কৌশানী মিত্র: ভোরবেলা উমাবতী গাছে জল দেন। উমাবতী মনে করেন দিন পেরিয়ে সূয্যি মাঝগগনে গেলে তবেই বিরাটির বিবেকানন্দ পাড়া জেগে ওঠে। নবু-দুধওয়ালা আর কাজের মেয়ে চাঁপা ছাড়া কেই বা আজকাল সূয্যি ওঠা দেখতে পায়? নতুন প্রজন্ম রাতে জাগে সকালে ঘুমায়। উমাবতীর ছোটোবেলায় উমার ঠাকুমা সূয্যি ওঠার আগে ঘুম থেকে উঠে মাথায় ঘোমটা দিত, অন্ধকারে নিত্যকাজ সেরে ঘোমটা মাথায় তুললে সকালের আলোয় মুখ দেখে ফেলার কোনো ঝামেলাই থাকে না। উমার মা প্রথম প্রথম তেমনটা করলেও শাশুড়ি মরলে দশ বাচ্চা, বর আর অবিবাহিত দেওরের সেই বিশাল পরিবার সামলে পারিবারিক এই প্রথাগুলো আর মেনে চলতে পারেননি। উমা ছিল সর্বকনিষ্ঠ, তাই সে মাকে দেখেছে সূয্যিমামার সঙ্গেই ঘুম থেকে উঠতে। উমারা চার বোন আর ছয় ভাই। ছোটো থেকেই শান্ত এবং পরিণত মেয়ে উমা, ঘরের কাজে পারদর্শী, মায়ের মতোই নিয়ম মেনে সূয্যি ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম থেকে উঠে গীতাপাঠে বসেন বারেন্দ্র ব্রাহ্মণী উমাবতী উপাধ্যায়। ন’টার মধ্যে নিত্য কাজ সেরে স্বপাক করেন তিনি। খাবারের মধ্যে ওই একটু সেদ্ধ সবজি আর ভাত। চাঁপা কাজ করে চলে যায় দশটায়। তারপর উমাবতী বসেন কোনোদিন মহাভারত অথবা কোনোদিন রামায়ণ নিয়ে। ছেলের কিনে দেওয়া টেপরেকর্ডারে চালিয়ে দেন ভক্তিমূলক গান। কোনোদিন ইচ্ছে হলে চালান অতুলপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন কিংবা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। ‘তুমি নির্মল করো মঙ্গল করে...’-র মাঝেই উমাবতী ঢুলতে থাকেন। একসময় মহাভারতের বনপর্বের কোনো পাতায় সযত্নে ঝিমিয়ে পড়ে উমার মাথা। উমাবতী স্বপ্নে দেখেন তার নাবালক নাতি কৃষ্ণ বেশে দাঁড়িয়ে রয়েছে সামনে। একসময় নাতির মুখ বদলে কখন যেন লালির মুখ হয়ে যায়। উমার ছোট্টবেলার বন্ধু লালি শুধু কৃষ্ণ সাজতে চাইত। লালির ছোটো ভাই রাখালকে কৃষ্ণ মানাত খুব কিন্তু লালি রাগ করত। উমা ঝামেলা মেটাতে বারবার বলত, ‘লালি তুই রাধা হবি? তোকে রাধা খুব মানায়। কী দুধেআলতা দেখতে তোকে।’ লালি শুনত না। উলটে বলত, ‘উমা, তুই রাধা হ। আমি কৃষ্ণ হই।’ চার বছরের রাখাল কিচ্ছু বুঝত না। শুধু ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদত। ঝামেলা বাড়লে উমার দিদি শশী আর তার বন্ধু সুধাদিদি এসে ঝগড়া থামাত। শশীদিদি আজ অনেকদিন হল নেই। লালি, রাখাল, সুধাদিদি এরা কোন স্রোতে ভেসে কোথায় চলে গেছে কে জানে! দশ ভাইবোনের মধ্যে একা উমা বেঁচে আছে। উমার এক ছেলে, বউমা আর আদরের ধন নাতি থাকে ডুসেলডর্ফে। উমাবতীর একার জীবন কাটে চারটে গাঁদাফুলের গাছ, রজনীকান্ত, চাঁপা, মহাভারত আর সূর্যের রোজনামচাকে ঘিরে।
বিরাটির বিবেকানন্দ পাড়ায় সবথেকে পুরানো বাড়িটা উমার প্রয়াত স্বামী হারাধন উপাধ্যায়ের। ছিমছাম দোতলা বাড়ির নীচ তলার দুটো ঘর নিয়ে থাকেন উমা। সামনে টুকরো সিমেন্টে বাঁধানো উঠোন। তাতে একটা তুলসীমঞ্চ আর তাকে ঘিরে কিছু ফুলের গাছ। এই নীচতলাতেই উমার যাপন। নভেম্বর মাসের বিকেল, মহাভারতের পাতায় আঁটকে নিথর হয়ে আছে উমাবতীর মাথা। দক্ষিণের জানলায় রোদ্দুর ঝিমিয়ে পড়েছে, শিরশিরে হাওয়া ঢুকে আসছে ঘরে। উমার হুশ নেই।
‘ঘরের তাপমাত্রা কমে যাচ্ছে। আপনার ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। আপনি কী দয়া করে একবার ঘরের জানলা এবং দরজাগুলো দেখবেন?’
