা দিয়েছিল। সমাজকে বদলাতে চাওয়া এবং সেই স্বপ্নকে সত্যি করার পথে কী কী সহ্য করতে হতে পারে সেই শিক্ষা সেদিন তাঁকে তাঁর শিক্ষক দিয়েছিলেন। কেবল বিজ্ঞানের সাধনা করার অনুপ্রেরণাই নয়, জীবন ও সমাজকে চিনে নেওয়ার এক অনন্য পাথেয়ও যেন ছাত্রের মনে তিনি গেঁথে দিয়েছিলেন। সেই সময় উচ্চবর্ণের হিন্দুদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে পেরিয়ার ইভি রামাস্বামীর যে জোরালো আন্দোলন পুরো অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা-ও তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। শৈশবের এই সব অভিজ্ঞতা তাঁকে তৈরি করেছিল। আরও নিপুণভাবে নির্মিত হয়েছিল সংবেদনশীল মন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর জীবন যেন কোনো অর্থবহ বার্তা বহন করে। তিনি মানুষের মনে আশার সঞ্চার করতে চেয়েছিলেন। যা তাঁকে শিখিয়েছিল তাঁর জীবন। তাঁর অভিজ্ঞতা। এভাবেই কালাম হয়ে উঠেছিলেন একজন ‘শ্রেষ্ঠ’ শিক্ষকের সেরা ছাত্র।