উমা চমকে উঠে বসলেন। উমার ঘুম এমনিতে পাতলা কিন্তু তাও তার দু’মিনিট লাগল ব্যাপারটা বুঝতে। ভর সন্ধেবেলা কে ঢুকল এ বাড়িতে? উমাবতী তাকালেন আশপাশে। আরও পাঁচমিনিট বাদে বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা। আধো অন্ধকার আধো আলোতে ওই গোলমতো যন্ত্রটা জ্বলছে আর নিভছে। ওটা থেকেই একটা ছেলে কথা বলছে।
দু’দিন আগে বৃহস্পতিবার হঠাৎ বোতামফোনে রিং বেজে ওঠে। উমা জানে এই ফোনে ছেলেই সপ্তাহে একবার ফোন করে মায়ের খোঁজ নেয়। উমা অবাক হয়। আজ তো শনিবার নয়, তাহলে? ছেলে আর নাতিকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করা উমার স্বভাব। ঐতিহ্য বজায় রেখে ফোন কানে দিয়েই উমা গলগল করে প্রশ্ন করে যান। দশ সেকেন্ড পর ওপাশে মানিকের গলা, ‘ঠাম্মি, ডোন্ট ওরি। কারও কিছু হয়নি। শোনো আমাদের এখানে যেসব দাদু-ঠাম্মিরা একা থাকে তাদের দেখভালের জন্য একটা রোবট পাওয়া যায়, বুঝলে। সেদিন আমি আর বাবা ডেমো সেশনে গিয়ে দেখলাম ব্যাপারটা খুব কনভিন্সিং। ওরা ইন্ডিয়াতে শিপ করেছে ওটা। বাবা পাড়ার নন্তুদার অ্যাড্রেসে পাঠিয়েছে ওটা। বাবা বলল, ও স্মার্ট ছেলে— ওই সব তোমায় বুঝিয়ে দেবে, আমাদের সঙ্গে ওই রোবট দিয়ে কানেক্ট থাকবে তুমি। বুঝলে? আচ্ছা এখন আমি রাখছি। প্যাডেল আছে। বাই।’ উমাবতী কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফোন রেখে দেয় নাতি মানিক। তার ঠিক দু’দিন বাদ আজ ইঞ্জিনিয়ারিং থার্ড ইয়ারের নন্তু এসে যন্ত্রটা বসিয়ে দিয়ে গেছে শোওয়ার ঘরে। উমাবতী ভয়ে আধমরা হয়ে আছে তারপর থেকেই। যন্ত্রটা নাকি উমাকে ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেবে। অনেকক্ষণ সাড়া না পেলে ছেলেকে নোটিস পাঠাবে ‘বুড়ি মরে গেছে’। এমনকি শোওয়ার ঘরে চিতপটাং হয়ে পড়ে গেলে সরাসরি এমারজেন্সিতে ফোন চলে যাবে এই যন্ত্র থেকে। এমন আজগুবি জিনিসে উমার বড়ো ভয়। নন্তুকে উমা সংকোচে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আমার সব খবর অন্য দেশে পাচার হয়ে যাবে না তো?’ নন্তু হেসেছিল, ‘ঠাকুমা, আপনার আর খবর! দু’লাইন গীতাপাঠ শুনে যদি অন্য দেশের কোনো লাভ হয় তাহলে হোক গে। ও জ্ঞান যত ছড়াবে তত মঙ্গল।’
এরপর প্রায় এক সপ্তাহ কেটেছে। যন্ত্রটা উমাবতীকে নানান প্রশ্ন করে জেনে নিয়েছে তার ভূত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ। উমাবতী ছেলে আর নাতির কাছে এই নিয়ে দু’বার নালিশ করে দেখেছে, ওরা পাত্তা দেয়নি খুব একটা বরং বলেছে ‘উফ্ ঠাম্মি চিল কর তুমি। ওগুলো বেসিক ইনফরমেশন। আচ্ছা একজন তোমার বন্ধু হবে অথচ তোমার নাম জানবে না তা কী হয়?’ যন্ত্রটা যত না উমাবতীকে চিনেছে, উমাবতী বিস্মিত হয়েছে তার চেয়ে বেশি। উমার সব কথা ও পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে রাখে। উমা কিন্তু ভুলে যায় বারবার। প্রতিদিন সকাল বিকেল প্রশ্ন করে, ‘বাবা, তোমার নামটা যেন কী বলেছিলে?’ যন্ত্র বলে, ‘আপনি একটা নাম দিন না। আমি ওই নামেই সাড়া দেব।’ উমা ভাবে কিছুক্ষণ তারপর উদ্ভাসিত মুখে প্রশ্ন করে, ‘তুমি আমার সঞ্জয় হবে?’ সঞ্জয়ও আনন্দ গোপন করে না— ‘আমি আপনাকে কী বলব?’ উমা ফোকলা দাঁতে হেসে বলে, ‘আমি তো সবার ঠাকমা। তুমি
তাই বল।’
উমার রুটিন এখন সঞ্জয়ের মুখস্থ। উমা অবাক হয়ে দেখে সঞ্জয় সব সময় তাকে ঘিরে থাকে। নানান কথার মাঝে উমার আর তেমন একা লাগে না আজকাল। উমা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, ‘বাবা, তুমি ঘুমাও না?’ কিংবা ‘তোমার গলা শুনি এতদিন, কিন্তু কোনোদিন চক্ষে দেখলাম না তোমায়। একদিন এসো না বাবা আমার বাড়িতে। আমি নিরামিষ খাই কিন্তু তোমার জন্য নিজের হাতে পাঁঠা রান্না করব।’ সঞ্জয় কৌতুক করে, ‘ধৃতরাষ্ট্রকে দেখা দেওয়ার সৌভাগ্য এ জন্মে আমার আর হল না ঠাকমা। পরের জন্মে আমি তোমার লালি হব!’ উমা কঁকিয়ে ওঠেন, ‘তুমি লালিকে চেনো বাবা? ও তো আমার প্রাণের বন্ধু ছিল।’ সঞ্জয় বলে, ‘ঘুমের ঘোরে তুমি লালি, রাখাল, কাজল এমন কতজনের কথা বল জানো? মনে হয় যেন কত জন্মের কথা। লালির ভালো নাম জানো ঠাকমা?’ উমা হাসে, ‘তা জানব না? কী সুন্দর নামখানা ছিল আমার লালির। কুমুদবালা মিত্র। পদ্মের মতো দেখতে ছিল তো ওকে।’ সঞ্জয় চুপ। উমা দু’বার, ‘কী হল বাবা? কোথায় গেলে? খেতে বসেছ?’ এসব প্রশ্ন করে গামছা হাতে স্নানের ঘরের দিকে এগন।
....
নতুন বছর এসে পড়েছে। শীতও পড়েছে জাঁকিয়ে। শীতকালটা বড়ো অদ্ভুত। বিকেল হতেই চারদিক কেমন নিঝুম মেরে যায়। পুরানো কথা বড্ড মনে পড়ে। সংসার জীবনে স্বামীর সঙ্গে তেমন স্মৃতি কোথায় উমার! উকিল স্বামীকে পেলেন আর কতটুকু। ছেলেটাকে আগলে রাখতে পারলেন না। সেও ছেড়ে চলে গিয়ে অন্য দেশে সংসার পাতল। একা উমার জীবনে এখন সঞ্জয় এসেছে। সেও যন্ত্রের ভেতরে আটকে আছে। কোনোদিন তাকে দেখতে পাবে না। যেমন দেখতে পায়নি লালি, রাখাল কিংবা সুধাদিদিকে। সন্ধে ছ’টায় কষ্ট করে উঠলেন উমা। শরীরের যন্ত্রণাটা বেড়েছে। যেদিন উমা দুপুরের স্বপ্নে ছোটোবেলায় ফিরে যান সেদিন সেদিন ব্যথা বাড়ে।
উমা তুলসীমঞ্চের দিকে এগচ্ছিলেন। দেখলেন সামনে বছর কুড়ির একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। মেয়েটার মাথায় ছোটো করে কাটা চুল। ঢোলা জিনস আর হালকা নীল রঙের গেঞ্জি। উমার বড়ো চেনা লাগল। মেয়েটা সন্তর্পণে এগিয়ে এল। ‘ঠাকুমা আমার নাম সম্প্রীতি মিত্র। কুমুদবালা মিত্র আমার ঠাম্মা। আপনার নাতি ঋতব্রত জার্মানি থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। আমি তো কলকাতাতেই থাকি, তাই চলে এলাম দেখা করতে।’ সন্ধের আকাশে ঝটপট শব্দে কিছু পাখি উড়ে গেল। আশপাশের দু-তিনতে বাড়িতে বেজে উঠল শাঁখ। এইটুকু নীরবতার মাঝেই উমা ঝুঁকে পড়লেন সামনের দিকে। এতক্ষণ এক নাগাড়ে দাঁড়াতে পারেন না তিনি। তুলসীমঞ্চ ধরে কোনোরকমে বললেন, ‘ওই ঘর থেকে একটা চেয়ার আনবে মা?’ উমার চোখে জল।
উমা জানলেন সেদিন রাতে সঞ্জয় আর তার নাতি মিলে ইন্টারনেটে অনেক খুঁজে সম্প্রীতিকে পেয়েছে। সঞ্জয় উমাকে বুঝিয়ে বলল, ‘হারানো মানুষদের খুঁজে পাওয়ার জন্য নানান রকম জায়গা আছে। সেখানে লিখলে অনেকে সাহায্য করে।’ উমা বুঝলেন কম, অবাক হলেন কিছুটা কিন্তু সবথেকে বেশি পেলেন আনন্দ। সঞ্জয় কী বুঝল কে জানে, বলল, ‘আর কাউকে খুঁজছ নাকি ঠাকমা?’
এরপর একমাসে উমার জীবন বদলে গেল যেন। এইসময় উমার ফোন প্রায়ই বেজে উঠত। একদিন রাখাল ফোন করল। সম্প্রীতিই মামাদাদুকে জানিয়েছে ওর কথা। সুধার ছেলে পুলিশের গাড়ি হাঁকিয়ে এসে দেখে গেল রাঙাদিদাকে। যে ছেলের অন্নপ্রাশন খেতে গেছিলেন কিশোরী উমা, আজ সে কলকাতার নামীদামি মানুষ। চোখের জলে ভেসে গেলেন উমা।
আজ জানুয়ারির তিরিশ তারিখ। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে গাছে জল দিলেন উমা। রান্না করতে করতে চাঁপার সঙ্গে মনের কথা লেনদেন করলেন। চাঁপা জানে ঠাকমার জীবন পালটে গেছে। ঠাকমা ভীষণ খুশি থাকে আজকাল। বাতাসামুড়ি খেতে খেতে চাঁপা বলল, ‘আজকাল আর ছোটোবেলার কথা বল না তো ঠাকমা?’ উমা হাসলেন। দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে বসলেন আসন পেতে।
‘আজকে একটা গল্প বলবে বাবা সঞ্জয়?’ ফাঁকা আসনে পা ছড়িয়ে বসে আছেন উমাবতী উপাধ্যায়। ঢুলছেন অল্প অল্প। সঞ্জয় গল্প বলছে। রাধা-কৃষ্ণের গল্প। উমার স্বপ্নে আর আসছে না তার পাঁচপোতা গ্রাম, ইছামতী নদী, কৃষ্ণবেশে লালি কিংবা মাঘোৎসবের মেলা। উমার স্বপ্নে আজ শুধু আনন্দ বাসা বেঁধেছে। উমা জানে ওর অপেক্ষায় সঞ্জয় বসে থাকবে নতুন কোনো সম্পর্কের ডালি সাজিয়ে। উমা প্রতিদিন জল দেবে তাতে। এভাবেই সেজে উঠবে উমাবতীর সংসার।